প্রাণিকুলের প্রতিটি শ্রেণির মধ্যেই ভাষার ভিন্নধর্মী রূপভেদ ও পার্থক্য বিদ্যমান। বিভিন্ন ভঙ্গিতে শব্দ ও সুরের তারতম্যে স্থাপিত হয় তাদের যোগাযোগ কার্যক্রম। শব্দ শিল্পের এই বিশেষত্ব মনুষ্য প্রজাতির বেলায়ও সমানভাবে কার্যকর। যাকে বাংলায় উচ্চারণভঙ্গি বা বাচনভঙ্গি বলে। মূলত স্বজাতিগত পার্থক্যের জের ধরেই সূচিত হয় এই পরিবর্তন। যেমন, বাঙালি জাতি বাংলায়, ডেনমার্কের অধিবাসীগণ ড্রানিস এবং স্পেনের জনগণ স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে। এটা জাতিগত অধিকার ও স্বভাবগত এক জীবনদর্শনের নাম।
১৯৫২ সালে পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠী বাঙালি জাতির এ জীবনদর্শন তথা প্রাণের ভাষায় ধারালো থাবার আঘাত হানে। জব্দ করতে আশ্রয় নেয় গ্রেনেড-বুলেটের। মেতে উঠে নির্মম হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞে। তবে, এই অমানবিকতা রুখতে বাঙালি টগবগে তরুণ-যুবক অসমসাহসী বীরবাহুগণ জড়ো হন রাজপথে। নিজেদের জীবনের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনেন মাতৃভাষার ন্যায্য অধিকার। প্রতিষ্ঠা করেন কথা বলার স্বাধিকার। পরবর্তীকালে গণআন্দোলন, সংগ্রাম ও কোটি প্রাণের বিনিময়ে ঘাতকমুক্ত হয় দেশ। আমরা পাই স্বাধীন ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব এবং মায়ের ভাষায় মতবিনিময়ের স্বাদ।
নিজস্ব ভাষায় কথা বলার আত্মতৃপ্তির চেয়ে সেরা কিছু খুঁজে পাওয়া ভার। তাই তো বিদেশের মাটিতে স্বজাতির আচমকা সাক্ষাৎ যেন হাতে পাওয়া অমূল্য পূর্ণিমার চাঁদ। একই ভাষা, মনের ভাব, মেলবন্ধন আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের রেশ নিয়ে আপনত্বের টানে বারংবার একত্রিত হওয়া। আর এভাবেই শৈল্পিক বাচনভঙ্গি আর মাধুর্য্যপূর্ণ শব্দবিন্যাসের গাঁথুনি দ্বারা এ মাটির বেশ কয়েক জন সন্তান কুড়িয়েছেন জনগণের সীমাহীন দোয়া, আশীর্বাদ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। পরিণত হয়েছেন গণমানুষের অধিকার আদায়ী সম্মোহনী ব্যক্তিত্বে। পরবর্তী সময়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এবং আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ও সত্যনিষ্ঠ তেজোদীপ্ত আহ্বানে বিদিশার অমাবস্যায়ও জাতিকে পথ দেখিয়েছেন এই মানুষগুলো।
স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে এদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষজন গ্রহণ করেছিল মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার শপথ। তবে, সম্প্রতি সেই শপথ রক্ষায় যেন বিবর্ণ মরীচিকার আবরণ পড়তে শুরু করেছে। ব্যক্তিগত জীবন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ভাষায় অশালীন মন্তব্য, অকথ্য ভাষায় সম্বোধন আর অপভাষার ব্যবহার যেন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসবের অধিকাংশই সংগঠিত হচ্ছে দেশের বিকৃত মস্তিষ্কধারী অসুস্থ মননশীলতার অধিকারী নাগরিকদের দ্বারা। রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, গণপরিবহন এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পড়েছে এর নেতিবাচক প্রভাব। বর্তমান তরুণ প্রজন্মও আধুনিকতার নামে চর্চা করছে এই অসুস্থ সংস্কৃতির। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন বার্তা প্রবাহে দেখা মিলছে এসব, যা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিষয়!
ভাষা শহিদদের পবিত্র রক্ত মিশে আছে আমাদের কণ্ঠনিঃসৃত প্রতিটি বাংলা বর্ণের সঙ্গে। তাই শহিদদের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই অমর বর্ণমালার অপপ্রয়োগ সম্পর্কে এখনই সচেতন হতে হবে। বর্জন করতে হবে ভাষার দূষিত রূপের ব্যবহার। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন এবং ভার্চুয়াল জগতেও এ বিষয়ে থাকতে হবে সর্বোচ্চ সতর্ক। পরিত্যাগ করতে হবে সর্ব প্রকার বৈরী ও কুরুচিপূর্ণ মনোভাব। তবেই সম্ভব হবে মাতৃভাষার জন্য জীবন উত্সর্গকারী অনন্যজাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে নিজেদের মর্যাদা আঁকড়ে ধরে রাখার ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অঙ্গীকার। একুশের চেতনায়, স্বাধীনতার প্রেরণায় শুদ্ধ উচ্চারণ, পরিশীলিত শব্দচয়ন এবং বাচনভঙ্গিই হোক আমাদের মাতৃভাষার প্রাণ, গর্ব ও অহংকার।
লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
