গত কয়েক মাস ধরে ইউক্রেন সীমান্তে সেনাসজ্জা বাড়িয়ে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়েছে রাশিয়া। আর রাশিয়াকে পেছাতে কূটনৈতিক উদ্যোগও থেমে নেই। কিন্তু এখন পর্যন্ত সফলতা আসেনি। বর্তমানে ইউক্রেন পরিস্হিতি খুবই সংকটজনক অবস্হায়ে এসে পৌঁছেছে।
কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে বিশ্বকে আরেকটি যুদ্ধ দেখতে হবে। সফলতা আসলে একটা বড় ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচবে ইউরোপসহ বাকি বিশ্ব। কিন্তু এখন পর্যন্ত রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে চলছে কৌশলের খেলা। সবার খেলার মধ্যে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ইউক্রেনবাসী। তাদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যুদ্ধ এখন তাদের দরজার সামনে।
রাশিয়ার কৌশল
ইউক্রেনকে রাশিয়া তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটি দেশ মনে করে। দেশটির বেশির ভাগ মানুষই রুশভাষী। কয়েক বছর আগেও ইউক্রেনের ক্ষমতায় ছিলেন রুশপম্হিরা মস্কো মনে করে, পশ্চিমা বিশ্বই ইউক্রেনে তাদের লোকদের সরিয়ে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট পুতিন মনে করেন, ইউক্রেন যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিল, তাই তাদের আবার পিতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনা বা ফিরে আসার নৈতিক অধিকার আছে। যেমন তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন একটা প্রদেশ মনে করে চীন। ইউক্রেন এবং তাইওয়ান ইস্যুতে রাশিয়া এবং চীন একই কৌশল গ্রহণ করেছে। আর পশ্চিমা বিশ্বও ইউক্রেন এবং তাইওয়ানকে যথাক্রমে রাশিয়া এবং চীনের সঙ্গে খেলায় তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে বলে দেশ দুটির ধারণা।
ইউক্রেনকে সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। এই খবর পেয়েই রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে শুরু করে। প্রেসিডেন্ট পুতিন মনে করছেন, ন্যাটোর সদস্যপদ ঠেকাতে এর বিকল্প তার কাছে নেই। প্রয়োজনে ইউক্রেনে হামলা চালাতেও তিনি দ্বিধা করবেন না। ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্যপদ পেলে তাকে আর ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। কারণ তখন বিপদে পড়লে ইউক্রেনে সৈন্যও পাঠাতে পারবে ন্যাটো। শত্রুদের সঙ্গে কিয়েভ গাঁটছড়া বাঁধলে তা মস্কোর জন্য ভবিষ্যতে বিপদ ডেকে আনতে পারে। এমনকি রাশিয়াকেও আবার বিভক্তের উদ্যোগ নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা।
রাশিয়া বারবার বলছে, তারা ইউক্রেনে হামলা চালাবে না। কিন্তু রাশিয়ার সামরিক এবং কূটনৈতিক প্লেবুকে গুপ্তচরবৃত্তি এবং সামরিক আগ্রাসনের ইতিহাস আছে। যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছিল, ১৬ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালাবে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় গোয়েন্দারা জানিয়েছিল, জানুয়ারিতেই মস্কো কিয়েভে অভিযানে নামবে। কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্ত থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়।
১৬ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যাতে সৈন্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়। কিন্তু ন্যাটো এবং পশ্চিমা গোয়েন্দারা জানান, এ ধরনের কোনো ঘটনাই আসলে ঘটেনি। বরং কিয়েভ সীমান্তে রুশ সৈন্য মোতায়েনের সংখ্যা আরো বেড়েছে। রাশিয়া উত্তর, দক্ষিণ এবং পূর্বে সৈন্য মোতায়েন করেছে, যেখান থেকে প্রেসিডেন্ট পুতিনের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই ইউক্রেনে হামলা চালানো যাবে। সাইবার হামলাও রাশিয়ার কৌশলের একটা অংশ। যদিও রাশিয়া অস্বীকার করেছে। গত মঙ্গলবার ইউক্রেন এবং জর্জিয়ার সরকারি ওয়েবসাইটে হামলা চালানো হয়। এটা রাশিয়ার প্লেবুকেরই অংশ বলে মনে করেন মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট ফর পলিটিকস ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড। তিনি বলেন, এর আগেও রাশিয়া তার শত্রুদেশের সরকারগুলোর ক্ষতি করা এবং তাদের ক্ষমতা যাচাইয়ে এ ধরনের হামলা চালিয়েছিল।
মস্কো বুঝতে পারছে, ২০১৪ সালে আকস্মিকভাবে ক্রিমিয়া দখল করার মতো এবার ইউক্রেনে হামলা চালানোটা সহজ হবে না। তাই প্রেসিডেন্ট পুতিনও পালটা কৌশল নিয়েছেন বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। তিনি দোষ নিজের ঘাড়ে নিতে চান না।
ধারণা করা হয়, ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে সম্প্রতি রুশপন্থিদের সঙ্গে ইউক্রেন বাহিনীর যে সংঘর্ষ চলছে তা পুতিনের প্লেবুক থেকেই নেওয়া। লন্ডনভিত্তিক স্বাধীন পলিসি ইনস্টিটিউট ক্যাথাম হাউজের রাশিয়ার পাওয়ার প্রজেকশন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কেইর গেইলসের মতে, পুতিন বিশ্বকে দেখাতে চান যে, তিনি নিজেকে রক্ষার জন্যই অন্য দেশে হামলা চালাতে বাধ্য হন, যাকে বলা হয় ‘পেপার ট্রেইল’।
তিনি বলেন, রাশিয়া কখনো যুদ্ধ শুরু করে না, কেউ আমন্ত্রণ জানালেই রুশ সৈন্য অন্য দেশে যায়, সেটাই বোঝাতে চান পুতিন। রাশিয়ার আরেকটি কৌশল হলো অস্বীকার করা, যেটা ইউক্রেন ইস্যুতে মস্কো বারবার করেই যাচ্ছে। আর হচ্ছে, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং প্রতারণা করা। ক্রিমিয়া দখলের সময় রাশিয়া সেই প্রমাণ রেখে গেছে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল’স ইন্টেলিজেন্সের গবেষণা বিষয়ক পরিচালক কালডার ওয়ালটন বলেন, ঠান্ডা মাথার যোদ্ধা এবং সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট পুতিন ভালো করেই জানেন গোয়েন্দা তথ্য কীভাবে সমন্বয় করতে হয় এবং শক্তিশালী নেতা হতে হয়, তা ভাল করেই জানেন। তিনি জানান, ১৯৬৮ সালেও চেকোস্লোভাকিয়ায় হামলার অজুহাত তৈরি করেছিল ক্রেমলিন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ-ইউক্রেনের কৌশল
রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে সৈন্য মোতায়েনের পরই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় গোয়েন্দারা বলে আসছেন, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালাবে। একবার জানুয়ারি, এরপর ফেব্রুয়ারি এবং এরপর পশ্চিমারা বলছে, খুব দ্রুতই হামলা চালাবে রাশিয়া।
এবার বলা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেনে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এ কথা বলেছেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অস্টিনসহ দেশটির সিনিয়র এমন কোনো কর্মকর্তা নেই যে, যিনি ইউক্রেন ইসু্যতে কথা বলেননি। প্রেসিডেন্ট বাইডেন জানান, প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেনে হামলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাশিয়ার হামলার কথা বাইডেন প্রশাসন বললেও সে-রকম ঘটনা ঘটেনি।
এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নেড প্রাইস জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ কাজটি করা হয়েছে এবং এটা একটা কৌশল। তিনি বলেন, আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো যুদ্ধ এড়ানো। আমরা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি অন্যান্য প্রস্ত্ততিও নিচ্ছি। তাদের এই কৌশল প্রেসিডেন্ট পুতিনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার হিসাব-নিকাশে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন দূত লিন্ডা থমাস গ্রিনফিল্ড বলছেন, হামলার হুমকি এখনো কার্যকর। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতি এবং বারবার হুমকির কথা বলা অন্তত প্রেসিডেন্ট পুতিনের হামলায় বিলম্ব ঘটাতে পারে। ওয়াশিংটন আশা করছে, বিলম্ব ঘটানোর মধ্যে মস্কো হয়তো সমঝোতার টেবিলে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এখন বলছে, রাশিয়া হামলার অজুহাত তৈরি করছে। ইতিমধ্যে ডনবাস অঞ্চলে রুশ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলা সেই আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণ করছে। আবার পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে এই আতঙ্ক দেখা দিয়েছে, ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমাবিশ্ব নজর না দিলে তাইওয়ানেও চীন একই ধরনের কাজ করতে পারে।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন শনিবারই সেই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। আবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদেমির জেলেনস্কিও কৌশল অবলম্বন করছেন। তিনি পশ্চিমা বিশ্বকে কাছে টানলেও আবার তাদের হুমকিকে পাত্তা দিচ্ছেন না। তিনি এক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সমালোচনাও করছেন। তিনি রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ সবাইকেই খুশি করতে চাইছেন। রাশিয়া যেহেতু বলছে, ইউক্রেনে হামলার চালানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তাই ইউক্রেনও অঙ্গীকার করেছে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি।
