রেললাইনের ওপর ও পাশে দাঁড়িয়ে অর্ধশত মানুষ ঝগড়ায় মত্ত। এ সময় ওই রেললাইন দিয়ে ট্রেন আসছিল। কিন্তু কেউ খেয়াল করেনি! বাকপ্রতিবন্ধী সোহাগ (৩৫) ট্রেন আসতে দেখে দু'হাত দিয়ে ঠেলে সবাইকে রেললাইন থেকে সরিয়ে তাদের বাঁচালেন। তবে সরতে পারলেন না তিনি নিজে। ট্রেনের ধাক্কায় ভেঙ্গে যায় তার দু’হাত! এছাড়া শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত পেয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি। অনেকের জীবন বাঁচালেও নিজে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছেন সোহাগ।
ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ রেলক্রসিং এলাকায়। সোহাগের বাড়ি গৌরীপুর উপজেলার মইলাকান্দা ইউনিয়নের পূর্বমইলাকান্দা গ্রামে।
পরিবার ও এলাকাবাসী জানায়, পূর্বমইলাকান্দা গ্রামের ফজলুল হকের ৪ পুত্র ও ২ কন্যার মধ্যে সোহাগ দ্বিতীয়। বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় তিনি পুরো এলাকা ঘুরে বেড়াতেন। ২৫ মার্চ রাতে শ্যামগঞ্জ অটোরিকশা স্ট্যান্ড এলাকায় ঘোরাঘুরি করছিলেন তিনি। ওইসময় অটোরিক্সা স্ট্যান্ড সংলগ্ন রেলওয়ে লেভেল ক্রসিংয়ের উপর দাড়িয়ে দু’গ্রুপের ঝগড়ার কারণে কারো খেয়াল ছিলো না ট্রেন আসছে। ট্রেন আসা দেখে সোহাগ দৌড়ে ছুটে যান ঝগড়াস্থলে। ঝগড়ারত মানুষদের দু’হাত দিয়ে ঠেলে নিচে নামানোর একপর্যায়ে নিজেই ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনের অংশের ধাক্কায় ছিটকে পড়েন। তার মাথা, ঠোট ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেতলে যায় এবং দুটি হাত ভেঙ্গে যায়। তার চিকিৎসা চলছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
সোহাগের বাবা মো. ফজলুল হক জানান, বাকপ্রতিবন্ধী সোহগের মাথায়, ঠোটে ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেতলে গেছে, মাথায় ২৬টি সেলাই লেগেছে। দু’হাতে কয়েকটি স্থান ভেঙ্গে গেছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জন ডা. মো. শামীউল আলম সিদ্দিকী শামীমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে।
সোহাগের মা সাফিকুর নাহার জানান, ওর বুদ্ধি নেই। কথা বলতে পারে না। এ নিয়ে অনেক কষ্টে ছিলাম। আজ গর্বিত ওর বুদ্ধি আছে। মানুষ বাঁচাতে জীবন দিতে জানে। ও তো মরেও যেতো পারতো।
সোহাগের ঘটনা নিয়ে এলাকায় তোলপাড় শুরু হলে স্থানীয় বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের সভাপতি মামুনর রশীদ ব্যাক্তিগত উদ্যোগে লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেন চলাচলের সময় যান চলাচল ও পথচারীদের সুরক্ষার জন্য বাঁশের খুঁটি দিয়ে দড়িটানা ব্যারিকেড নির্মাণ করে দেন।
ওইদিন দুর্ঘটনার হাত থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ইউপি সদস্য আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ট্রেন আসার খবর পেয়ে সোহাগ রেলসড়কের ওপর থেকে মানুষকে সরাতে থাকে। এ সময় সোহাগ আমাকেও টান দিয়ে সরানোর সাথে সাথেই পাশ দিয়ে ট্রেন চলে যায়। পরে পিছনে ফিরে দেখি সোহাগ রক্তাত অবস্থায় পড়ে আছে। সোহাগ ওইদিন এই ধরণের সাহসিকতা না দেখালে আমি সহ অনেকই ট্রেনের নিচে পড়ে মারা যেতো।
শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক গোবিন্দ বণিক বলেন, একজন বাকপ্রতিবন্ধী হয়েও সোহাগ জীবন বাজি রেখে যে সাহসিকতা দেখিয়েছে তাঁর তুলনা হয়না। তার জন্য ওইদিন কমপক্ষে ২০/২৫জন মানুষ প্রাণহানির ঘটনা থেকে বেঁচে গেছে। আমরা তার পাশে দাঁড়ানোর জন্য উদ্যোগী হচ্ছি।
এদিকে শ্যামগঞ্জ রেলওয়ে লেভেলক্রসিংয়ে গেইট মেরামত ও গেইটম্যানের দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা। এ প্রসঙ্গে গৌরীপুর রেলওয়ে জংশনের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, জনবল সংকটের কারণে গেইটম্যান নেই। উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু
