ফিফা বিশ্বকাপ এখন দরজায় কড়া নাড়ছে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে রাশিয়ায় বসছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদার এই ফুটবল আসর। এর মধ্যেই মুসলমানদের অন্যতম একটি ধর্মীয় বিধান রোজা শুরু হয়েছে। তাই সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থেকে মুসলমান ফুটবলাররা কিভাবে প্রস্তুতি নিবেন বিশ্বকাপের। এ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ফুটবলের বিখ্যাত ওয়েবসাইট গোল ডটকম।
রমজান মাসে মুসলমানদের সুবহে সাদিক (ভোর রাত) থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার থেকে বিরত থাকতে হয়। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী এতে দৈহিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধিতা অর্জন হয়। তাই রমজানে প্রস্তুতিতে মুসলিম ফুটবলারদের অনেকে রোজা রাখেন, আবার অনেকে রাখেন না।
লিভারপুলে খেলা মিশরীয় ফরোয়ার্ড মোহাম্মদ সালাহ’র ধর্মীয় বিধানের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ্য। এর মধ্যেই লিভারপুলের হয়ে তিনি গোলের ক্ষেত্রে যে সক্ষমতা দেখিয়েছেন তা অনন্য। ধর্ম সম্পর্কে তার খোলাখুলি বক্তব্য, আমি একইসঙ্গে একজন মুসলিম। তার গোল উদযাপনেও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিফলন আছে।
IMG0
সালাহ’র মতো পল পগবা, সাদিও মানে এবং মেসুত ওজিলদেরও বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে রমজানে। তাই খেলা ও প্রস্তুতির একটা বড় সময় ধরে তাদের দিনের বেলায় পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে কি প্রস্তুতিতে কোনও বিঘ্ন ঘটবে মুসিলম ফুটবলারদের? সেই প্রশ্ন আসছে এখন সামনে। ২০১২ সালে অলিম্পিক, ২০১৪ বিম্বকাপ ও গত বছর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও মুসলিম অ্যাথলেটদের একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। গ্রীষ্মকালে এভাবে পানাহার ছাড়া প্রস্তুতি তাই একটি ব্যতিক্রম অভিজ্ঞতাই।
চলতি মৌসুমে লিভারপুলের হয়ে ৪৪ গোল করা সালাহ’র এমন দুর্দান্ত পারফরমেন্সের কথা মৌসুমের শুরুতেও কেউ ভাবতে পারেননি। তবে এর মধ্যেও তিনি নিজের মুসলিম পরিচয়টিকে বড় করেই দেখেছেন। ইউরোপের সামনে ধর্ম ও প্রতিভার দুর্দান্ত এক মিশেল তিনি দেখিয়েছেন। লিভারপুলের একজন সমর্থক লিখেছেন, যদি সে তোমার জন্য যথেষ্ট হয়, তবে সেও আমার জন্য যথেষ্ট। যদি সে মসজিদে বসা থাকে, তবে আমি সেখানেই যেতে চাই।’
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালের দিনসহ তিনদিনই উপবাস করেছেন সালাহ। রোজার ক্ষেত্রে বিধান হচ্ছে যথেষ্ট কারণ থাকলে বা ভ্রমণে থাকলে রোজা থেকে বিরত থাকা যায়। তাই শুধু সফরের দিন তিনি রোজা রাখেননি। লিভারপুল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে রিয়ালের কাছে ৩-১ গোলে হেরেছে। সার্জিও রামোসের বাজে ট্যাকলের কারণে ওই ম্যাচে প্রথমার্ধেই ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়তে হয়েছে সালাহকে। তাই তার বিশ্বকাপ খেলা নিয়েও শঙ্কা আছে।
এদিকে মুসলিম দেশ মিশরের ফুটবলাররা রোজা রেখেও ভালো প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন মিশরের কোচ হেক্টর কোপার। তিনি বলেন, রমজান মাসে খেলোয়াড়দের প্রস্তুতির জন্য দেশটির ফুটবল ফেডারেশন বিশেষজ্ঞও নিয়েছে। আমরা রমজানে তাদের খাবার ও ঘুমের বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করছি। যাতে প্রস্তুতিতে খারাপ কোনও প্রভাব না পড়ে। কোচের জন্য এটা চ্যালেঞ্জিং যে তার দলের খেলোয়াড়রা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপবাস করবে। কিন্তু ধর্মীয় বিধান পালনে বাধা দেয়ার উপায় নাই। আমরা এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতবনভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
IMG1
লিভারপুলে সালাহ’র আরেক মুসলিম সতীর্থ সাদিও মানে। তার দেশ সেনেগালও খেলছে বিশ্বকাপে। তিনিও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের দিন রোজা রেখেছেন, তথাপি মাঠের পারফরমেন্সে কোনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়নি। ১৭ ঘণ্টা সময় উপবাস করার পর খেলার মাত্র আধ ঘণ্টা আগে ইফতার করেছেন মানে। সেনেগালের বিশ্বকাপ মিশন শুরু হবে ১৯ জুন পোল্যান্ডের বিপক্ষে। তাই বিশ্বকাপে তার মাঠে নামার আগেই রমজান মাসও শেষ হয়ে যাবে।
মুসলিম ফুটবলারদের মধ্যে পল পগবা একজন তরুণ সেনসেশন। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে মক্কায় উমরা পালনের জন্য গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে ইনস্টাগ্রামে ভিডিও পোস্ট করেছেন তিনি। ম্যানইউতে খেলা এই ফরাসি ফুটবলার লিখেছেন, ইহা দুর্দান্ত এক জায়গা, নিজের অনুভূতি আমি বুঝাতে পারব না। ইনশাআল্লাহ সবাই একদিন এখানে আসবে। সালাম।
মক্কাতে এর আগেও গিয়েছেন পগবা। তাই বিশ্বকাপের আগে পগবাও যে উপবাস করেছেন এটা জানাই। ফ্রান্সের আরেক ফুটবলার রিয়াদ মাহারেজও গত বছর মক্কায় হজ্জ পালন করেছেন।
IMG2
তবে প্রস্তুতির জন্য রোজা না রাখার অভিজ্ঞতাও আছে মুসলিম ফুটবলারদের। জার্মান দলে খেলা মুসলিম ফুটবলার মেসুত ওজিল অবশ্য ২০১৪ বিশ্বকাপের সময় রোজা পালন করেননি। একইভাবে সেনেগাল, আলজেরিয়া ও মরক্কোর বেশকিছু ফুটবলার তখন রোজা পালন করেননি।
তবে শেষ ষোলোতে জার্মানির বিপক্ষে খেলার সময় আলজেরিয়ার ফুটবলাররা রোজা রেখেছেন। যদিও তাদের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেনি। তবে দলটির গোলরক্ষক রাইস এমবোলিহি খেলার বিরতিতে পানাহার করেছেন।
উল্লেখ্য, আগামী ১৪ জুন শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ।
ইত্তেফাক/কেআই
