থমকে আছে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকা ঢেলে সাজাতে বেশকিছু সাহসী উদ্যোগ নিলেও মেয়রের মৃত্যুর পর মুখ থুবড়ে পড়েছে এগুলো। আবার যেগুলোর কাজ শুরু হয়েছে, সেগুলোও চলছে ঢিমেতালে।
নগরবিদরা বলছেন, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন না হলে নগরবাসী বঞ্চিত হবেন। তার মতো কাজগুলো চালিয়ে নেওয়ার মতো নেতৃত্ব না থাকাই এর মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, আনিসুল হক যে সকল উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘বাস রুট র্যাশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা’ নামক প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছিলেন আনিসুল হক। প্রকল্প অনুযায়ী, ছয়টি কোম্পানির মাধ্যমে চার হাজার বাস নামানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আনিসুল হকের মৃত্যুর পর প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। তবে সমপ্রতি ছাত্র আন্দোলনের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকনকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সাথে প্রথম বৈঠকও সম্পন্ন করেছে। তবে প্রকল্পটি বাস্তাবায়ন করে রাজধানীতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দু’বছর সময় লাগবে বলে জানান সাঈদ খোকন।
অন্যদিকে আনিসুল হক সাহসিকতার সাথে নেতৃত্ব দিয়ে তেজগাঁওয়ে ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করতে পেরেছিলেন। তার মৃত্যুর পর জায়গাটি দখল হলেও সমপ্রতি উত্তরের প্যানেল মেয়র মো. জামাল মোস্তফা সড়কটি পরিদর্শন করতে যান। তখন সড়কটি দখলমুক্ত ছিল। এসময় তিনি ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক সমিতির নেতাদের বলেন, মেয়র আনিসুল হক সড়ক দখলমুক্ত রাখতে সবাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এখন পর্যন্ত সড়কটি দখলমুক্ত আছে।
তবে আলোর মুখ না দেখা আনিসুল হকের অন্যতম প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউটার্ন নির্মাণ, গাবতলীতে ৫২ একর জমি উদ্ধার, বর্জ্য থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্লান্ট নির্মাণ, পার্ক ও খেলার মাঠ নির্মাণ, শৌচাগার নির্মাণ, এলইডি বাতি ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন, গ্রিন ঢাকা ক্লিন ঢাকা। ২০১৫ সালে সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউটার্ন নির্মাণের পরিকল্পনা করেন তিনি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে জমি বুঝে না পাওয়ায় বর্তমানে উত্তরার র্যাব-১ এর কার্যালয় ও রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স বাদে বাকি নয়টি জায়গায় নির্মাণকাজ বন্ধ আছে।
উত্তর সিটি এলাকায় আলো ঝলমলে ও নিরাপদ করতে এলইডি বাতি ও সিসি ক্যামেরা স্থাপনের স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রয়াত মেয়র। ৪৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি অনুমোদনও পায় একনেকে। কিন্তু এখনো প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি।
২০১৬ সালের মে মাসে উত্তরায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সবুজ ঢাকা’ নামের একটি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন আনিসুল হক। প্রকল্পের অংশ হিসেবে উত্তরা এলাকায় ২৯ হাজার গাছের চারা লাগানো হয়। বর্তমানে উদ্যোগটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। ডিএনসিসির পরিবেশ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তারিক বিন ইউসুফ জানান, প্রকল্পটিতে সিটি করপোরেশনের কোনো টাকা বরাদ্দ ছিল না। মেয়র ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করছিলেন। এখন এই প্রকল্পের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
রাজধানীবাসীকে সেবাদানকারী ২৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজের সমন্বয় করতে নিয়মিত সভা করতেন আনিসুল হক। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিপত্র জারি করার জন্য ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট ২৬টি সেবাদানকারী সংস্থার সঙ্গে প্রথম সমন্বয় সভা করেন তিনি। ২০১৭ সালের ২ জানুয়ারি ডিএনসিসি, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা ওয়াসা এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে আরেকটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। মেয়র মৃত্যুর পর আর কোনো সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদ মোবাশ্বের হোসেন জানান, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা না হলে নগরবাসী বঞ্চিত হবেন। ঢাকা শহরে আনিসুল হকের মতো শক্তিশালী নেতৃত্ব দরকার। যারা বর্তমানে দায়িত্বে আছেন তারা চাইলে উদ্যোগগুলো বাস্তবে রূপ দিতে পারেন।
ইত্তেফাক/নূহু
