নির্বাচনী ইশতেহার জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের পবিত্র ওয়াদা, যার মর্মার্থ এই যে, ক্ষমতায় গেলে তারা সেই ইশতেহার অনুযায়ী জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করবেন। এ লেখায় আমরা মিলিয়ে দেখবো, বর্তমান সরকারের চার বছর পেরিয়ে গেছে, আদিবাসী ইস্যুতে তাদের দেয়া ওয়াদা তারা কতোটা পালন করেছেন বা করেননি। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মহাজোট ৬ জানুয়ারি ২০০৯ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর আদিবাসী অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কতিপয় পদে নিয়োগদান করেন যেমন- পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দীপঙ্কর তালুকদারকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক পদে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে, প্রত্যাগত পাহাড়ী শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান পদে সাংসদ যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে সাংসদ বীর বাহাদুর উশৈসিংকে ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলামকে; এর বাইরে একটি ব্রিগেডসহ ৩৫টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়; ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে কেবল ২৭টি আদিবাসী জাতির নাম রয়েছে, বাকিরা বাদ পড়েছে; ফলে ভর্তি, চাকরির কোটা এবং অন্যান্য সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে আদিবাসীরা তাদের জন্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শব্দের ব্যবহার মানতে নারাজ। এছাড়া বাজেটে পৃথকভাবে “গারো সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন” শিরোনামে সমতলের কয়েকটি উপজেলায় (মাত্র ৪টি জেলার ৬টি উপজেলা) আয়বর্ধক প্রকল্প নেয়া হয়েছে; তবে সব মিলিয়ে আদিবাসীদের অধিকার বাস্তবায়নের যে বিশাল ক্যানভাস সেখানে লক্ষ্যযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে কিছুটা আশা সঞ্চার হয়েছে এই কারণে যে, আদিবাসী নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার সাথে উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভির বেশ কয়েকবারের বৈঠক এবং তারই ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক এবং সর্বশেষ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির ৪র্থ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান মহাজোট সরকারের মেয়াদ চার বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। অবশিষ্ট মেয়াদের মধ্যে আদিবাসী অধিকারের বাস্তবায়ন সংক্রান্ত ইশতেহারে প্রদত্ত সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়িত না হলে সমাজ ও রাষ্ট্রে এর সুদূর প্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আমরা মনে করছি। আদিবাসী অধিকার ও তাদের উন্নয়নে সরকারের দেয়া প্রতিশ্রুতি কতোটা বাস্তবায়িত হয়েছি বা হয়নি এ লেখায় তা বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
আদিবাসী ও আদিবাসী অধিকারের স্বীকৃতি: নির্বাচনী ইশতেহার, আওয়ামী লীগ যাকে দিন বদলের সনদ আখ্যা দিয়েছিল, সেখানে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু, অনুন্নত সম্প্রদায় ও অনগ্রসর অঞ্চল’ শিরোনামের ১৮নং অনুচ্ছেদে আদিবাসী জন্য কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল; ক) উপ-অনুচ্ছেদ ১৮.১-এ বলা হয়েছে: ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, আদিবাসী ও চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লংঘনের চির অবসান, তাদের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম, মান-মর্যাদার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকায় সনাতনি অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। সংখ্যালঘু, আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠী এবং দলিতদের প্রতি বৈষম্যমূলক সকল প্রকার আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থার অবসান করা হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের চাকরি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। খ) উপ-অনুচ্ছেদ ১৮.২-এ বলা হয়েছে: ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। অনগ্রসর অঞ্চলসমূহের উন্নয়নে বর্ধিত উদ্যোগ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, আদিবাসী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ ও তাদের সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।’ (সূত্র: নির্বাচনী ইশতেহার ২০০৮, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) প্রথমেই খতিয়ে দেখা যাক, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান—যা গেলো ৩০ জুন ২০১১ সংশোধিত হলো— পাসকৃত সেই পঞ্চদশ সংশোধনীতে আদিবাসীদের অধিকারের স্বীকৃতি কতোট মিললো? সংবিধানের ৬(২) ধারায় যুক্ত হয়েছে, “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন।” এর মানে কী? এর মানে খুউব সোজা—এখন থেকে বাংলাদেশে বাঙালি ভিন্ন বসবাসরত অপরাপর জাতিসমূহ যেমন হাজং, কোচ, বানাই, মারমা, চাকমা, গারো, সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, খাসিয়া, মণিপুরী, খুমি, খিয়াং, লুসাই, বম, ম্রো কিংবা রাজবংশীরা চিহ্নিত হবেন বাঙালি জাতি হিসেবে। এর মধ্যদিয়ে আবারও ১৯৭২-এর সংবিধানের সেই ঐতিহাসিক ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করা হলো। এর ফলে গেলো ৪০ বছর ধরে নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান কিংবা বিশ্বরাজনীতির জ্ঞানের যে বিকাশ হয়েছে তাকে সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলকে এই সত্য কে বোঝাবে যে, বাংলাদেশের চারদিকে পৃথিবী ঘোরে না আর পৃথিবীর মানুষ নিয়ম করে বিটিভি দেখে না। একজন চাকমার জাতিগত পরিচয় কখনো বাঙালি হতে পারে না— এই ঐতিহাসিক আর নৃবৈজ্ঞানিক সত্যকে বোঝাতে ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবর মানবেন্দ্র লারমা তত্কালীন সংসদকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তখন তাদের সবাইকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। চল্লিশ বছর পর সংশোধিত সংবিধানে আবারও একই ব্যবস্থাপত্র দেয়া হলো যে, বাংলাদেশের জনগণ সবাই জাতি হিসেবে বাঙালি হবেন। পাকিস্তান আমলে পশ্চিমারা বাঙালিদের বলতেন পাকিস্তানি জনগণের জাতি হচ্ছে একটিই— মুসলমান জাতি। বাঙালিরা তা মানেনি, তারা বলেছে, বাঙালিরা জাতি হিসেবে কখনই মুসলিম না, জাতি হিসেবে তারা অবশ্যই বাঙালি। সরকার ও সাংসদগণ সংবিধান সংশোধনের সময় জাতি ও জাতিয়তা প্রশ্নে বিশ্বের সমসাময়িক জ্ঞান থেকে বিযুক্ত হয়ে কাজ করেছেন যা মুর্খতারই নামান্তর; আর এটাই সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা— যে বাঙালি ২৪ বছর পাকিস্তানের জাতিগত/ভাষাগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের জাতিগত/ভাষাগত পরিচয় অর্জন করেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে সেই বাঙালিরাই আদিবাসীদের ওপর জাতিগত/ভাষাগত নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। যে বাঙালি ২৪ বছর পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে গণতন্ত্র অর্জনের জন্য, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই বাঙালিরাই আদিবাসীদের ওপর সামরিক আধিপত্য বজায় রেখেছে। একসময়কার নির্যাতিত বাঙালি অপরাপর জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ক্ষমতার প্রশ্নে এখন নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এটাই বোধহয় ইতিহাসের বক্রাঘাত। আমাদের প্রত্যাশা ছিল শাসকগোষ্ঠী সংবিধানে এই সত্য মেনে নেবে যে, বাংলাদেশ একটি বহু ভাষা, বহু জাতি ও বহু সংস্কৃতির এক বৈচিত্রপূর্ণ দেশ এবং এর মধ্যদিয়ে সকল জাতির পরিচয়, অধিকার ও সংস্কৃতিকে স্থান দেবে; এভাবেই রাষ্ট্র হয়ে উঠবে সবার; কিন্তু দেখি আশার সে রুটিতে লাল পিঁপড়ে। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার যে বহুত্ববাদী নীতি বা বৈচিত্র্যের ভেতরে যে সংহতি তাকে নির্লজ্জভাবে পরিহার করে সংবিধানে ৯ অনুচ্ছেদে যুক্ত করা হয়েছে, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙালী জাতি”র মতো অসত্য বাক্য। বাংলাদেশ কোনো একক ভাষা বা একক জাতির রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও আরো জাতির মানুষ বাস করে এবং তারা বাংলায় নয়, তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষায় কথা বলেন। সংশোধিত সংবিধানে এদেশে বসবাসরত অন্য ভাষাভাষীর মানুষের মাতৃভাষাকেও পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছে। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলেও অন্য ধর্মগুলোর অস্তিত্ব স্বীকার করেছে কিন্তু দেশের অন্য জাতিসমূহের ভাষার অস্তিত্বের ব্যাপারে আমাদের সংবিধান ভয়ঙ্কর শব্দহীন এবং নিশ্চুপ; অধিকন্তু ৯ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জাতিসমূহের সংগ্রাম ও ত্যাগকেও অস্বীকার করা হয়েছে।
আদিবাসী ভাষার স্বীকৃতি: ইশতেহারে বলা হয়েছে, “অনগ্রসর অঞ্চলসমূহের উন্নয়নে বর্ধিত উদ্যোগ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, আদিবাসী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ ও তাদের সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।” একুশ আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে। খুবই ভালো খবর; তবে যে বিষয়টি খোলাসা করা দরকার তাহলো ২১ ফেব্রুয়ারির এই স্বীকৃতি, বাংলা ভাষার কোনো স্বীকৃতি নয়। এই স্বীকৃতি নিজের ভাষার জন্য বাঙালি জাতির ‘লড়াই’ এর স্বীকৃতি। অর্থাত্ ভাষা বা বাংলা ভাষা এখানে স্বীকৃতি পাচ্ছে না বা এতে প্রমাণ হচ্ছে না বাংলা ভাষা সারা পৃথিবীতে ‘বিশেষ’ মর্যাদার কোনো ভাষা: বরং এতে স্বীকৃতি পেয়েছে ভাষার জন্য বাঙালি জাতির লড়াই। বাঙালি জাতি এর মধ্যদিয়ে ‘মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াকু মানুষ’ হিসেবে পৃথিবীর বুকে ‘বিশেষ’ মর্যাদা পাচ্ছে। আর ভাষার প্রশ্নে এই স্বীকৃতির সত্যিকারের অনুবাদ হলো— পৃথিবীর সব মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া। ভাষার সঙ্গে ভাত বা জীবিকার সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ, তাই আদিবাসীদের ভাষায় শিক্ষাদান বা তাদের ভাষা বিকাশে রাষ্ট্রের করণীয় নির্ধারণ আজ জরুরি। বাংলাদেশে বসবাসরত ৫০টিরও বেশি জাতিগোষ্ঠীর নাগরিকগণ প্রায় ৩০টির মতো ভাষায় কথা বলেন; এসব ভাষার কোনটির কী অবস্থা তা জানার জন্য রাষ্ট্র তরফ থেকে দ্রুত ভাষা জরিপের কাজটি সম্পন্ন করা উচিত, তাদের ভাষা বিকাশের জন্য আদিবাসী ভাষা একাডেমি প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া উচিত। আমরা হয়তো এই সত্যটিই জানি না যে, বাংলার পরে এ অঞ্চলে দ্বিতীয় কথ্য ভাষা হচ্ছে সাঁওতাল। বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও আরো ৫০টিরও বেশি জাতির মানুষ বাস করে এবং তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষায় কথা বলেন। উল্টে দেখা যাক সংবিধান কী বলে? পবিত্র (?) সংবিধানের ২-ক অনুচ্ছেদে আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।’ এর ফলে অন্য ধর্মের নাগরিকগণ ‘শান্তিতে’ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়েছেন। মজার ব্যাপর হচ্ছে ঠিক এরপরেই সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩ এ বলা হচ্ছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’; কিন্তু অন্যান্য ভাষা ‘শান্তিতে’ ব্যবহার করা যাবে কিনা সে সম্পর্কে সংবিধান কিছুই বলা নেই। অর্থাত্ অনুচ্ছেদ ২ (ক) অনুযায়ী, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলেও সংবিধান অন্য ধর্মগুলোর অস্তিত্ব স্বীকার করছে। সংশোধিত সংবিধান এভাবে এদেশে বসবাসরত অন্য ভাষাভাষীর মানুষের মাতৃভাষাকেও পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ্পূর্ণ বাস্তবায়ন: ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়; পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন ছিল ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার। চুক্তি কতোটা বাস্তবায়িত হয়েছে এ নিয়ে প্রথম আলো ৯ নভেম্বর ২০১২ একটি রিপোর্ট করে; এতে বলা হয়: ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ইতিমধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংসদ উপনেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারও একই দাবি করেছেন। সরকারের চারটি মন্ত্রণালয়ের অধীন কয়েকটি জেলা কার্যালয় তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ওই দাবি করেন তারা। জাতীয় সংসদ ভবনের পশ্চিম ব্লকের কেবিনেট কক্ষে ৮ নভেম্বর ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সরকারের আরও কয়েকটি দপ্তর জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রধান অতিথির বক্তৃতায় সাজেদা চৌধুরী বলেন, পার্বত্য চুক্তির ৭২টি ধারার অধিকাংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। অবশিষ্ট ধারাগুলো বাস্তবায়নে জরুরিভাবে কাজ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেন, ৪৮টি ধারার বাস্তবায়ন চুক্তিটির পূর্ণ বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন। তিনি এ ধরনের বিষয়ে ভারতসহ কয়েকটি দেশে সম্পাদিত কতিপয় চুক্তির উল্লেখ করে বলেন, ‘সেগুলোর তুলনায় পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে আমরা এগিয়ে আছি। সরকারের ওই দাবি সম্পর্কে চুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন পক্ষ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ভিন্নমত পোষণ করেন। তারা বলেন, চুক্তির যে তিন-চারটি মৌলিক বিষয় বাস্তবায়িত হলে সম্পূর্ণ চুক্তিটিই বাস্তবায়িত হয়েছে বলে সবার মনে হতো, তার একটিও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিবিরোধ নিরসন এবং জুম্ম শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন। আঞ্চলিক পরিষদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা কার্যকর করা। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে যথাযথ দায়িত্ব ও ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এখনও আঞ্চলিক পরিষদ বিধিমালা প্রণয়ন হয়নি। আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদের নির্বাচন করা হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী তিন জেলার অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পও সরিয়ে নেয়া হয়নি। পাহাড়ি আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না নিয়ে তাদের মতামতের বিপরীতে ভূমি জরিপ ঘোষণা, সামাজিক বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ইত্যাদি চুক্তিবিরোধী কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে। (পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গ, ২ ডিসেম্বর ২০১০, জনসংহতি সমিতি)। যদি পার্বত্য চুক্তি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে পাহাড়ী অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রণয়ন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ শক্তিশালী ও কার্যকর করা, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ শক্তিশালী ও কার্যকর করা, ভূমি কমিশন কার্যকর করা (আইন সংশোধনসহ), অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার, প্রত্যাগত শরণার্থী পুনর্বাসন, আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। সরকারের শেষ সময়ে এসে বলা যায়, এসবের কোনোটিই যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার চেঙ্গি, শঙ্খ, কর্ণফুলি, ডলু, আত্রাই আর করতোয়া দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে কিন্তু সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। আমরা মনে করি সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়, আমরা চাইলে আবারো একে সংশোধন করতে পারি, ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীও তাই বলেছেন। সেই আশায় আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিসমূহ আবারো তুলে ধরছি:
দ্বিধা দোলাচাল আর অস্পষ্টতার কুয়াশা সরিয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করে বসবাসরত ৫০টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হোক। সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ‘বাংলাদেশ একটি বহু ভাষা, বহু জাতি ও বহু সংস্কৃতির এক বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ ’- এই বাক্যের সংযোজন করা হোক।
সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের বিধিসহ অপরাপর সামপ্রদায়িক শব্দ, বাক্য ও অনুচ্ছেদসমূহ সংশোধন করে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইএলও-এর ১০৭ ও ১৬৯ নং কনভেনশন এবং ২০০৭ সালে গৃহীত জাতিসংঘ আদিবাসী জনগোষ্ঠী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র মোতাবেক আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হোক।
সাংবিধানিকভাবে ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির স্বীকৃতি প্রদান করা হোক এবং ইশতেহারের ওয়াদা অনুযায়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হোক। চুক্তিমোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যার বিষয়টিকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক এবং চুক্তি মোতাবেক সকল অন্থায়ী সেনাছাউনি প্রত্যাহার করা হোক। এ লক্ষে সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হোক।
“পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল বিধায় উক্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকারের নিরাপত্তার জন্য উক্ত অঞ্চল একটি বিশেষ শাসিত আদিবাসী অঞ্চলের মর্যাদা পাবে” - সংবিধানে এটি সংযোজন করা হোক। সংসদীয় আসনসমূহসহ দেশের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আদিবাসীদের জন্য জাতীয় সংসদের আসন ও স্থানীয় সরকার পরিষদে আসন সংরক্ষণ করা হোক। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে অতীতে সংঘটিত সকল জাতিগত ও সামপ্রদায়িক জুলুম-নির্যাতনের বিচার করা হোক এবং দোষী ও পরিকল্পনাকারীদের নজীরস্থাপনকারী শাস্তির আওতায় আনা হোক।
আমরা বাংলাদেশের অধিবাসীরা কেমন দেশ চাই, সেটি আমাদেরই ঠিক করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে যে আপোষহীনতা জরুরি ছিলো তা না থাকা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের প্রশ্নে যে গা-সওয়া ভাব, তা শুধু একাত্তরের পরাজিত শিবিরকেই শক্তিশালী করছে এমন নয় বরং দিনে দিনে তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতামুখী অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোকে তাই বলতে চাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এগিয়ে চলার জন্য এবং আদিবাসীদের সমস্যার স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টিকে আবারো নতুন করে ভাবুন। সংবিধানের ত্রুটিপূর্ণ সংশোধনের প্রতিক্রিয়া আদিবাসীরা দেখাতে শুরু করেছেন, গণমাধ্যমে আমরা তার প্রতিফলন দেখছি। ত্রিশ লাখ মানুষের মনে যে ক্ষোভ আর হতাশা সঞ্চারিত হচ্ছে, দ্রুত তা আমলে না নিলে এখন থেকে অতীতের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে, যা আমরা কেউই চাই না। আমারা মনে করি বাংলাদেশ একটি বহু জাতির সম্মানজনক অংশীদারিত্বের রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হওয়ার স্বপ্নকে ধারণ করতে সক্ষম আর তাই আমরা চাই দেশে বসবাসকারী সকল জাতির সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নতুন করে রচিত হোক আগামীর সংবিধান।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
