ভাষার প্রাণ বর্ণ। এটি ভাষার রূপ ফুটিয়ে তোলার মাধ্যম। ক্যালিগ্রাফি মূলত বর্ণের সরু-বক্র পথচলা। একজন ক্যালিগ্রাফার হিসেবে যে কোনো ভাষার বর্ণ নিয়ে কাজ করতে ভালোলাগার কথা জানালেন জিহাদ বিন ফয়েজ। চট্টগ্রামের ছেলে। পড়াশোনা করছেন চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোরানিক সাইন্স এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে। কোরআনের হাফেজও তিনি।
বর্ণমালা দিয়ে তৈরি বাংলাদেশের মানচিত্র- এমন কর্মের নেপথ্যের গল্প জানালেন ফয়েজ। তিনি বলেন, প্রত্যেকেরই নিজ ভাষার প্রতি আবেগ ও অনুরাগ সবসময় একটু বেশি কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। বাংলা ভাষা আমায় মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। কথায় আছে প্রতিটি শিশুই প্রথম ভাষা শেখে মায়ের কাছে। তবে ভাষাশিক্ষার পাশাপাশি আমি মায়ের কাছে বর্ণের ঢেউ খেলানোটাও শিখেছি।
তিনি বলেন, মা ঘরের কাজ সেরে বসে যেতেন শখের কাঁথা সেলাইয়ে। সেই কাঁথায় বাংলা সুন্দর হস্তলিপির আঁচড় বসাতেন। ছক অনুসারে সুতো দিয়ে নকশা বুনতো। ছেলেবেলায় এসব মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। তাছাড়া ভাষার ওপর ভিত্তি করে যে দেশের নামকরণ হয়েছে, সেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার বাবার মুখ্য ভূমিকা আছে। এ দুটো কারণে বাংলা ভাষার মায়াজালে আমি আবদ্ধ। শৈশব থেকে গাঢ় ভাষাপ্রীতি লালন করে আসছি।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও ক্যালিগ্রাফার হিসেবে ভাষা শহীদদের প্রতি ভালোবাসা জানাতে ভাষার মাসে ব্যতিক্রমী কিছু করার প্রয়াস থেকেই বাংলা বর্ণমালা দিয়ে দেশের মানচিত্রটি পেইন্টিং করেন জিহাদ বিন ফয়েজ। তিনি বলেন, পরিকল্পনাটি মাথায় আসার সাথে সাথে ক্যানভাস রঙ-তুলি নিয়ে বসে পড়লাম। দীর্ঘ ১৩ দিনে পেইন্টিংয়ের কাজ সম্পূর্ণ হলো। যখন হাতে নিয়ে দেখলাম নিজের অজান্তেই মনে আলাদা একটা অনূভুতির সৃষ্টি হয়, যা বলে প্রকাশ করার মতো নয়।
এই পেইন্টিংয়ে থাকা লাল-সবুজ রং দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ও শহীদদের রক্তের কথা স্মরণ এবং জাতীয় শহীদ মিনারের আংশিক অংশের সঙ্গে নিচে বঙ্গবসাগরের নীল জলরাশিকে বোঝানো হয়েছে।
ক্যালিগ্রাফি শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ ক্যালোস থেকে, যার অর্থ সুন্দর। এক কথায় সুন্দর হস্তলিপি ও অলংকারিক বর্ণ দিয়ে যে হস্তলিপি লেখা হয় তাকে ক্যালিগ্রাফি বলে।
বিশিষ্ট ক্যালিগ্রাফারশিল্পী মাহবুব মুর্শেদের হাত ধরেই ক্যালিগ্রাফির হাতেখড়ি জানিয়ে ফয়েজ বলেন, ক্যালিগ্রাফি শিল্পটি হলো গুরুবিদ্যা। এটি শিখতে হলে বর্ণ সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। যে ভাষার ক্যালিগ্রাফি করি না কেনো প্রতিটি বর্ণের সঠিক মাপকাঠি অনুযায়ী লিখা চর্চা করতে হবে। তাহলেই একটি লেখার সুন্দর্য ক্যালিগ্রাফিতে রূপ ধারণ করে।
একটি পেইন্টিংয়ের জন্য ফয়েজ সময় নিয়ে থাকেন গড়ে ৫ থেকে ৭ দিন। তিনি বলেন, ক্যালিগ্রাফির জন্য ব্যবহার করে থাকি জল রঙ ও এক্রেলিক রঙ। বর্ণ হচ্ছে আরবি, বাংলা, ইংরেজিতে। আরবি ক্যালিগ্রাফির জন্য, কোরআনের আয়াত, আরবি কবিতা অথবা যেকোনো একটি বর্ণ নিয়েও পেইন্টিং করে থাকি। বাংলা ক্যালিগ্রাফিতে কোনো মনীষীর উক্তি, কোরআনের আয়াতের বাংলা অর্থ বা কবিদের কবিতার লাইনগুলো ক্যালিগ্রাফি করি। ইংরেজি ক্যালিগ্রাফিতেও তাই। এখন বিভিন্ন আধুনিক ডিজাইনের মসজিদগুলোর দেয়ালে ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং করে থাকি। সাড়ে ৩ বছর ধরে কাজ করলেও প্রায় আড়াই বছর ধরে পেশা হিসেবে নিয়েছি।

