জিহাদের উচ্চশিক্ষার লড়াই

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৫:৩০

উমর ফারুক-রেহানা আক্তার দম্পতির দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে ছোট জিহাদ হাছান। ২০০২ সালে স্বাভাবিক জন্ম হলেও তিন বছর বয়সে থমকে যান জিহাদ। একাধিকবার টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ায় হাত-পা, ঘাড় বাঁকা হয়ে যায় তার। আটকে যায় স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশ। প্রায় তিন বছর এই হাসপাতাল, ওই হাসপাতাল ঘুরেও জিহাদকে স্বাভাবিক করতে পারেননি মা-বাবা। 

তবে ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাননি অদম্য মা রেহানা আক্তার। শারীরিক প্রতিবন্ধী জিহাদকে নিয়ে ছুটেছেন এই বিদ্যালয়ে, সেই বিদ্যালয়ে, কলেজে। ৩৪ ইঞ্চির জিহাদ সব বাধা উপেক্ষা করে এবার ভর্তি হয়েছেন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এ বছর গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ২০২০-২১ সেশনে ভর্তি হয়েছেন জিহাদ।

পটুয়াখালী জেলার দুমকী উপজেলার ফারুক হোসেন আর রেহানা আক্তারের ছেলে জিহাদ। বাবার সেনাবাহিনীর চাকরির সুবাদে বেড়ে ওঠা ঢাকায়। বড় বোন ফারজানা আক্তার মনির পড়াশোনা দেখে প্রতিবন্ধী জিহাদের আগ্রহের যেন কমতি ছিল না। শারীরিক বাধা আর অসুস্থতা ছাপিয়ে পড়ার আগ্রহ দেখে প্রথমে তাকে ভর্তি করা হয় স্থানীয় একটি মাদ্রাসায়। পরে ভর্তি করা হয় স্থানীয় মুসলিম মডার্ন একাডেমিতে। সেখান থেকেই পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ হন জিহাদ। এরপর ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ পান। শারীরিক উচ্চতার কারণে প্রথমে ভর্তি হতে বাধা এলেও পরে ভর্তির সুযোগ পান। সেই থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি জিহাদকে। নিজের মেধা আর চেষ্টা দিয়ে সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এসএসসি ও এইচএসসিতে কৃতিত্ব দেখিয়ে ভর্তির সুযোগ পান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।

অদম্য মেধাবী জিহাদ ঢাকা বোর্ড থেকে ২০১৮ সালে ৪.৮৭ জিপিএ নিয়ে এসএসসি এবং ২০২০ সালে ৪.২৫ জিপিএ নিয়ে এইচএসসি পাশ করেন। আত্মপ্রত্যয়ী জিহাদ হাসান বলেন,‘ দুচোখে অনেক স্বপ্ন। আমি ভবিষ্যতে পড়াশোনা শেষ করে দেশের সেবা করতে চাই। আমার আম্মু আমার জন্য অনেক কেঁদেছেন। অনেক কষ্ট করেছেন। মায়ের চোখের পানি মুছে দিতেই আমি পড়াশোনা বেছে নিয়েছি।’ জিহাদ জানান, শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতার জন্য নানাজনের কাছে হাসির পাত্র হলেও পরিবারের সমর্থন ছিল সব সময়ই। বিশেষ করে তার ডাক্তার বড় বোন তাকে সাপোর্ট দিয়েছেন সব সময়। বড় বোন ডা. মনি বলেন, ‘তিন বছর বয়সে জেনেটিক অ্যাকোন্ড্রোপ্লাসিয়ায় আক্রান্ত হলে স্বাভাবিক বৃদ্ধি থেমে প্রতিবন্ধী হয়ে যায় জিহাদ। আত্মীয়-স্বজন, আশপাশের মানুষ প্রতিবন্ধী থাকায় তাকে উপহাস করা এবং আমাকে প্রাধান্য দেওয়ায় তার মন খারাপ হতো। আমি তাকে বলতাম, তুমি কষ্ট নিও না। তুমি পড়াশোনা করলেই তোমাকে সবাই প্রাধান্য দেবে। আমার মতো আদর করবে, ভালোবাসবে। তার অদম্য ইচ্ছা আর মায়ের পরিশ্রমেই আজ সফল হয়েছে।’

জিহাদকে নিয়ে তার মা রেহানা আক্তার বলেন, ‘প্রত্যেক মা-বাবাই স্বপ্ন দেখে সন্তানদের নিয়ে। আমার সন্তানকে নিয়েও দেখেছি। আশপাশের মানুষের বিদ্রুপের কারণে অনেক কান্না করেছি সন্তানকে নিয়ে। কিন্তু আমি থেমে যাইনি| আজ আমার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। আমার স্বপ্নপূরণ হয়েছে। আমার ছেলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা হয়েই দেখাবে।’

ইত্তেফাক/এমএএম