আবারো ফুঁসে উঠেছে বড় পুকুরিয়া ফুলবাড়ীবাসী। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানী এশিয়া এনার্জি সমীক্ষা কাজে সহায়তার নির্দেশ দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠি প্রত্যাহারসহ তিন দফা দাবিতে তারা আবারও আন্দোলনে নেমেছে।
উল্লেখ্য, গত মাসের ২১ অক্টোবর রাজধানীর পেট্রোসেন্টারে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি বড় পুকুরিয়া এবং ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার সুপারিশ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে। বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ সরকার কর্তৃক চূড়ান্ত হওয়ার আগেই অক্টোবর মাসের শেষের দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-২ এর পক্ষে সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ ফারুক-উজ জামান স্বাক্ষরিত এশিয়া এনার্জি কর্তৃক জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা প্রসঙ্গে একটি চিঠি দিনাজপুরের পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং ফুলবাড়ী পৌরসভার মেয়রের বরাবর পৌঁছায়। চিঠিতে এশিয়া এনার্জির কাছে খনিজ অনুসন্ধান লাইসেন্স ও খনন লিজ থাকার সুবাদে তাদের দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ, পার্বতীপুর, বিরামপুর ও ফুলবাড়ী এলাকায় জরিপ চালানোর অধিকারপ্রাপ্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ চিঠিতে খনিজসম্পদ আহরণের অনুমোদন সরকার কর্তৃক চূড়ান্ত না হলেও প্রচলিত আইন এবং লাইসেন্স পাওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠান এ জরিপ চালাতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। সেই সঙ্গে এশিয়া এনার্জিকে নির্বিঘ্নে কার্যক্রম পালনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়।
আমরা জানি যে, ১৯৯৭ সালে বিশ্বখ্যাত অষ্ট্রেলিয়ান কোম্পানী বিএইচপি অনুসন্ধান চালিয়ে ফুলবাড়ী কয়লা খনি আবিষ্কার করে। কিন্তু বিএইচপি-এর মতে, ফুলবাড়ীর ভূ-প্রকৃতি এবং সামাজিক পরিবেশ উন্মুক্ত খনি হবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তারা লন্ডনে সদ্য তালিকাভুক্ত নতুন কোম্পানী এশিয়া এনার্জির হাতে অনুসন্ধান লাইসেন্স হস্তান্তর করে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। কয়লা খনি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ এই প্রতিষ্ঠানটি সব কাজই ভাড়া করা প্রতিষ্ঠান দিয়ে করায় বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করে।
ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি তোলা বিরুদ্ধে ২০০৫ সালেও আন্দোলন হয়েছিল। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের গুলিতে নিহত হন ২ জন আন্দোলনকারী, আহত হন অনেকে। এ ঘটনার পর তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ৪ সেপ্টেম্বর ফুলবাড়ি স্থানীয় সরকারি কলেজ মাঠে এক জনসভায় বলেন জোট সরকার ফুলবাড়ী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফুলবাড়ীবাসীর সঙ্গে করা চুক্তি বাস্তবায়ন না করলে এর পরিণাম ভয়াবহ হবে। ২৬ আগস্ট আন্দোলনের পর তত্কালীন জোট সরকার তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সঙ্গে একটি চুক্তি করে যা ফুলবাড়ী চুক্তি নামে পরিচিতি পায়। এ চুক্তিতে দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করা এশিয়া এনার্জিকে এদেশ থেকে বহিষ্কারসহ আরো কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাই বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি ফুলবাড়ী চুক্তির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলেই মনে করছি। বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া এনার্জির পক্ষে চিঠি নিয়ে জাতি শঙ্কিত এবং ক্ষুব্ধ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই যেখানে বলেছেন কয়লা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য মজুদ থাকবে সেখানে সরকারের একটি অংশের এই চিঠি এবং সুপারিশ দুঃখজনক।
আমরা আশা করি এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে থেকেই বিষয়টি হস্তক্ষেপ করে ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়নের নির্দেশ দিবেন এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্মের এই সম্পদকে রক্ষা করবেন।
লেখক : ডিপার্টমেন্ট অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
