কিছু মুগ্ধতার রেশ থেকে যায় যুগ থেকে যুগান্তরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আর সেই মুগ্ধতা যখন আবর্তিত হয় একজন হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে, তখন তা ছাপিয়ে যায় যুক্তি আর তর্কের সকল সীমানা। হুমায়ূন যেন গ্রিক পূরাণের সেই রাজা মাইডাস। জাদুকরী হাতে যা ছুঁয়ে দিয়েছেন, তাই যেন সোনা হয়ে ফলেছে, আর তৈরি করেছে ইতিহাস।
হুমায়ূন আহমেদ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন আজ প্রায় এক দশক হতে চললো। কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন তার কর্মের মাধ্যমে, তিনি এখনো বর্তমান তার সৃষ্টি করা অমর সব চরিত্রের মাঝে। দুই হাজার বাইশের তরুণদের কাছেও হুমায়ূন আহমেদ তাই এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
প্রতি বছরের মতো এবারও শুরু হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা, প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ না থেকেও যেন রয়েছেন বইমেলার উৎসব আর আয়োজনে।
তখন কেবল দেশ স্বাধীন হয়েছে, তরুণ হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করা ঝলমলে তরুণ। ঠিক তখনই তার লেখা নন্দিত নরকে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। যদিও তার লেখা প্রথম উপন্যাস ছিল শঙ্খনীল কারাগার। লেখক হুমায়ূন তার জাত চিনিয়েছিলেন তখনই। এই প্রজন্মের তরুণ লেখকদের জন্য তিনি বিরাট এক অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন। বাঙালি আটপৌরে জীবনকে এক অপার মমতায় ছুঁয়ে দিয়েছেন জাদুকর হুমায়ূন। মধ্যবিত্তের টানাপোড়েনের জীবন আর অভাবের সংসারের পরতে পরতে বুনেছেন নির্মল যাপনের রসদ।
হুমায়ূনের সৃষ্টিশীলতার অনেকটা জুড়ে ছিল দূর্বার তারুণ্য। তার লেখায়, গল্পে আর পরিচালনায় বারবার উঠে এসেছে সেই ভাবনার প্রতিচ্ছবি। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলোতে প্রাধান্য পেয়েছে তরুণদের গল্প আর তাদের জীবন। কেবল এক হিমু চরিত্রকে ভালোবেসে কতো তরুণ খালি পায়ে বেরিয়ে গেছে ঢাকার রাজপথে তার কোনো হিসেব নেই। কেউ বা আবার হতে চেয়েছে শুভ্রর মতো একজন বিশুদ্ধ মানুষ। কোথাও গিয়ে যেন তার সব চরিত্র যেন মিশেছে এক বিন্দুতে। যারা জীবনকে দেখতে চেয়েছে এক অন্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। আর তাই হয়তো হিমু, শুভ্র, মিসির আলী চরিত্রগুলোকে কোনো সময়ের ফ্রেমে বন্দী করা যায় না। পাঠকের যাপনে আর মননে তারা মিশে আছে কাছের মানুষ হয়ে।
একটা প্রজন্ম বই পড়তে শিখেছে এই মানুষটার কারণে। শব্দের মায়াজালে তিনি বুঁদ করে রেখেছিলেন বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের। আর তাই হুমায়ূন এখনো প্রবলভাবে বর্তমান আমাদের মাঝে। আজকের দিনে এসেও হুমায়ূন চর্চা এতোটুকুও কমে নি। বরং বেড়েছে বহুগুণ। যতোদিন ছিলেন সবটুকু আলো যেন নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন এক অপরিসীম ক্ষমতায়।
বইমেলা আর হুমায়ূন আহমেদ এই দুটো শব্দকে আলাদা করা বাঙালির জন্য খানিকটা কঠিনই বটে। মেলায় আসবেন কিন্তু ফেরার পথে হাতে হুমায়ূন আহমেদের একটা বই থাকবে না তা কি হয়? বইমেলার বসন্ত বিকেলের মিষ্টি রোদ আর একজন গল্পের জাদুকর, কোথায় যেন মিলমিশে একাকার হয়ে থাকে বইপ্রেমীদের সবটুকু আবেগ আর ভালোবাসার জায়গা। আর তাই হয়তো তার বইয়ের স্টল গুলোর সামনে থাকে বইপ্রেমীদের উপচে পড়া ভিড়।
সময়ের সাথে বই পড়ার মাধ্যমে এসেছে পরিবর্তন, কাগজের বইয়ের জায়গা দখল নিচ্ছে ই-বুক, পিডিএফ কিংবা অডিও বুক গুলো। তবে মাধ্যম যেটাই হোক, হুমায়ূন আহমেদের বইয়ে যেন কখনোই ক্লান্তি পেয়ে বসে না।
শহীদ পরিবারের সন্তান ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। আর তাই হয়তো তার সৃষ্টির মাধ্যমে বারবারই তিনি ধারণ করতে চেয়েছেন মহান মুক্তিযুদ্ধ আর ভাষা আন্দোলনকে। তরুণ প্রজন্মের কাছে বলে যেতে চেয়েছেন সেই মাতাল সময়ের গল্প। জোছনা ও জননীর গল্প তার এক অনবদ্য সৃষ্টি। প্রকান্ড এ উপন্যাস যেন এ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত দলিল হয়ে আছে। এ বইয়ের পূর্বকথায় তিনি লিখেছিলেন, 'আমার কাছে মনে হচ্ছে এই বইটি লেখার মাধ্যমে আমি দেশমাতার ঝণ শোধ করার চেষ্টা করার চেষ্টা করেছি। এই আনন্দের কোনো সীমা নেই।' তার বানানো সিনেমাতেও বারবার উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ। আগুনের পরশমণি কিংবা শ্যামল ছায়ার মতো সিনেমাগুলো বহুদিন মনে রাখবে মানুষ। সেলুলয়েডের পর্দায় মুক্তিযুদ্ধকে এতো গভীর যত্নে হয়তো আর কেউ তুলে আনতে পারেন নি। দেশকে তিনি ভালোবাসতেন গভীরভাবে । শেষ দিকে তার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, 'বিদেশ থেকে ফেরার সময় প্রতিবারই যখন প্লেন দেশের মাটি স্পর্শ করে, আনন্দে আমার চোখে পানি চলে আসে।'
যতোদিন বাংলা ভাষায় মানুষ কথা বলবে, লিখবে, পড়বে - ততোদিন হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে। বাংলা সাহিত্যের রথী-মহারথী ছিলেন অনেকেই, হয়তো ভবিষ্যতেও অনেকে আসবেন। তবে জাদুকর ছিলেন একজনই, তিনি আমাদের হুমায়ূন আহমেদ।
