বৈদেশিক বিনিয়োগ

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ১৬:১৯
অগ্রসরমান অর্থনীতির জন্য একান্ত প্রয়োজন বিনিয়োগ। আর বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন ব্যয় অপেক্ষা অধিক আয় অর্থাৎ উদ্বৃত্ত তহবিল। আয় এবং বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের সংস্থান যদি সম্ভব না হয় তাহলে ঋণ বা অন্য যে কোন উপায়ে তহবিলের ব্যবস্থা করে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হয়। আমাদের বর্তমান সমাজে কর্মসংস্থানের জন্য "দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্র" ভেঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সহজ উপায় হচ্ছে বৈদেশিক বিনিয়োগ যা 'ডাইরেক্ট ফরেন ইনভেস্টমেন্ট' নামে পরিচিত। বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে মোটামুটিভাবে একই রকম নিয়ম-নীতির আলোকে। বিনিয়োগ পরিবেশও এক। দেশভেদে শুধু বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের সমস্যা। উন্নত অর্থনীতির কিছু দেশের হাতে রয়েছে বিনিয়োগযোগ্য প্রচুর তহবিল। বিনিয়োগকারীর বিবেচনায় যদি কোন দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা গ্রহণযোগ্য হয় তখন সে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়। সৃষ্টি হয় সে সমাজে নতুন কর্মসংস্থান। কোন দেশের সরকারের কাজ বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করা। বিশেষ করে আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে যেহেতু বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের ঘাটতি সে ক্ষেত্রে বিদেশি তহবিল যেন দেশে আসতে পারে তার নিশ্চয়তা প্রদান সরকারের একটি প্রধান কাজ। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সকল দেশের অর্থনীতি একই সূত্রে গাঁথা এবং দেশের প্রায় সকল কর্মকাণ্ড ব্যবসার আওতাভুক্ত। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ব্যবসা বিধায় ব্যবসার প্রসার এবং উন্নতিতে দেশের উন্নতি ঘটে। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। ব্যবসায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সরকারের অনেকগুলো পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম 'পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ'। কিন্তু ব্যবসার অনুকূলে সার্বিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারলে 'বিনিয়োগ বোর্ড' বা 'পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ' নামে যতই পদক্ষেপ নেয়া হোক না কেন দেশের চেহারার কোন পরিবর্তন আসবে না। আমাদের বর্তমান অর্থনীতি আমদানি নির্ভর। রপ্তানি অপেক্ষা আমদানি বেশি বিধায় 'ব্যালেন্স অব পেমেন্ট' এ আমাদের অবস্থান ঋণাত্মক অর্থাৎ বৎসর ভিত্তিক রপ্তানি আয় অপেক্ষা আমদানি ব্যয় বেশি। এই অবস্থা কতদিন চলতে পারে একটি দেশের জন্য? এই অবস্থার উন্নতি সম্ভব যদি ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে রপ্তানি বৃদ্ধি করা যায় বা আমদানি সাবস্টিটিউট দেশে উৎপাদন করা সম্ভব হয়। সকল অবস্থায় উন্নতির জন্য প্রয়োজন ব্যবসার প্রসার যা একমাত্র বিনিয়োগের মাধ্যমেই সম্ভব। বাংলাদেশের সার্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন বান্ধব করার জন্য আছে বেশ উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তার অধীনে "বিনিয়োগ বোর্ড"। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের জন্য তাদের যেমন আছে ক্ষমতা তেমনি আছে বড় অংকের বাজেট। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পক্ষে কাজ করা বিনিয়োগ বোর্ডের কাজ। আমাদের সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের মত কাজ করে যাচ্ছেন বিনিয়োগ বোর্ড। দীর্ঘ ৪১ বছরেও আমরা পারিনি প্রয়োজনীয় তহবিলের সংস্থান করতে। বিনিয়োগ বোর্ডের সূত্র মতে, আমাদের দেশে বছর ভিত্তিক 'ডাইরেক্ট ফরেন ইনভেস্টমেন্ট' বা বৈদেশিক বিনিয়োগ নিম্নরূপ: বছর মিলিয়ন-ডলার বছর মিলিয়ন-টাকা (৳) বছর মিলিয়ন-টাকা (৳) ২০০১ ৩৫৫ ২০০৫ ৮৪৫ ২০০৯ ৭০০ ২০০২ ৩২৮ ২০০৬ ৭৯৩ ২০১০ ৯১৩ ২০০৩ ৩৫০ ২০০৭ ৬৬৬ ২০১১ ১১৩৬ ২০০৪ ৪৬০ ২০০৮ ১০৮৬ এই মুহূর্তে আমাদের দেশে জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। বাংলাদেশের মানুষের বর্তমান গড় আয়ু ৬৯ বছর। স্বাভাবিক নিয়মে কর্মক্ষম শ্রমিকদের অবস্থান ২০-৩০ বছরের মধ্যে এবং এই বছর জনসংখ্যার বয়স ভিত্তিক এ গ্রুপে অবস্থান প্রায় ২.৫০ কোটি কর্মক্ষম শ্রমিকের যারা একটি সমাজের মূল চালিকা শক্তি। যে সমাজ কর্মক্ষম জনশক্তির অধিকাংশকে কর্মে নিয়োজিত করতে পারে সে সমাজের স্থিতি বা উন্নতি লক্ষণীয়। উপরের টেবিল থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত দেখে অর্থনীতির সূত্রে আশা বা আনন্দের চিত্র ফুটে উঠে না। ২০১১ সালে বাংলাদেশে ৯০০ কোটি টাকার চেয়ে একটু বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে। বর্তমান দ্রব্যমূল্য বিবেচনায় ঐ বিনিয়োগের ফলে আমার মতে খুব বেশি হলে দুই হাজার নতুন পদ সৃষ্টি হয়েছিল ঐ বছর যা আমাদের জনসংখ্যার বাৎসরিক কর্মক্ষম জনশক্তির সাপেক্ষে খুবই নগণ্য। প্রতি বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে থাকে দশ লাখের উপর। অর্থনীতিবিদগণের ভাষায়, প্রতি বছর আমাদের কর্মজগতে প্রবেশ করে ২০-২৫ লাখ চাকরি প্রার্থী। আমাদের এই সন্তানদের কর্মসংস্থান একান্ত প্রয়োজন। ব্যবসার সকল উপাদান সংস্থানের দায়িত্ব সরকারের নয় কিন্তু পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব শতভাগ। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করার জন্য দেশভেদে বিনিয়োগে প্রস্তুত। সরকারের উচিত এই ব্যবসায়ীদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। সামাজিক ব্যবসার কথাও শোনা যাচ্ছে ইদানিং, যা সামাজিক দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সরকারের জন্য শুভ সংবাদ। লেখক :অর্থনীতি বিশ্লেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন