প্রেমের বিয়ে। হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ। নিপা রানি রায় থেকে হোসনে আরা বেগম লাইজু নাম ধারণ। এরপর আত্মহত্যা। এ ঘটনায় মামলার আইনি জটিলতা শেষে চার বছর এক মাস ২৪ দিন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণে থাকা ধর্মান্তরিত নীলফামারীর ডোমার উপজেলার খামার বামুনিয়া গ্রামের কলেজছাত্রী হোসনে আরা ইসলামের (২০) মরদেহ মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয়েছে। এ ঘটনাকে এলাকাবাসী কালজয়ী প্রেমের জয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
উচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী শুক্রবার বেলা তিনটায় নীলফামারী জেলা প্রশাসকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতেমা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে মেয়েটির শ্বশুরবাড়ির একই উপজেলার পূর্ব বোড়াগাড়ী কাজীপাড়া জামে মসজিদ চত্বরে দুই দফা নামাজে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করা হয়। জানাজায় ১০ হাজারের বেশি মুসল্লিরা অংশ নিতে আসায় স্থান সংকুলান না হওয়ায় দুই দফায় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জানাজায় ইমামতি করেন মেয়েটির দাদা শ্বশুর মওলানা কাজী আব্দুল জলিল ও দ্বিতীয় জানাজায় ইমামতি করেন মওলানা রবিউল ইসলাম। জানাজা শেষে হোসনে আরা ইসলামকে তার স্বামী হুমায়ুন ফরিদ ওরফে লাইজু ইসলামের (২৩) কবরের পাশেই চির নিদ্রায় শায়িত করা হয়।
চলতি বছরের গত ১২ এপ্রিল হাইকোর্টের বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর একক হাইকোর্ট বেঞ্চের আদেশে ধর্মান্তরিত হোসনে আরা ইসলামকে মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করার রায় দেয়। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার (৩ মে) হাইকোর্টের ওই আদেশের কপি জেলা প্রশাসকের হাতে পৌঁছে। আদালতের আদেশ মোতাবেক জেলা প্রশাসকের পক্ষে সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করে আজ শুক্রবার সকাল সোয়া ১১টায় রংপুর মেডিকেল কলেজের হিমঘরে সংরক্ষণে থাকা হোসনে আরার মরদেহ নিয়ে আসা হয় ডোমার উপজেলার বোড়াগাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব বোড়াগাড়ী গ্রামের মেয়েটির শ্বশুর সাবেক ইউপি সদস্য জহুরুল ইসলামের বাড়িতে। সেখানে দাফনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।
IMG0
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণীতে জানা যায়, ডোমার উপজেলার খামার বমুনিয়া গ্রামের অক্ষয় কুমার রায়ের মেয়ে কলেজছাত্রী নিপা রানী রায়ের সঙ্গে একই উপজেলার বোড়াগাড়ি ইউনিয়ন পূর্ব বোড়াগাড়ী গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য জহুরুল ইসলামের ছেলে হুমায়ুন ফরিদ ওরফে লাইজু ইসলামের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। প্রেমের টানে ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর ইসলাম ধর্ম গ্রহণপূর্বক মোছা. হোসনে আরা ইসলাম নাম ধারণ এবং দুই লাখ এক হাজার ৫০১ টাকা দেনমোহরে হুমায়ুন ফরিদ লাইজু ইসলামকে বিয়ে করে মেয়েটি।
এ অবস্থায় মেয়েটির বাবা অক্ষয় কুমার রায় ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবর বাদী হয়ে নীলফামারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে শারীরিক পরীক্ষার জন্য মেয়েটিকে রাজশাহী সেফহোমে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এ অবস্থায় ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি মেয়েটির স্বামী হুমায়ূন ফরিদ লাইজু ইসলাম বিষপানে আত্মহত্যা করে। এরপর মেয়েটির বাবা অক্ষয় কুমার তার মেয়েকে নিজ জিম্মায় নিতে আদালতে আবেদন করেন। আদালত তা মঞ্জুর করলে ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি তিনি মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে নিয়ে রাখেন। তবে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালের ১০ মার্চ বাবার বাড়িতে কীটনাশক পান করে মেয়েটি। তাকে ডোমার উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। পুলিশ হাসপাতাল থেকে মেয়েটির লাশ রাতেই উদ্ধার করে পরের দিন জেলার মর্গে ময়না তদন্ত করে। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় দাফন নিয়ে।
মেয়েটির শ্বশুর জহুরুল ইসলাম ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক দাফনে ও বাবা অক্ষয় কুমার রায় হিন্দু শাস্ত্রে সৎকারের জন্য তাৎক্ষণিকভাব জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করেন। সেখানে কোন সমাধান না হওয়ায় আদালত মেয়েটির মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণের আদেশ দেন। সেই থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে ময়েটির লাশ সংরক্ষণ ছিল। এরপর এই মামলাটি নীলফামারী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে দীর্ঘ দিন চলার পর মেয়েটির শ্বশুর তা হাইকোর্টে মামলাটি নিয়ে যায়। এ নিয়ে বিভিন্ন গনমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ পেলে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য হাইকোর্টে আবেদন করেছিল মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্র। এরপর হাইকোর্টের এক আদেশে দীর্ঘ চার বছর দুই মাস পর মেয়েটির দাফন সম্পন্ন হলো।
ইত্তেফাক/ইউবি
