মাছের আবাসস্থল ধ্বংস ও ব্যাপকহারে মাছ নিধনের কারণে খাল-বিল জলাশয় থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি প্রজাতির অসংখ্য মাছ। তার মধ্যে অন্যতম বউরাণী (পুতুল/রাণী/দাড়ি মাছ) দেশি ট্যাংরা ও গুতুম (বেতরঙ্গী/পুইয়া/বুইচ্ছা)। এই মাছগুলোর প্রজনন ও আবাসস্থল হচ্ছে উন্মুক্ত প্রাকৃতিক জলাশয়। যা বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে বর্তমানে প্রায় ধ্বংসের মুখে। আর এই মাছগুলাকে রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। দীর্ঘ গবেষণার পর তিন প্রজাতির মধ্যে দুটি প্রজাতি গুতুম ও দেশি ট্যাংরা মাছের কৃত্রিম প্রজননে গবেষকরা সফল হয়েছেন।
দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদনের লক্ষ্যে এনএটিপি-২ প্রকল্পের অর্থায়নে নোবিপ্রবির মৎস্য ও সামুদ্রিক বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শ্যামল কুমার পাল এবং সহকারী অধ্যাপক ভক্ত সুপ্রতিম সরকার ও তার অধীনে অধ্যয়নরত মাজহারুল ইসলাম রাজু, মো. বোরহান উদ্দীন আহমেদ সিয়াম, তৌফিক হাসান, মামুনুর রশিদ, মিঠুন দেবনাথ, নাজমুল হাসান, সৃজন সরকার, কাজী ফরিদুল হাসান ও প্রণব ভক্ত গত বছরের আগস্ট মাস থেকে বউরাণী, ট্যাংরা ও গুতুম মাছের কৃত্রিম প্রজননের উদ্দেশে গবেষণা প্রকল্প হাতে নেন। পরে কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলার চেয়ারম্যান হাজী সামছুউদ্দিন কালুর মালিকানাধীন বিসমিল্লাহ মৎস্যবীজ উৎপাদন কেন্দ্র ও খামারে কার্যক্রম শুরু করেন এবং গত এপ্রিলে এ গবেষণার সাফল্য প্রকাশ পান।
বৃহত্তর নোয়াখালী, ময়মনসিংহ ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন প্রাকৃতিক জলাশয় ও হাওর থেকে ব্রুডফিশ (মা ও বাবা মাছ) সংগ্রহ করে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচর্যার মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজননের জন্য প্রস্তুত করা হয়। পূর্ণ প্রস্তুতি শেষে গত ২৮ এপ্রিল সফলভাবে ব্রুডফিশগুলোকে বিভিন্ন উদ্দীপক হরমোন বিভিন্ন মাত্রায় প্রয়োগ করা হয়। গুতুম ও ট্যাংরা মাছের সফল কৃত্রিম প্রজননের জন্য হরমোনের মাত্রা ঠিক করা যা অচিরেই সরকারের কাছে এ প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হবে। ডিম ফুটে পোনা বের হবার পর পোনাগুলোর স্বাস্থ্য ও বেঁচে থাকার হার সন্তোষজনক। বর্তমানে গবেষণা দলটি গুতুম ও ট্যাংরা মাছের রেণুপোনার চাষ ও লালন-পালন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। এ গবেষণা প্রকল্পে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন বিসমিল্লাহ মৎস্যবীজ উৎপাদন কেন্দ্রের টেকনিশিয়ান উত্তম বসু।
গবেষণা কার্যক্রমের ব্যাপারে জানতে চাইলে সহকারী অধ্যাপক ড. শ্যামল কুমার পাল স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, নোবিপ্রবির মৎস্য ও সামুদ্রিক বিজ্ঞান বিভাগ বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণা সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি ও তার দল বিভিন্ন দেশীয় ছোট মাছ বিপন্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য গবেষণা প্রকল্প শুরু করেন এবং সফলতাও অর্জন করেন। তিনি এই সাফল্যে থেমে না থেকে ভবিষ্যতেও তার গবেষণা কার্যক্রম পুরোদমে চালিয়ে যাবার আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সফল গবেষণা ও মানুষের সচেতনতাই পারে দেশীয় ছোট মাছকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে।
IMG0
উল্লেখ্য, এই গবেষণা দল আশা করছেন খুব শীঘ্রই বউরাণী মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও রেণুপোনা লালন-পালন প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও সফল হবেন তারা।
ইত্তেফাক/মোস্তাফিজ
