বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১১ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মুস্তাফিজ শফির কথাসাহিত্য জীবনের নগ্নতার রূঢ় বয়ান

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৪, ১৮:২৭

কবির গদ্য পড়ার আগে প্রস্তুতি নিতে হয়। গদ্য কিংবা আখ্যানের ভাষায় কি অতর্কিতে ঢোকে কাব্যভাষা? কাব্যের আবশ্যিক অনুষঙ্গ উপমা-উৎপ্রেক্ষায় কি ভারাক্রান্ত হয় গদ্যের শরীর? কিংবা কবির গদ্য বিষয় কি কবিতার মতো কোমল গন্ধমাখা?

এমত ভাবনা তাড়িত আমার পাঠাভিজ্ঞতা বিস্মিত হয়েছে প্রথমত জীবনানন্দের গদ্য পড়ে, দ্বিতীয়ত জয় গোস্বামীর গদ্য পড়ে। কথাসাহিত্যে কবিদ্বয়ের কবিসত্তাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এখানে তারা স্বতন্ত্র সত্তা। গদ্যকারের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। কবিতা মোহিত পাঠক কবিদ্বয়ের গদ্য পাঠ থেকে যারা বিরত, তাদের কাছে নিবেদন রইল কবিদ্বয়ের গদ্য পাঠের।

আমি আজ বসেছি আরেক কবির গদ্য পাঠাভিজ্ঞতা ব্যক্ত করার প্রয়াসে। কবি মুস্তাফিজ শফি। কবি হিসেবেই খ্যাত তিনি। তার গদ্য, গল্প কিংবা উপন্যাস, তার আখ্যান কতটা গদ্যের ব্যাকরণ মেনে কিংবা কতটা অনিবার্য অনতিক্রম্য।

‘জিন্দা লাশ অথবা রমেশ ডোম’ এবং ‘মাধবী কিংবা বনলতার শেষ বোঝাপড়া’ পড়তে গিয়ে আমার যে পাঠযাপন তা একাধারে ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য নিয়ে বিস্ময়ের আর বিষয়গত বিচিত্রতা নিয়ে বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার। ভাষার দিক থেকে মুস্তাফিজ শফির গদ্য কোনোভাবেই পাঠককে স্মরণ করাবে না এ কোন কবির গদ্য। কাব্য গন্ধহীন নির্মেদ ঝরঝরে গদ্য তার, যা কবি মুস্তাফিজ শফি থেকে কথাকার মুস্তাফিজ শফিকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও অনন্য করে তুলেছে।

মুলত কথাশিল্পী মুস্তাফিজ শফি তার উপন্যাস এবং গল্পগ্রন্থে যে বিষয় নির্দিষ্ট করেছেন তা সর্বোতভাবে বিষয়েরই অনুগামী। তিনি যে চরিত্র বা ঘটনাকে আশ্রয় করেছেন তাকে ব্যক্ত করার জন্য তিনি এমন এক গদ্যরীতি প্রয়োগ করেছেন তা যেন কেবল সেই আখ্যান ব্যক্ত করার জন্যই নির্ধারিত ও যথোপযুক্ত।

কী তবে তার কথাসাহিত্যের আখ্যান অথবা কারা এর চরিত্র। শুরুতেই তার অনুসন্ধানে ব্যক্তি কথাকারকে জানা জরুরি। কেননা তার কথাসাহিত্যে ব্যক্তি মুস্তাফিজ শফি তীব্রভাবে উপস্থিত এবং তিনি সচেতনে ব্যক্তি অভিজ্ঞতার বাইরে নৈর্ব্যক্তিক কোনো বিষয় বা চরিত্রকে তার আখ্যানের উদ্দিষ্ট করেননি। হয়তো লেখক হিসেবে এটা তাঁর অকপটতা কিংবা দায়বোধওবা কিছুটা। ব্যক্তিজীবনে সাংবাদিকতা তার পেশা। পেশার খাতিরে সমাজের বিচিত্র শ্রেণির মানুষের সাথে তার যে আন্তঃসংযোগ তাকেই তিনি সাহিত্যের ভাষ্য করেছেন। চেনা গন্ডির বাইরে কোনো চরিত্র কিংবা ঘটনা তার বয়ানকে ভারাক্রান্ত করেনি। তিনি অচেতনেও সে চেষ্টা করেননি। ঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতায় বরং তার চরিত্র এবং ঘটনাগুলো অধিকতর বিশ্বস্থ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। তিনি তার ব্যক্তি কিংবা পেশাগত যাপন অভিজ্ঞতা থেকে যে চরিত্রদের কিংবা যে ঘটনাগুলোকে ছেঁকে নিয়েছেন সাহিত্যের ভাষ্য হিসেবে সেগুলোকে মোটেই গুলিয়ে দেননি সংবাদপত্রের হার্ড নিউজ উপস্থাপনের নির্বিকারত্বে। বরং লেখকসুলভ মমত্বে তিনি অনুপ্রবেশ করেছেন চরিত্র কিংবা ঘটনার অন্দরে এবং যা তিনি দেখেছেন আর যা দেখেননি সৃজনসত্তার সমন্বয়ে তৈরি করেছেন এক অনবদ্য আখ্যান যা পাঠককে সহজেই একাত্ম করে নেয় চরিত্র কিংবা ঘটনাপ্রবাহের সাথে। পাঠক অনায়াসে তার নির্মিত চরিত্রের সহযাত্রী হন, তাদের সংকটে, বিপন্নতায় নিজে বিপন্ন হন। গা শিউরে ওঠা অভিজ্ঞতায় বুঝি নিজেই তার চাক্ষুষ সাক্ষী হন। কিভাবে তিনি নিজেকে বিভক্ত করেন কবি, কথাশিল্পী অথবা সাংবাদিকের তিনটি ভিন্ন সত্তায়? এ বিবেচনা থাক তার নিজস্ব।
আমরা পাঠকরা আপাত পরিভ্রমণ করি তার কথাসাহিত্যের ভুবনে।

‘জিন্দা লাশ অথবা রমেশ ডোম’ তার উপন্যাস। স্বল্পায়তন এবং সুবিন্যস্ত। উপন্যাসটির নাম বলে দেয় এর চরিত্র কিংবা ঘটনা বিন্যাসের গতি-প্রকৃতি। রমেশ ডোম, নামেই তার পেশার পরিচয়। কিন্তু তার যাপিতজীবনের বর্ণনা শব্দে বাক্যে বর্ণনায়িত করে কেন রমেশ ডোম জিন্দা লাশ। বংশানুক্রমে এদের যে ভয়াবহ যাপন যা আমাদের সোকল্ড ভব্য নাগরিকের অভিজ্ঞতা তো বটেই কল্পনারও অতীত, সেই অদেখা অজানা ঘুপচি অন্ধকারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন আমাদের। যে অন্ধকার আমাদের মসৃৃণ দিনকে নিশ্চিত কিংবা ভদ্রস্ত যাপনকে ভীষণ রকম বিপন্ন করে তোলে। পড়তে পড়তে আমরা যেন-বা আঁৎকে উঠি। আমাদের নির্বিঘœ দিন কেউ চেপে ধরে নগ্ন বাস্তবতার অক্টোপাসে।

আমাদের হাতে বাংলা চোলাই নেই। আমরা মোটেই বিস্মৃত হতে পারি না অন্তঃসত্ত্বা সেই নারীটিকে, মর্গে পেট কেটে বের করে আনা হয় যার নিষ্পাপ শিশুকে। স্তনবৃন্ত কাটা ক্ষত-বিক্ষত সেই মেয়েটি আমাদের স্নায়ু চেপে ধরে। আমাদের এই প্রতিদিনের ক্ষুন্নিবৃত্তির জীবন কিংবা বৈভবের মহড়া সব আয়োজন যেন মিথ্যা হয়ে যায় চাটাই বাঁধা মরদেহের সামনে। ফরমালিন ছিটিয়ে টিকিয়ে রাখা মৃতদেহ যেন সম‚লে নাড়িয়ে দেয় আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। একেকটা মৃতদেহ একেকটা সামাজিক অস্থিরতার নিষ্প্রাণ দলিল। যে দলিল ফালাফালা করে রমেশ ডোম ছুড়ে দেয় এই প্রতারক সমাজের মুখ বরাবর। হাসপাতালের আড়ালে একটা ঘুপচি ঘর, কেউ হয়তো খুব মনোযোগে দেখেও না সেই ঘরটি, সেই ঘরে রমেশ ডোম যার হাতের ছুরিতে একের পর এক লিখিত হতে থাকে এই ভন্ড সমাজের ভন্ডামির ইতিহাস। কাগজ-কলমহীন অলিখিত দলিল। আমরা প্রতি পঙ্ক্তিতে টের পাই কী করে রমেশ ডোম হয়ে ওঠে জীবন্ত লাশ।

নিজের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তারা বিসর্জন দেয় এই দায়িত্বের কাছে। শেষ পর্যন্ত যে দায়িত্বের ছুরির নিচে বুক চেরার জন্য তৈরি হয় তার নিজেরই প্রিয়তমা।
কী রূঢ় এই সমাজের চরিত্র, উপেক্ষিত, অনালোকিত একজন মানুষ, একটি পেশা ডোম শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠে জীবন্ত এক কালের সাক্ষী। লেখক কি এই জীবন দেখেছেন? কিংবা উপন্যাস লেখার জন্য যাপন করেছেন তার বেদনা। হয়তো হ্যাঁ, হয়তো না। কিন্তু সাংবাদিকের পেশার বাইরে প্রতিবেদনের সীমানা অতিক্রম করে তিনি রচনা করেছেন এক অপরিচিত জীবনের আখ্যান। যে আখ্যান পাঠের বেদনা আমাদের বিদীর্ণ করে রাখে বহুকাল।

মুস্তাফিজ শফির মাধবী কিংবা বনলতার শেষ বোঝাপড়া ১১টি ছোটগল্পের সংকলন। ছোটগল্পগুলোও লেখকের পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা জারিত। সেই ঝড়ের পরের গল্পের শামীম, ফাঁদ গল্পের লায়লা, অন্ধকারে কাঁচঘরের নীলা শাকিল মামুন কিংবা নাম গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র মাধবী। এরা কেউ লেখক কল্পনায় নির্মিত চরিত্র নয়। বরং আমাদের জীবন জটিলতায় মিশে থাকা অনিবার্য কিছু মানুষ। যাদের চাইলে অস্বীকার করা যায় না কিন্তু আমরা অস্বীকারের ভানে স্বাভাবিকতা আরোপ করে পার করি আমাদের দৈনন্দিন দিন। মুস্তাফিজ শফির গল্পের চরিত্র কিংবা ঘটনা আমাদের যেভাবে জীবনের অনালোকিত দিকগুলো আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয় আমরা বিপন্ন হই, পাঠক হিসেবে আমরা জানি আমাদের জানার বাইরে জীবনের কত গলি ঘুপচি রূঢ়তা জটিলতা!

হয়তো পত্রিকার পাতায় পড়া সেই খুনটির অন্তর্নিহিত সমীকরণ আমাদের কোনোকালে জানা হতো না। ফলোআপ স্টোরি এড়িয়ে যেত এর গোপন বাঁক, কেন লাজ ফার্মার সামনে গুলিবিদ্ধ হয় শাকিল। যে রক্তাক্ত খুন কিংবা নববিবাহিত বৃদ্ধের মৃত্যুর খবরটি পত্রিকার পাতায় পড়ে আমরা বেমালুম বিস্মিত হয়ে ডুবে যাই নিত্য নিস্তরঙ্গ ক্ষুন্নিবৃত্তির কিংবা বিলাস-ব্যসনের জীবনে। মুস্তাফিজ শফির সাহিত্য হঠাৎ সেখানে ঢিল ছোড়ে। আমাদের ভেতর থেকে খুঁচিয়ে জাগায় অন্য আমাদের। আমরা তাকে পারি না এড়াতে। কারণ জীবনের আনন্দ অন্বেষণের যাবতীয় আয়োজন শেষে যে বিন্দুসম অমৃতের সন্ধান, ক্ষরণের ভার যে এর চেয়ে নিযুত গুণ বেশি।

ইত্তেফাক/এআই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন