বাংলা ভাষার সঙ্গে বৈরিতা 

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৬:০২

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে এ পর্যন্ত ১৭টি সংশোধনী ও নানা অংশ সংযোজন-বিয়োজন করা হলেও তৃতীয় অনুচ্ছেদে কোনো আঁচড় লাগেনি। ঐ অনুচ্ছেদে তিন শব্দে উল্লিখিত বাক্য ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ প্রথম থেকেই বিদ্যমান। এ নিয়ে কারো কোনো বিরোধিতা নেই। এ বিষয়ে কোনো সংশোধনীর প্রস্তাবনা নেই। বাংলা ভাষার প্রকাশ্য কোনো শত্রুও নেই। সবাই প্রকাশ্যে বাংলা চায়, বাংলা ভাষার প্রস্তুতি করে। কিন্তু বাস্তবে পদে পদে বাংলার সঙ্গে শত্রুতা পরিলক্ষিত হয়।

স্বাধীনতার পর বাংলা ভাষা যোগ্যতার অন্যতম মানদণ্ডরূপে বিবেচিত হলেও বর্তমানে ইংরেজি সে জায়গা দখল করেছে। অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধার বিচারে, নিয়োগ, যোগ্যতা-দক্ষতার ক্ষেত্রে বর্তমানে বাংলার কোনো স্থান যেন নেই। এ কারণে বাংলাকে অবলম্বন করা বা শেখার আবশ্যকতা নেই। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নতুন পদ, শাখা-প্রশাখা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাক্রম, পাঠ্যক্রম, কোম্পানি, বিজ্ঞাপন সর্বস্তরে আজ ইংরেজি-বাংলার সংঘর্ষ; বাংলা ভাষার বিশৃঙ্খলা ও ব্যর্থতা।

বাংলাদেশে প্রযুক্তির ভাষা ইংরেজি, প্রযুক্তি শিক্ষার ভাষাও ইংরেজি। দেশের প্রযুক্তিবিদ, ব্যবস্থাপকগণও কার্যক্ষেত্রে ইংরেজি ব্যবহার করেন। অধিকাংশ পণ্ডিতেরা এখনো ইংরেজিনিষ্ঠ। ইংরেজিই তাদের শিক্ষা, আভিজাত্য ও যোগ্যতার মানদণ্ড। ইংরেজিতেই অনেকের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষিত হয় বলে ইংরেজি ব্যবহারেই তারা বেশি উৎসাহ বোধ করেন। দেশীয় সমাজ, সংস্কৃতি ও সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণার ক্ষেত্রে ইংরেজিকেই অবলম্বন করা হয়। বলা যায়, যখন কোনো গবেষক বাংলা ভাষায় সমাজ-রাষ্ট্রের নানা ক্রিয়াকলাপ-প্রক্রিয়া ব্যাখ্যায় মন দেন, তখন তিনি উদ্ঘাটন করতে চান বিষয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র। তাদের লক্ষ রচনাকে মূল্যবান করা। আর যখন ইংরেজিতে লেখেন, তখন তিনি হয়ে ওঠেন তথ্য-উপাত্ত সরবরাহকারী।

বাংলা ভাষা প্রতিরোধের মুখোমুখি হয় শিক্ষা এলাকায়; প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় প্রশাসন-এলাকায়, গুরুত্বহীন থাকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়, বাধাগ্রস্ত হয় উন্নয়ন পরিকল্পনায়, সর্বোপরি বিলীন হয় বিভিন্ন প্রকল্প প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে। ভাষার সংরক্ষণ-প্রসারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও মাধ্যমগুলোও যেন বাংলার সঙ্গে শত্রুতায় মেতেছে। একটি শ্রেণি নিজেদের স্বার্থে, আরেকটি শ্রেণি অসাবধানতায়, ঠুনকো পাণ্ডিত্য জাহিরে বাংলা ভাষাবিরোধী ক্রিয়াকলাপ করছে, কারণে-অকারণে ঝকঝকে তকতকে বাংলা শব্দ-বাক্য বাদ দিয়ে বিদেশি শব্দের প্রতিবর্ণীরূপ বাংলায় লিখছে। এর ফলে বাংলা ভাষা স্বদেশে দিন দিন দ্বিতীয় ভাষায় পরিণত হচ্ছে।

‘উন্নয়নপ্রক্রিয়ার প্রবণতা হচ্ছে উন্নয়নের ভাষারূপে মাত্র একটি ভাষার প্রাধ্যান্য প্রতিষ্ঠা করা।’ একাধিক ভাষার ব্যবহার উন্নয়নের কাজে নানারকম বিঘ্ন ঘটায়। কিন্তু বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় উপরের অংশে বিশেষ করে পরিকল্পনা পর্যায়ে ইংরেজি ভাষার একচ্ছত্র প্রভাব বিদ্যমান। যদি শুধু বাংলাকেই উন্নয়নের ভাষারূপে ব্যবহার করা হতো, তবে বাংলা ভাষা দ্রুত মানরূপ পেত—নতুন শব্দ গঠিত হতো, বাক্যসংগঠনে শৃঙ্খলা অর্জন করত।

বাংলা ভাষায় আত্মীকৃত শব্দের তালিকা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে বাংলা ভাষায় ব্যবহূত বিদেশি শব্দের অভিধান। এসব অভিধানে প্রচলিত অনেক শব্দের জায়গায় আত্মীকৃত নতুন শব্দও পরিলক্ষিত হচ্ছে। একটি অভিধানে পাগলামি, সম্ভান্ত, মূর্খ, আলোচ্য বিষয়, দুঃসাহসী ও অকৃত্রিম শব্দের পরিবর্তে যথাক্রমে ‘ইনস্যানিটি’, ‘উজাইহা’, ‘উজবক’, ‘উমুর’, ‘কাদূম’ ও ‘খালসা’ আত্মীকৃত শব্দ হিসেবে ভুক্তি হয়েছে। স্বভাবত প্রশ্নটি সামনে আসছে, প্রচলিত শব্দ বাদ দিয়ে এমন শব্দ ব্যবহার করার যৌক্তিকতাই-বা কী! কোনো ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর কত শতাংশ অন্য ভাষার একটি শব্দ-বাক্য ব্যবহার করলে সেটি সংশ্লিষ্ট ভাষায় আত্মীকৃত হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে কোনো ভাষার শুদ্ধ, প্রচলিত শব্দকে সংশ্লিষ্ট ভাষীর কত শতাংশ ব্যবহার না করলে সেটির সঙ্গে আত্মীকৃত শব্দটি উল্লেখ করা প্রয়োজনীয় হতে পারে।

খুব গুরুত্ব দিয়ে লেখা হয়, বাংলা ভাষা তার সমৃদ্ধি ও প্রকাশক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বহু বিদেশি ভাষার শব্দ আত্মীকৃত করে নিয়েছে নিজস্ব নিয়মশৃঙ্খলার মাধ্যমে। কিন্তু বাংলা ভাষায় আত্মীকরণের কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ সর্বজনীন নিয়মনীতি কী আছে? যেখানে নতুন নতুন পরিভাষা তৈরি হওয়ার কথা, শুদ্ধ-নির্ভুল বাংলা লেখার কথা, সেখানে উপযুক্ত-প্রচলিত বাংলা শব্দ-বাক্য বাদ দিয়ে বিদেশি শব্দ বাংলা বর্ণমালায় লেখা, বাংলা-ইংরেজি মিশ্রণে শব্দ-বাক্য তৈরি করা কতটা প্রয়োজন, ঠিক ও মর্যাদার সে প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একক-নির্দিষ্ট রাষ্ট্রভাষার দেশে যথোপযুক্ত বাংলা শব্দ-বাক্যকে নির্বাসিত করে বিদেশি ভাষার প্রচলন শুধু বাংলার সঙ্গে শত্রুতাই নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গেও শত্রুতা; সংবিধানে উল্লিখিত ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ অনুচ্ছেদের বিরোধিতা। এটি কি কোনো সুচারু শত্রুতা, নাকি ষড়যন্ত্র সে বিষয়েও গবেষণা প্রয়োজন।

বাংলায় তারিখ লেখার কারণে প্রজাতন্ত্রের মন্ত্রী মহোদয়ের চেক পাশ না হওয়ার খবর যে দেশে প্রচারিত হয়, সে দেশে শুধু দেশাত্মবোধ ও জনসচেতনামূলক বাণী দিয়ে বাংলা ভাষার শত্রুদের থামানো যাবে না, বিদেশি ভাষার আগ্রাসনও প্রতিরোধ সম্ভব নয়। তাই, সর্বস্তরে বাংলার পরিবর্তে বিদেশি ভাষার ব্যবহার, ব্যাপকভাবে বিস্তার, কখনো কখনো দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ বা রাজনীতিক চাপে বিরোধিতার সম্মুখীন হলেও শেষ পর্যন্ত তা ধোপে টেকে না। তার জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট আইন। অবশ্য, ১৯৮৭ সালে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’ এবং ২০১২ ও ২০১৪ সালে সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলন, বেতার-দূরদর্শনে বাংলা ভাষার বিকৃত উচ্চারণ ও দূষণ রোধে হাইকোর্টের রুল জারির কার্যকর ফলাফলের তেমন কোনো দৃষ্টান্তও স্থাপিত হয়নি।

জাপানিরা জনসচেতনার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের ভাষার ব্যবহার আবশ্যিক করেছে। চীনের ভাষার মধ্যে কোনো বিদেশি ভাষার শব্দ-বাক্য মিশিয়ে ব্যবহার করা যাবে না বলে সে দেশের সরকার আইন করেছে। আমাদেরও বাংলা ভাষার যথাযথ মর্যাদা ও বিস্তারের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাংলা ভাষা তার উদ্ভবের শুরু থেকেই শাসকগোষ্ঠীসহ নানাবিধ অবজ্ঞা অবহেলা মোকাবিলা করে এগিয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্হিতি ভিন্ন। বর্তমান অবজ্ঞা-বিদ্বেষ-শত্রুতার গতিপ্রকৃতি বহুমাত্রিক। তা থেকে মুক্তির জন্য সুচিন্িতত এবং গবেষণাপ্রসূত উপায় বের করা প্রয়োজন। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক মুক্তবাজার বিশ্বের প্রেক্ষাপটে জাতি হিসেবে মর্যাদার সঙ্গে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনেই অভিন্ন ভাষা-জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এ বিষয়ক সম্যক উপলব্ধি এবং সুদূরপ্রসারী ও কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ একান্ত আবশ্যক।

লেখক: শিক্ষা ও উন্নয়ন বিশেষ

ইত্তেফাক/কেকে