নন্দিত নিন্দিত জিয়া ও তাহের

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০১২, ২০:১০
গত ৭ নভেম্বর একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে অংশগ্রহণ করেছিলাম। স্টুডিওতে ঢোকার পরই বুঝেছিলাম ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানকে তাহেরকেন্দ্রিক একটি আলোচনায় পরিণত করে জিয়াউর রহমানের ভূমিকাকে অবমূল্যায়ন করার চেষ্টা হবে। আমার ডান পাশের আলোচক ছিলেন কর্নেল (অব.) তাহেরের ভাই বর্তমান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন এবং বাঁয়ে ছিলেন মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন। তারা কর্নেল (অব.) তাহেরকেই ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের নায়ক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন এবং স্পষ্ট করেই বলেছেন, জিয়া তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আমি বলার চেষ্টা করেছি, ৭ নভেম্বরের সেই সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে শুধু সরকারই বদল হয়নি, রাষ্ট্রের চরিত্রও আবার আদর্শিকভাবে বদলে যায়_ বলা চলে ইউটার্ন নেয়। আমার বক্তব্য শেষ করার আগেই ফ্লোর দিয়ে দেওয়া হয় মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনকে। তিনি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য পুনঃউদ্ধৃত করে বলেন, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমেই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক মূলনীতি পরিবর্তন করে পাকিস্তানি আদর্শভাবাপন্ন করে ফেলা হয়। আমি বলেছিলাম ৭ নভেম্বর তৎকালীন রুশ-ভারত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অপশক্তির প্রভাব বলয় থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ইউটার্ন নেয়। আমার ইউটার্নের মানে কোনো অবস্থাতেই পাকিস্তানের দিকে মুখ করে নেওয়া ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতিটা এমন দাঁড়াল যে, আমার বক্তব্য পরিষ্কার করার সুযোগই ছিল না উপস্থাপনার চাতুর্যে। তবে অনলাইনে মেজর (অব.) মিজান বিষয়টি কিছু স্পষ্ট করেছেন। কয়েকজন দর্শক-শ্রোতা অভিযোগ করেছেন, আমি বিএনপির সাবেক মহাসচিব মরহুম আবদুল মান্নান ভঁূইয়ার সংস্কার প্রস্তাব সমর্থন করে এখনো লেখালেখি করি বলে ইচ্ছা করেই সেদিন আলোচনায় ছাড় দিয়েছি, পিছু হঠেছি। কয়েকজন দাবি করেছেন (তারা বাংলাদেশ প্রতিদিনে আমার লেখা পড়েন বলেও জানিয়েছেন) ৭ নভেম্বর চলে গেলেও এর তাৎপর্য নিয়ে যে কোনো সময়ই যেহেতু লেখা যায়, আমার পরবর্তী কোনো লেখা যেন ওই টকশোর সূত্র ধরেই লিখি। তাদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়েই আজকের লেখা। প্রথমেই আলোচনায় আসা উচিত, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে কি পাকিস্তানের দিকে ইউটার্ন করান হয়েছিল? অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন এবং মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন এ মতটিই আরোপ করতে চেয়েছিলেন। আমার মাঝে মাঝে কেন জানি মনে হয়, বাংলাদেশে এমন কিছু লোক আছেন, যারা ভারতীয়দের চেয়েও অধিকতর ভারতীয়। কোনো কোনো ইস্যুতে তারা এমনই ভারতপক্ষ হয়ে যান যে, তাতে ভারতীয়দেরও লজ্জা পাওয়ার কথা। কেন একটি বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েরই হয়তো স্বার্থ আছে নিজস্ব বিবেচনা অনুযায়ী। যেমন_ ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে উজানে পানি প্রত্যাহার করছে ভারত তার স্বার্থে_ বাংলাদেশকে মরুভূমি বানানোর কুমতলবে পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এতে বাংলাদেশে মরুময়তা বেড়েই চলছে। বাংলাদেশের স্বার্থহীন ঘটছে। ছিটমহল ইস্যু নিয়েও দুই দেশের মধ্যে স্বার্থের টানাপড়েন আছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ঘাটতির ক্ষেত্রেও তাই। ট্রানজিট করিডোর নিয়েও উভয় দেশের মধ্যে নিজেদের মতো করে চাওয়া-পাওয়া নিয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে। বিরোধীয় ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ এবং ভারতে বাংলাদেশের স্বার্থ উভয়ের কাছেই স্বীকৃত। সমস্যা সমাধানে কে কোথায় কাকে কতটুকু ছাড় দেবে না দেবে, এ নিয়েই যত বিরোধ। বাংলাদেশের স্বার্থের দিকটাই তো আমরা আগে দেখব এবং বেশি দেখব। তবে ভারতের স্বার্থকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে নয়। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে সোচ্চার ও উচ্চকণ্ঠ বলেই তাকে প্রো-পাকিস্তানি আচরণ বলে চিহ্নিত ও চিত্রিত করা একটি মহলের 'দুরারোগ্য বিমারে' পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়। অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ও মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের বক্তব্যেও তাই মনে হয়েছে। তারা যাদের মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করেন, তারাও একই মনোভাব প্রকাশ করেন_ দ্বিমত করলে 'চোখ তুলে নেওয়ার' হুমকি দেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল নিষ্ঠুর ও নিন্দনীয়, অসমর্থনযোগ্য। মানুষ দুঃশাসন থেকে মুক্তি চেয়েছিল, গণতন্ত্রের মুক্ত আলো-বাতাসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু হত্যা ও রক্তাক্ত পথে নয়। ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুরতা ও রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের কারও কারও বিচার ও শাস্তি হয়েছে। অনেকেরই কিছু হয়নি। অভিযুক্তের তালিকায়ও নেই অনেকে। বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের দুজন বাদে বাকি সবাইকে অন্য ঘনিষ্ঠ আত্দীয়স্বজনসহ হত্যা করে যারা কার্যত ক্ষমতা দখল করেছিলেন তারা সবাই ছিলেন প্রবীণ আওয়ামী লীগার এবং বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের সহকর্মী-সহযাত্রী। খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকারে ছিলেন মোহাম্মদ উল্লাহ, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, অধ্যাপক ইউসুফ আলী, ফণীভূষণ মজুমদার, মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন, আবদুল মান্নান, মনোরঞ্জন ধর, আবদুল মমিন, আসাদুজ্জামান খান, ড. এ আর মলি্লক, ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, দেওয়ান ফরিদগাজী, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর, কেএম ওবায়দুর রহমান, মোসলেম উদ্দিন খান, ডাক্তার ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডল, রিয়াজ উদ্দিন আহমদ, সৈয়দ আলতাফ হোসেন ও মেমিন উদ্দিন আহমেদ। জেনারেল ওসমানীও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। এদের প্রায় সবাই (৩/৪ জন ছাড়া) শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগেও গুরুত্বপূর্ণ পদে এবং তার প্রথম সরকারেও (১৯৯৬-২০০১) ছিলেন। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) আবদুস সামাদ আজাদ তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন মোশতাক সরকারের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য। আবদুল মালেক উকিল লন্ডনে গিয়ে বলেছিলেন '... শাসনের' পতন হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবমাননাকর হয় বিধায় উকিল সাহেব কার শাসনের পতন হয়েছে বলেছিলেন তা উল্লেখ করলাম না। তবে ওই সময়ের কথা যাদের মনে আছে তারা নিশ্চয়ই শব্দটি স্মরণ করতে পারছেন। আওয়ামী লীগের এসব প্রবীণ নেতা, বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠজনরা বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানিয়েছিলেন, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ও মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের এ বিকৃত তথ্য এত দিনেও কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ১৫ আগস্টের ঘটনায় জড়িত সেনাবাহিনীর চাকরিরত ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর গ্রুপের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা এবং তার বিচার ও কারও কারও শাস্তি হলেও মোশতাক মন্ত্রিসভার ২-১ জন ছাড়া অন্য কাউকে সে মামলার আসামিও করা হয়নি, এমনকি বেসামরিক আমলাদের মধ্যে যারা মোশতাকের সঙ্গে ছিলেন তাদের কাউকেও না। বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর রক্তাক্ত রাজনৈতিক প্লটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলে শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই তাদের দলে ফেরত নিতেন না। নতুন প্রজন্মের যাদের পঁচাত্তরে জন্মই হয়নি, যারা পঁচাত্তর দেখেনি, তার প্রেক্ষাপটও জানে না, তাদের বিভ্রান্ত করার জন্যই মুখরোচক এসব কথা বলা হয়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পুরোপুরি কোনো সেনাবিদ্রোহ ছিল না, আমাদের গোটা সেনাবাহিনী এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টও ছিল না। পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা সেনা অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে পুনরায় রুশ-ভারত বলয়ে ফেরত নেওয়ার একটা প্রয়াস বলে তখন বিবেচিত হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের মিছিলে খালেদ মোশাররফের মা, তার ভাই রাশেদ মোশাররফ এবং বেগম মতিয়া চৌধুরীর অংশগ্রহণ জনমনে এ ব্যাপারে সন্দেহ ছড়ায় দ্রুতবেগে। এ ব্যাপারে অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস তার 'বাংলাদেশ : এ লিগ্যালি অব ব্লাড' গ্রন্থে লিখেছেন, '... জনগণের মনে মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য এই অভ্যুত্থানের সূচনা করা হয় বলে ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ... সর্বোপরি তারা যখন দেখল আওয়ামী লীগের মিছিলে খালেদের মা ও ভাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন তখন তারা বুঝে নেয় যে, তার অভ্যুত্থানের পেছনে ভারত আর আওয়ামী লীগ জড়িত।' উলি্লখিত টকশোতে যারা নিজেদের মুজিব অন্তপ্রাণ বলে জাহির করেছেন, তারা আদতে কিন্তু তা ছিলেন না। জাসদ আগে থেকেই মুজিব সরকারকে উচ্ছেদের জন্য কাজ করছিল। কর্নেল (অব.) তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা আগে থেকেই সেনাবাহিনীর ভেতর গোপনে বেআইনি কাজ করছিল বলে জানা যায়। ৩ নভেম্বর '৭৫ খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান যখন সৈনিক-জনতার সমর্থন লাভে ব্যর্থ হলো তখন জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা তৎপর হয়ে ওঠে। ৬ নভেম্বর কর্নেল (অব.) তাহেরের ভাই অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের বাসায় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, গণবাহিনী ও জাসদের যৌথসভায় ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় বলে জানা যায়। জিয়া তখন খালেদের হাতে বন্দী ছিলেন। ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতেই অভ্যুত্থান শুরু হয়ে যায় এবং সৈনিকরা তাদের প্রিয় সেনাপতিকে মুক্ত করে। এখানে কর্নেল (অব.) তাহের, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার একটা ভূমিকা অবশ্যই ছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল জেনারেল জিয়াকে ব্যবহার করে তাদের 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র'-এর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে। এই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে অফিসার হত্যায় মেতে ওঠার অভিযোগ ওঠে। স্লোগান দেওয়া হয় সিপাহি, সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারদের ... চাই।' কি ভয়ঙ্কর অবস্থা! জিয়া কর্নেল (অব.) তাহের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে একমত হননি। এ জন্যই তিনি তাদের কাছে হয়ে যান 'বিশ্বাসঘাতক'। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত না থেকেও জিয়াই হয়ে যান ৭ নভেম্বরের নায়ক। সাধারণ সৈনিক-অফিসাররাই প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে তাকে অধিষ্ঠিত করে নেতৃত্বের আসনে। তিনি দ্রুত সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন, জনজীবনেও ফিরিয়ে আনেন স্বস্তি। ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান আবার বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনে জনগণের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন আকাঙ্ক্ষা-নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও শান্তির বন্দরে। ৭ নভেম্বরের প্রাপ্তি প্রধানত তিনটি_ এক. সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ, দুই. বাকশালী একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার কবল থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের মুক্তি এবং তিন. জাতীয় স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য। এ ব্যাপারে জিয়াউর রহমানের অবদানকে যারা অস্বীকার করেন, তারা ইতিহাসের সত্যকেই অস্বীকার করেন। কারণ এ জন্য তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে, এমনকি জীবনের ঝুঁকিও নিতে হয়েছে। জাসদ, গণবাহিনী ৭ নভেম্বরের পরও তাদের অপতৎপরতা বন্ধ করেনি। ২৬ নভেম্বর '৭৫ তারা ভারতীয় হাইকমিশনার (তৎকালীন) সমর সেনকে হাইজ্যাক করার গর্হিত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। সেই অভিযানে কর্নেল (অব.) তাহেরের এক ভাই বিল্লাল নিহত হন এবং অপর এক ভাই আহত হয়ে বন্দী হন। তিনি এখন লীগ টিকিটে এমপি। হঠকারী পদক্ষেপের ব্যর্থতায়, অবাস্তব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারায় এরা জিয়ার ওপর ক্ষুব্ধ থাকবেন, এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মিথ্যা দিয়ে সত্যকে, মিথ্যা দিয়ে বাস্তবকে কখনো ঢেকে রাখা যায় না। জিয়াউর রহমানের গৌরবকে, তার কৃতিত্বকে ছোট করার জন্য এরাই বলেন, জিয়া সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা দখল করেছেন। এটা ইতিহাসকে পদদলিত করার শামিল। সামরিক আইন জারি করেছেন খন্দকার মোশতাক আহমদ_ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জিয়া তা ইনহেরেট করেছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। পঁচাত্তর সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারিতে তা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। তাতে বলা হয়, '... ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরবেলায় সম্পাদিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিবর্তন এবং সামরিক আইন ঘোষণা প্রসঙ্গে বা এ পরিবর্তন এবং ঘোষণার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক সম্পন্ন কোনো কাজকর্ম, বিষয় বা ঘটনার জন্য বা কারণে বা প্রসঙ্গে এ ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্ট ও কোর্ট মার্শালসহ কোনো আদালতে বা কর্তৃপক্ষের সমীপে বা নিকট বা দ্বারা কোনো মামলা, অভিশংসন বা অন্য কোনো আইনগত বা শৃৃঙ্খলামূলক কার্যধারা গ্রহণযোগ্য হইবে না।' এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ অবশ্য শেখ হাসিনার গত (১৯৯৬-২০০১) সরকারের আমলেই বাতিল হয়েছে সংসদে। কিন্তু ঐতিহাসিক এ সাক্ষ্য তো থেকেই গেল যে, জিয়া নয়, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের দিন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভোরবেলায় খন্দকার মোশতাকই সামরিক আইন জারি করেছিলেন। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের পর জিয়া কারও কাছে পরিণত হয়েছেন নন্দিত নায়কে, পরাস্তদের কাছে হয়েছেন নিন্দিত। কর্নেল (অব.) তাহেরের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা ছিলই, এখনো আছে। তিনি যেভাবে চেয়েছেন সেভাবে বিপ্লব হয়নি। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণে ৭ নভেম্বরের মূল্যায়নও পক্ষ-প্রতিপক্ষের কাছে ভিন্ন। যেমন আওয়ামী লীগ এ দিবসকে বলে সৈনিক হত্যা দিবস। জাসদ সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবস বললেও তাদের কাছে কর্নেল (অব.) তাহের ওই বিপ্লবের নায়ক। আর বিএনপি তো ৭ নভেম্বর পালন করে বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে। যার মূল্যায়ন যেমনই হোক না কেন, আমাদের জাতীয় জীবনে ৭ নভেম্বর চেতনায় ভাস্বর একটি দিন হিসেবেই ইতিহাসের অন্তর্গত থাকবে। ইতিহাসের শক্তি অসীম। ইতিহাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে কেউ জেতে না। শেষ করব ৭ নভেম্বর নিয়ে অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের আর একটি মন্তব্য দিয়ে। তিনি তার উপরোলি্লখিত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, '... উলি্লখিত কিছু সৈনিক আর বেসামরিক লোক নিয়ে কতগুলো ট্যাঙ্ক ঢাকা শহরের মধ্যবর্তী এলাকায় চলাচল করতে দেখা যায়। এবার ট্যাঙ্ক দেখে লোকজন ভয়ে না পালিয়ে ট্যাঙ্কের সৈনিকদের সঙ্গে একাত্দ হয়ে রাস্তায় নেমে আসে এবং উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। ... এতক্ষণে তাদের দুঃস্বপ্ন কেটে গেল। জনতা সৈনিকদের দেশের ত্রাণকর্তা বলে অভিনন্দিত করল। সর্বত্রই জওয়ান আর সাধারণ মানুষ খুশিতে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি শুরু করে। রাস্তায় এসে তারা সারা রাতভর স্লোগান দিতে থাকে_ আল্লাহু আকবার, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ ইত্যাদি। অবস্থা দেখে মনে হয়েছিল, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের গণজাগরণের মতো জনমত আবার জেগে উঠেছে। এটি ছিল সত্যিই একটি স্মরণীয় রাত।'

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন