প্রতি বত্সরের শেষপ্রান্তে বাংলাদেশে শুরু হয় ভর্তি মৌসুম। বর্তমানে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি প্রক্রিয়া যখন শেষের পথে, তখন স্কুলে স্কুলে ভর্তিযুদ্ধ শুরু হইয়া গিয়াছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান শহরগুলোর ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থী ও তাহাদের অভিভাবকগণ এখন রীতিমত ব্যস্ত। ভাল ও নামিদামি একটি স্কুলে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীর চাইতে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তাই বেশি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুযায়ী রাজধানীতে ২৪টি সরকারি স্কুল, তিন শতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রায় পাঁচশত মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং তিন শতাধিক ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল ও সহস্রাধিক কিন্ডারগার্টেন রহিয়াছে। এসব স্কুলে প্রতি বত্সর দুই লক্ষাধিক ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়। ইহাছাড়া ঢাকার বাহিরে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি স্কুলেও ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছে। অধিকাংশ স্কুলেই এখন চলিতেছে ভর্তি ফরম বিক্রয়। আগামী মাসের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হইবে এবং নূতন শিক্ষাবর্ষে সরকারিভাবে বিনামূল্যের বই বিতরণসহ যথারীতি ক্লাস শুরু হইবে।
প্রতি বত্সর স্কুলে ভর্তির সময় ঘনাইয়া আসিলে বিশেষত অভিভাবকদের ঘুম হারাম হইয়া যায়। শুরু হয় দৌড়-ঝাঁপ। তাহারা লাইনে দাঁড়াইয়া ভর্তিফরম সংগ্রহ, ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি, বাসায় প্রাইভেট টিউটর রাখা ও ছেলে-মেয়েকে কোচিং করানোর জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগেন। এবার ঢাকা মহানগরীতে তো বটে, চট্টগ্রাম মহানগরীতেও নির্ঘুম রাতের কষ্ট সহ্য করিয়া এমনকি একটানা ২৪ ঘন্টা লাইনে দাঁড়াইয়া অনেককে ভর্তিফরম সংগ্রহ করিতে দেখা গিয়াছে। ভর্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করিতে জনদুর্ভোগ যতটা পারা যায় লাঘব করার দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনোযোগ দেওয়া দরকার। প্রথম শ্রেণীর ভর্তিতে লটারি আর নবম শ্রেণীতে জিপিএ’র মাধ্যমে ভর্তির পদ্ধতি প্রবর্তন করায় কিছুটা হইলেও স্বস্তি নামিয়া আসিয়াছে। আবার দ্বিতীয় শ্রেণীতে ১০০ নম্বরের পরিবর্তে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্তটিও ইতিবাচক। এভাবে ভর্তি প্রক্রিয়াকে দিন দিন সহজ ও সাবলিল করিতে হইবে।
আমাদের জানা মতে, রাজধানী ঢাকায় কোন আসন সংকট নাই। এখানে বেসরকারিভাবে অনেক স্কুল গড়িয়া উঠিয়াছে যাহা যে কোন বিবেচনায় আশাব্যঞ্জক। সারাদেশেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব নাই বলিলেই চলে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত চরাঞ্চল ছাড়া সবখানেই চাহিদার তুলনায় প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে। ইহার অর্থ দাঁড়ায় ভর্তি হইতে কোন সমস্যা নাই। কিন্তু ভালমানের স্কুল-কলেজের যথেষ্ট অভাব আছে। আর এ কারণেই ভর্তি বিড়ম্বনা বৃদ্ধি পায় ফি বত্সর। কেননা প্রত্যেক অভিভাবক চান তাহার ভাল কোন স্কুলে লেখাপড়া করুক। রাজধানীতে দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক পাঠদান পদ্ধতিসহ ৫০টির মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে যাহা মানসম্মত। এসব স্কুলে সর্বসাকুল্যে ২০-২২ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হইতে পারে। সংকটের মূল কারণ ইহাই।
এমতাবস্থায় আমাদের প্রশ্ন হইল, এখন অধিকাংশ স্কুলই সরকারি অর্থানুকূল্য ও সুযোগ-সুবিধা পাইয়া থাকে। সুতরাং গুণগত মানের দিক হইতে বড় ধরনের ব্যবধান হইবে কেন? অধিকাংশ স্কুলকে মোটামুটি একই মানসম্পন্ন করিয়া গড়িয়া তুলিতে পারিলে ভর্তি নিয়া আর হাহাকার থাকিবে না। তখন বাড়ির পাশের ভাল স্কুলটিকেই সকলে প্রাধান্য দিবেন এবং অনেক সমস্যারই সমাধান হইবে। অতএব, ঢাকাসহ অন্যান্য মহানগর ও মফস্বল শহরের পিছাইয়া পড়া স্কুল-কলেজগুলির মানোন্নয়নে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হইবে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।
