মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদ কঠিন হবে বিভিন্ন কারণে। এসময় পররাষ্ট্রনীতিতে দেখা দিতে পারে সংকট। আগামী চার বছর ইরান অথবা সিরিয়া ইস্যুতে কী ঘটতে পারে তা অন্তর্দৃষ্টিতে দেখা সহজ। ওবামা প্রশাসন এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় নিশ্চয়ই সচেতন ও মনোযোগী। কিন্তু পরবর্তী পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের সংকট দেখা দেবে হেথা নয় হোথা নয় অন্য কোন খানে। সম্ভবত হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত এশিয়ার সমুদ্রসীমায়। সেখানে আছে পাঁচটি ক্ষুদ্র দ্বীপ ও তিনটি অনুর্বর পাহাড়। সেখানে কিছু বন্য ছাগল চরে বেড়ায়। আর সবকিছুই বসবাসের অযোগ্য। এমন এক স্থানে এসে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি দুর্বিপাকে পড়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
কয়েক মাস ধরে চীন ও জাপানের নৌবাহিনী পূর্ব চীন সাগরে মুখোমুখি অবস্থানে উপনীত হচ্ছে। উভয় দেশ এসব ক্ষুদ্র দ্বীপের মালিকানা দাবি করে আসছে। জাপানিরা এই দ্বীপগুলোর নাম দিয়েছে সেনকাকু। পক্ষান্তরে চীনের লোকজন ডাকে দিয়াওইউ নামে। বিরোধের মূল কারণ এখানকার জ্বালানি শক্তি। এতদঞ্চলে সমুদ্রের নিচে প্রভূত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ আছে। আবার বিরোধের পেছনে আছে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কার্যকারণও।
এশিয়ার ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো,এখানকার দুই পরাশক্তির মাঝে বিদ্যমান তিক্ত সম্পর্ক। কিছু অমীমাংসিত বিষয় বিরোধের মূল কারণ। উভয় দেশেরই অর্থনীতি ও সামরিক বাহিনী বিশাল। বিশ্বমঞ্চে চীন ও জাপান কখনোই সমান ছিল না। সর্বদা একজন আরেকজনকে শাসন করেছে। গত ৫শ’ বছরের অধিকাংশ সময় চীন ছিল এতদঞ্চলের সর্বেসর্বা। জাপান দূরবর্তী স্যাটেলাইট রাষ্ট্র হিসেবে মহান চীন সাম্রাজ্যের শাসন ও নিয়ন্ত্রণ মেনে চলেছে। এই অবস্থার পরিবর্তন হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। এ সময় জাপান এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে নিজ অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ শুরু করে। পশ্চিমা বিশ্বের সাথে গড়ে তোলে গভীর সম্পর্ক ও সখ্যতা। মেইজি পুনরুদ্ধারের পর জাপানের সেনাবাহিনী শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৮৯৫ সালে তারা চীনের কিং রাজবংশকে পরাজিত করে। যুদ্ধের ফলস্বরূপ টোকিও সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে সংযোগ স্থাপন করে। কিন্তু গত ৪০ বছর ধরে এর সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিতর্ক চলছে। চীন ঐতিহাসিকভাবে এবং জাপান আধুনিক দখলদারিত্বের বলে উক্ত অঞ্চলের মালিকানা দাবি করে আসছে।
গত দুই মাস ধরে উভয় দেশ এমন হম্বিতম্বি করছে তাতে যে কোন সময় দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। চীন ও জাপানের যুদ্ধজাহাজসমূহ এখানকার সমুদ্রপথগুলো পাহারা দিচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন তারা মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসছে। অন্যদিকে শুষ্ক অঞ্চলে উভয় দেশের লোকজনের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও বাদ-প্রতিবাদ লেগেই আছে। তারা দিন দিন আরো জাতীয়তাবদী হয়ে উঠছেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতি প্রশমনে এবং একটি গ্রহণযোগ্য কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে উভয় দেশ খুব কমই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বলাবাহুল্য, যুক্তরাষ্ট্রও এখানে জড়িত। কেননা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী জাপান আক্রান্ত হলে জাপানি সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য। সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুদ্ধ দেখা দিলে ওয়াশিংটন তার এই বাধ্যবাধকতা এড়াতে পারবে না। বিষয়টি ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্য কথায় চীন ও জাপানের নৌবাহিনী যদি যুদ্ধ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়াযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।
যুদ্ধের নাম নিতে আমার কষ্ট হয়। কিন্তু চীন ও জাপানের চরম তিক্ত সম্পর্কের কারণে এটা অসম্ভবও নয়। সম্মান, গৌরব, ভুল বুঝাবুঝি ও দুর্ঘটনা আমাদেরকে যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। এছাড়া মনে রাখা দরকার, চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চেয়েও এটা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। গত তিন দশক ধরে কমিউনিস্ট পার্টির অবিসংবাদিত নেতা ডেং জিয়াওপিংয়ের কৌশলগত পরিকল্পনার ভিত্তিতে চীন পরিচালিত হয়েছে। তিনি চীনকে বর্তমান ধারায় নিয়ে আসেন। তার কৌশলগত পরিকল্পনার ছিল তিনটি দিক। প্রথমত, তিনি কার্ল মার্কসীয় মতবাদের স্থলে অর্থনৈতিক উদারীকরণকে সংস্থাপন করেন। দ্বিতীয়ত, এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন যার মাধ্যমে নির্মম স্বৈরতন্ত্র ও ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিশৃঙ্খলার মধ্যে সমন্বয় সাধিত হয়। এসব কিছুকে তিনি সুনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসেন। সরকারি অফিসে কতিপয় মনোনীত কলা-কৌশলী ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির মেয়াদ নির্ধারিত হয়ে যায়। এভাবেই আসে স্থিতিশীলতা। সর্বোপরি তিনি মাওসেতুংয়ের বৈপ্লবিক পররাষ্ট্রনীতির ব্যত্যয় ঘটান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত মৈত্রীর বন্ধনে চীনকে আবদ্ধ করেন।
ডেং কৌশলের এই তিনটি বিষয়ই সম্প্রতি চাপের মুখে পড়েছে। চীনের অর্থনৈতিক মডেল কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষত চীনে শ্রমব্যয় বেড়ে গেছে। এতে তরুণ কর্মীর দল মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। এছাড়া চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপারে সেদেশেই এখন সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে দুর্নীতি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। তাছাড়া চীনের পররাষ্ট্রনীতিও চাপের মধ্যে আছে। জাতীয়তাবাদী জনতা, জেদি সামরিক বাহিনী ও অভিজাত বুদ্ধিজীবীরা বিশ্বাস করে যে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র চীনের স্বাভাবিক উত্থান এবং বৈশ্বিক ক্ষমতা ও প্রভাব রোধ করার চেষ্টা করছে। এমতাবস্থায় চীনের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ঝি জিনপিং নতুন প্রকৃতির নেতা হবেন।
হু জিনতাও ১০ বছরের শাসনামলে মাত্র দু’বার সরাসরি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। ঝি জিনপিং মান্ডারিন সম্রাটের ন্যায় আচরণ করতে পারবেন না বটে। তবে তাকে চীনের অনেক কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। সেই সাথে অব্যাহত রাখতে হবে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। এমন এক রাজনৈতিক পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাতে সাপ মরে লাঠিও না ভাঙ্গে। অর্থাত্ জনগণের দ্বারা বৈধতা লাভের পাশাপাশি কমিউনিস্ট পার্টির একচ্ছত্র ক্ষমতাও ধরে রাখতে হবে। তাকে চীনের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। শুধু পূর্ব চীন সাগরেই নয়, সমগ্র অঞ্চলে। একই সাথে নিজেদের প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে ও সংঘাত এড়াতে বিশ্ব পরাশক্তির সাথেও সুসম্পর্ক অব্যাহত রাখতে হবে। এভাবে সবকিছু ঠিকঠাক চললে প্রেসিডেন্ট ওবামার পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও অধিকতর সহজ হবে।
টাইম ম্যাগাজিন থেকে ভাষান্তর : ফাইজুল ইসলাম
লেখক : সম্পাদক, নিউজউইক ইন্টারন্যাশনাল, যুক্তরাষ্ট্র
