বাংলাদেশে সস্তা শ্রম বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হইলেও এখানে শ্রমিকের মাথাপিছু উত্পাদনশীলতা সন্তোষজনক নয়—এরকম বলা হইয়া থাকে প্রায়শই। এই অভিযোগ অমূলকও নয়। কিন্তু প্রশ্ন হইল, কেন এইখানে শ্রমিকের জনপ্রতি উত্পাদনশীলতা তুলনামূলক বিচারে কম? এই জিজ্ঞাসার তৈয়ারি জবাব একটি আছে, আর তাহা হইল শ্রমিকের অদক্ষতা। কর্মীদের কারো কারো কাজে ফাঁকি দিবার প্রবণতাও উত্পাদনশীলতা হ্রাস করে বৈ কি! কিন্তু ইহাই শেষ কথা নয়। শ্রমিকের উত্পাদনশীলতার পিছনে তার ব্যক্তিগত দক্ষতা ছাড়াও কাজ করিয়া থাকে আরো নানান উপাদান। কাজের পরিবেশ এই ক্ষেত্রে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সবার আগে নিরাপত্তা; সিকিউরিটি ফার্স্ট। শুধু বইয়ে লেখা আপ্তবাক্য ইহা নয়, ইহা মান্য করিবার, কাজে-কর্মে প্রয়োগ করিবার বিষয়। এই জায়গায় অবহেলা করা হইলে কর্মপরিবেশ অনুকূল হইবে কি প্রকারে! যাহারা কাজ করেন তাহারা যদি সর্বদা কখন কি ঘটিয়া যায় এই ভয়ের মধ্যে থাকেন, তাহা হইলে কাজে মন দিবেন কেমন করিয়া!
আমাদের দেশে কর্মস্থলে, বিশেষ করিয়া গার্মেন্টস সেক্টরের কর্মীদের নিরাপত্তাহীনতা বোধ অমোচনীয় হইয়া দেখা দিয়াছে যেন বা। শ্রমঘন গার্মেন্টস সেক্টরে গত দুই দশকের বিভিন্ন সময়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা গিয়াছেন সহস্রাধিক মানুষ। ১৯৯০ সালের ১৭ ডিসেম্বর মিরপুরের একটি পোশাক কারখানায় আগুন লাগিয়া মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হন ৩২ জন শ্রমিক। এক হিসাব হইতে জানা যায়, ২০১০ পর্যন্ত ২০ বত্সরে সারা দেশে পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে অর্ধশতাধিক। ২০১০ সালে গাজীপুর ও আশুলিয়ায় দুইটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জীবনহানি ঘটে ৫১ জন হতভাগ্য শ্রমিকের। নিহত গার্মেন্টস কর্মীদের অধিকাংশই নারী। তাহাদের সকলে আগুনে পুড়িয়া মরিয়াছে, তাহাও নয়, আগুন লাগিবার পর প্রাণে বাঁচিতে হুড়োহুড়ি করিয়া সংকীর্ণ সিঁড়ি বাহিয়া নামিতে গিয়া পদপৃষ্ট হইয়া মারা যান অনেকে। গত শনিবার আশুলিয়ার তাজরিন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে যে ১১১ জন কর্মীর জীবনপ্রদীপ নিভিয়াছে, তাহাদেরও অনেকে মারা পড়িয়াছেন আত্মরক্ষার্থে ঝাঁপ দিতে গিয়া।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়া যাইবার পর বাঁচিয়া যাওয়াদের প্রদত্ত বিবরণ এবং সরেজমিন অনুসন্ধান করিয়া দেখা যায় যে, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অগ্নি নির্বাপণের পর্যাপ্ত ও যথোপযুক্ত ব্যবস্থা ছিল না। উপরন্তু কর্মীদের দ্রুত বাহির হইয়া আসিবার পথও ছিল বিঘ্নসংকুল। নামিবার সিঁড়ি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রশস্ত। বিকল্প কোনো সিঁড়িও নাই অনেক ক্ষেত্রে। অন্যদিকে, কোনো কোনো কারখানার প্রশাসন ও সিকিউরিটির অবস্থা এমন যে, শতশত নারী ও পুরুষের জীবনের নিরাপত্তা সেখানে তুচ্ছ হইয়া যায়। দুর্ঘটনার হৈ হুল্লোড়ের মধ্যে দরিদ্র শ্রমিকরা যাহাতে জিনিসপত্র লইয়া যাইতে না পারে তাহার জন্য নাকি কলাপসিবল গেটে তালা লাগাইয়া দেওয়া হয়। একেই বোধহয় বলে পেনি ওয়াইজ পাউন্ড ফুলিশ। আশুলিয়ার তাজরিন ফ্যাশনেও প্রতিটি ফ্লোরে তালা মারিয়া দেওয়া হইয়াছিল। বন্দী শিবিরে অসহায় কর্মীরা নারকীয় যন্ত্রণা ভোগ করিয়া জ্বলিয়া পুড়িয়া মরিয়াছে। পুড়িয়া অঙ্গার হইয়াছে অনেকের দেহাবয়ব।
এই পরিস্থিতিতে আশুলিয়ার গার্মেন্টস কর্মীরা জীবনের নিরাপত্তা চাহিয়া বিক্ষোভ প্রদর্শন করিয়া চলিয়াছেন। পোশাক কারখানাসহ সকল কলে-কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করিবার দাবি সচেতন সকল মহলের। বিশেষত তৈয়ারি পোশাক খাতে অনিরাপদ কর্মপরিবেশ নিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছে বিদেশের অনেক গণমাধ্যম। এই ব্যাপারে বিজিএমই-ও নিরুদ্বিগ্ন নয় বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। তাহাদের নিয়মিত পরিদর্শন- পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা আছে বলিয়া দাবি করা হয়। কিন্তু তাহার পরও এই সেক্টরে অপঘাত মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইতেছে। এই রূঢ় বাস্তবতায় গার্মেন্টসসহ প্রতিটি কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করিবার প্রশ্নে ঔদাসীন্য কিংবা ফাঁকির কোনো সুযোগ নাই। এই প্রশ্নে ট্রেড ইউনিয়নসমূহেরও ভূমিকা প্রত্যাশিত।
