নারায়ণগঞ্জে একটি ফাস্ট ফুডের দোকানে লাচ্ছি খাওয়াকে কেন্দ্র করে দোকান মালিক ও স্থানীয়দের সঙ্গে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যদের সংঘর্ষের ঘটনায় ডিবির এক পরিদর্শক ও দুই এসআইসহ (উপ-পরিদর্শক) ৮ জনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। রবিবার রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের নগর খানপুর বরফকল মাঠ সংলগ্ন চৌরঙ্গী পার্কের সামনে এই ঘটনা ঘটে। তবে ঘটনার পর রবিবার ভোর রাতে ১০ মিনিটের ব্যবধানে ডিবির পক্ষ থেকে দোকান মালিকসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের নামে দুটি মামলা করা হয়েছে।
সোমবার ওই ৮ জনকে ডিবি থেকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়। তারা হলেন- ডিবির পরিদর্শক মাসুদুর রহমান, এসআই মিজানুর রহমান ও আবু সায়েম, এএসআই আজিজুর রহমান, দেওয়ান তৌফিক, বকুল মিয়া, আমিনুল হক ও কনস্টেবল লুৎফর রহমান।
ডিবির নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নূরে আলম জানান, ওই ঘটনাটি তদন্তের জন্য তাকে প্রধান করে একটি ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৮ জনকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। ঘটনায় যদি ডিবি পুলিশের কোন কর্মকর্তা দোষী প্রমাণিত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রবিবার রাতে পার্কের সামনে অবস্থিত মাই লাইফ নামে একটি ফাস্টফুডে যান ডিবির এএসআই আমিনুল ও বকুল। লাচ্ছির কোয়ালিটি নিয়ে দোকান মালিকের ছেলের সঙ্গে তর্কে জড়ান ডিবির ওই কর্মকর্তারা। পরে লাচ্ছির দাম না দিয়েই তারা চলে যেতে চান। এ নিয়ে দোকান মালিকের ছেলের সঙ্গে তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে ডিবির দুই এএসআই দোকানের মালিক জালাল উদ্দিন, তার স্ত্রী রীনা ইয়াসমিন, ছেলে রবিন ও আলামিনকে মারধর করে।
এক পর্যায়ে আশপাশের দোকানদাররা এক জোট হয়ে ডিবির দুই কর্মকর্তাকে এলোপাথারী মারধর করে। এতে মারাত্মকভাবে আহত হন ডিবির কর্মকর্তারা। পরে খবর পেয়ে ডিবির একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে লাঠিচার্জ করে। এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ব্যবসায়ী ও এলাকার বেশ কিছু যুবক সংঘবদ্ধভাবে ডিবির উপর চড়াও হয়। শুরু হয় উভয়ে পক্ষের মধ্যে ধাওয়ার পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ।
খবর পেয়ে সদর মডেল থানার অতিরিক্ত পুলিশ ও ডিবির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। হামলা-পাল্টা হামলায় ডিবির আহত ৫ কর্মকর্তা হলেন পরিদর্শক মাসুদ রানা, এসআই মিজান ও আবু সায়েম, এএসআই আমিনুল ও বকুল। তাদের প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে এসআই মিজান ও সায়েমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
মাই লাইফ ফাস্টফুডের মালিক জালাল উদ্দিনের স্ত্রী রীনা ইয়াসমীন সাংবাদিকদের জানান, সন্ধ্যার দিকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের দুই উপ-পরিদর্শক আমিনুল ও বকুল একজন নারী নিয়ে দোকানে আসেন। তাঁরা লাচ্ছি, কফিসহ বিভিন্ন খাবার খেয়ে বিল না দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। এমন সময় আমার ছেলে রবিন তাঁদের কাছ থেকে বিল চাইলে বরফ কম দেয়ার অভিযোগ তুলেন এবং নিজেদেরকে পুলিশের লোক পরিচয় দিয়ে বিল দিতে চাচ্ছিলেন না।
রীনা আরও বলেন, বিল না দিতে চাওয়ার প্রতিবাদ করলে রবিনকে থাপ্পর দেন তাঁদের একজন। এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় আমার স্বামী জালাল উদ্দিন ও অপর ছেলে আলামিনকে মারধর করেন ডিবির দারোগারা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে বাধা দিলে তাঁরা দুজন আমাকেও মারধর করে।
১০ মিনিটের ব্যবধানে দুই মামলা
চৌরঙ্গী পার্কের সামনে মাইলাইফ ফাস্ট ফুডের দোকানে লাচ্ছি খাওয়াকে কেন্দ্র করে ডিবির সঙ্গে ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর সংঘাতের ঘটনায় ২টি মামলা হয়েছে। ১০ মিনিটের ব্যবধানে ডিবি পুলিশের পক্ষ হতে এই দুটি মামলা করা হয়। দুটি মামলার বাদী ডিবির এএসআই আমিনুল হক। একটি মামলাতে মাইলাইফ ফাস্টফুডের মালিক জালাল উদ্দিন, তার ছেলে রবিন, আলামিন ও স্ত্রী রীনা ইয়াসমিনকে আসামি করা হয়েছে। অপর মামলার আসামি সবাই অজ্ঞাত।
সোমবার ভোররাত ৩টা ৩০ মিনিট ও ৩টা ৪০ মিনিটে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা দুটি রেকর্ড হয়। এদিকে সোমবারেই মামলা দুটি বাদী আমিনুল ইসলামসহ ডিবির ৭ কর্মকর্তা ও এক কনস্টবলকে ক্লোজ করে পুলিশ লাইনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
দুটি মামলায় আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, বেইআইনীভাবে জনতাবদ্ধ হয়ে পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধা প্রদান ও দেশীয় অস্ত্র শস্ত্র দ্বারা হত্যার উদ্দেশ্যে মারপিট করে সাধারণ ও গুরুতর আঘাত এবং হুকুম দেওয়ার অপরাধ। একটি মামলায় জালাল উদ্দিন ও তার পরিবারের সদস্যের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ২০ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়। অপর মামলায় অজ্ঞাত ৪০ থেকে ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ইত্তেফাক/কেআই
