ভিনগ্রহের মানুষের আক্রমণ লইয়া বহু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী রচিত হইয়াছে, নির্মিত হইয়াছে চলচ্চিত্র। ইহার উল্টা দিকও রহিয়াছে— মানুষ চাঁদে গিয়াছে, অন্য গ্রহেও যাইবার বাসনা বরাবর পোষণ করিয়াছে। এমনকি সেইখানে গিয়া স্থায়ীভাবে বসবাস করিবার উচ্চাশাও ছিল মানুষের। কিন্তু এতদিনে কি সত্যি সত্যিই তাহা ঘটিতে চলিয়াছে? এইরকম এক ঘোষণাই দিয়া বসিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি নভোযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। আগামী দুই দশকে মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনে ৮০ হাজার মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করিয়াছে স্পেসএক্স-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ধনকুবের এলন মাস্ক। এমনকি মঙ্গলগ্রহে স্থায়ীভাবে বসবাস করিতে চাহিলে কত খরচ পড়িবে, কী উপায়ে মঙ্গলগ্রহের প্রতিকূল পরিবেশে মানুষ বাস করিবে— এইসকল জরুরি আলাপও তিনি সারিয়া ফেলিয়াছেন।
প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক লন্ডনে মঙ্গলবার রয়্যাল অ্যারোনটিক্যাল সোসাইটিতে এই পরিকল্পনার কথা জানাইয়াছেন। প্রতি ট্রিপে জনপ্রতি এই জন্য খরচ পড়িবে পাঁচ লাখ ডলার। তিনি বলেন, প্রথম দফায় চার জন মানুষকে মঙ্গলে পাঠানো হইবে। আর এই ক্ষেত্রে স্পেসএক্সের নির্মিত নভোযানে চড়িয়াই পৃথিবীর মানুষ মঙ্গলে যাত্রা করিবে। স্পেসএক্সের নির্মিত ক্যাপসুল সমপ্রতি আন্তর্জাতিক মহাকাশকেন্দ্র (আইএসএস) হইতে পৃথিবীতে ফিরিয়া আসিয়াছে। এখন ১৫ হইতে ২০ বত্সরের মধ্যেই ঐরূপ ক্যাপসুলে চড়িয়া মানুষ মঙ্গলে যাত্রা করিবে— বেড়াইতে নহে, একেবারে স্থায়ীভাবে বসবাসের নিমিত্তে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মঙ্গল গ্রহে ভ্রমণ ছাড়াও বসবাস উপযোগী অবকাঠামো তৈরির জন্য আগ্রহীদের কাজ করিতে হইবে। যাহারা মঙ্গল গ্রহে যাইবেন, তাহাদের প্রয়োজনীয় উপকরণও বহন করিতে হইবে, যাহাতে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য মঙ্গলে স্থায়ী নিবাস তৈরি সম্ভব হইয়া উঠে। এলন মাস্ক জানান, মঙ্গল গ্রহের কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন দিয়া অক্সিজেন, মিথেন ও সার প্রস্তুত করা হইবে। এইভাবে মঙ্গলের মাটিতে পৃথিবীর ফসল ফলানো সম্ভব হইবে। মঙ্গলে স্বচ্ছ ধরনের গম্বুজ বাড়ি তৈরি করা হইবে এবং সূর্য হইতে রক্ষার জন্য পানির একটি স্তর দিয়া তাহা ঢাকিয়া রাখা হইবে। যখন মঙ্গলগ্রহে মানুষ পাঠানো সম্ভব হইবে তখন পৃথিবীর জনসংখ্যা আটশো কোটিতে পৌঁছাইবে। মাস্কের আশা প্রতি লাখে একজন করিয়া মানুষ মঙ্গলে যেতে রাজি হইবেন বা সামর্থ্য থাকিবে। এই হিসাবে ৮০ হাজার মানুষকে মঙ্গলে পাঠানো হইবে। মঙ্গলে যাইতে যাহা খরচ হইবে তাহা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো শহরে একটি বাড়ি ক্রয় করার সমান হইবে।
মঙ্গল গ্রহে উপনিবেশের এই উদ্যোগ নিশ্চয়ই রোমাঞ্চকর, উচ্চাভিলাসী এবং স্বপ্নবিলাসী। কিন্তু ইহাকে মানবসভ্যতার ইতিহাস হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখা যায় না। ইহা মানবসভ্যতা বিস্তারের ধারাবাহিকতা মাত্র। সাম্রাজ্য বিস্তারের যেই বাসনা হইতে ইউরোপীয়রা ভারত অনুসন্ধানে দিগ-বিদিক ছুটিয়াছিলেন, ইহা যেন তাহারই উচ্চকিত রূপ। যদিও মঙ্গলে আবাস স্থাপনের বিষয়টিতে বিচিত্র বিপদের সম্ভাবনা রহিয়াছে— মানসিক, পরিবেশগত, প্রাযুক্তিক ও আর্থিক বাধা এই অভিযানকে থামাইয়া দিতে পারে; তদুপরি মানুষ অজানা-দুর্গম পথে বরাবরই বাহির হইয়া পড়িয়াছে। যদিও এই অভিযাত্রা এখনই বাস্তবায়িত হইতেছে না, তথাপি মানুষের এই স্বপ্নবিলাসি উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে ইহা সহজেই অনুমেয় যে, বিজ্ঞানে ও অর্থে অগ্রবর্তী পশ্চিমের নাগরিকেরাই এই অভিযানে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাইবে। আর তৃতীয় বিশ্বের গরিব মানুষেরা গরিব থাকিয়াই যাইবে, দুইবেলা আহার জোটাইবার লড়াইয়ে জীবনপাত করিতে থাকিবে শতকোটি মানুষ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যকে জারি রাখিয়াই শতকোটি ডলার খরচ হইবে মানুষের এই স্বপ্ন ও উচ্চাভিলাস পূরণে।
ইহার পরও কথা থাকিয়া যায়। জ্ঞান-বিজ্ঞানে মানুষ সামনের দিকে যাইতেছে, কিন্তু কতদূরই বা যাইতেছে? প্রতিনিয়িত নূতন নূতন গ্রহ-গ্যালাক্সি আবিষ্কারের মাধ্যমে সেই দূরত্ব ক্রমাগত বাড়িয়াই চলিয়াছে। তাই সেই অগ্রযাত্রার কোন শেষ নাই, সীমা নাই। তবে আমরা মানবমন্ডলি কোথা হইতে আসিয়াছি আবার মৃত্যুর পর আত্মাই বা কোথায় যায়—এ দার্শনিক জিজ্ঞাসা সম্পর্কে পৃথিবীর তাবত্ বিজ্ঞানীরা একত্রে বসিয়া কোন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারিলে সেটাই হইত মানবজাতির পরম ও শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার।
