কেন এই অসহিষ্ণুতা

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৫২
একই দিনে ছয়টি লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে বগুড়া, মেহেরপুর ও পাবনায়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে দুইজন হইলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা। দুইজনই অজ্ঞাত পরিচয় দুর্বৃত্তদের হাতে নির্দয়ভাবে খুন হইয়াছেন। বগুড়া শহর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক সুজানুর রহমান সুজনকে কর্মস্থল হইতে বাসায় ফেরার পথে কোপাইয়া হত্যা করা হইয়াছে গত বৃহস্পতিবার রাত্রে। প্রায় একই সময়ে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সাইদুজ্জামান বেল্টু খুন হইয়াছেন নিজ বাসভবনে। সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ঘরে ঢুকিয়া গুলি করিয়া তাঁহাকে হত্যা করে। চরমপন্থী ও সন্ত্রাসী বলিয়া কথিত বাকি চারজন নিহত হইয়াছেন গণপিটুনিতে। ঘটনাটি সংঘটিত হইয়াছে গত বৃহস্পতিবার সকালে পাবনার ফরিদপুর উপজেলায়। পুলিশ ও গ্রামবাসীর মতে, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইসহ তাহাদের নানাবিধ দুষ্কর্মে অতিষ্ঠ হইয়াই জনগণ আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইয়াছে। তবে আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে কাহারা কেন খুন করিয়াছে— তাহা এখনও জানা যায় নাই। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একই সময়ে তিনটি পৃথক স্থানে সংঘটিত তিনটি পৃথক ঘটনায় যেই চরম অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা গিয়াছে তাহা খুবই উদ্বেগজনক। বিষয়টিকে হালকা করিয়া দেখিবার কোনো অবকাশ নাই। খুন, অপহরণ ও রাহাজানি অনেকটা নৈমিত্তিক বিষয় হইয়া দাঁড়াইলেও সঙ্গত কারণেই এই খবরটি গত শুক্রবারের ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় স্থান করিয়া লইয়াছে। আইন নিজের হাতে তুলিয়া লওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নহে। যে বা যাহারা তাহা করিবে— রাষ্ট্র বা সরকারের দায়িত্ব হইল তাহাদের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দেশে আইন-আদালত আছে। আছে সংবিধান। সংবিধান অনুযায়ী, কেহই আইনের ঊর্ধ্বে নহে। অতএব, কেহ কোনো অপরাধ করিলে আইনানুযায়ী তাহার প্রতিকার বা প্রতিবিধান হইবে— ইহাই স্বাভাবিক, ইহাই প্রত্যাশিত। কিন্তু প্রশ্ন হইল, এই প্রত্যাশা অনুযায়ী সবকিছু চলিতেছে কিনা? এই ব্যাপারে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী জনগণের অভিজ্ঞতা যে ইতিবাচক নহে— তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। এ প্রসঙ্গে শুধু এইটুকু বলাই যথেষ্ট যে, আইন যদি তাহার নিজস্ব গতিতে চলিত— তাহা হইলে নিশ্চয়ই পাবনার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা ইউনিয়নের জনগণকে আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইতে হইত না। প্রকাশিত সংবাদে ইহা স্পষ্ট যে, পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়া যাইবার পরই কেবল তাহারা রুখিয়া দাঁড়াইয়াছে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই যে এমনটি হইতেছে তাহা আমরা বলি না। বলা বাহুল্য যে, একহাতে কখনই তালি বাজে না। আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইবার বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক, তবে কেন গ্রামগঞ্জের মানুষ এতোটা অসহিষ্ণু হইয়া উঠিতেছে— তাহাও গুরুত্বের সাথে ভাবিয়া দেখা দরকার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাড়াবাড়ি বা সীমালঙ্ঘনই এই ধরনের সহিংসতাকে অনিবার্য করিয়া তোলে। বাড়াবাড়ি যাহারা করেন তাহাদের পিছনে যে বরাবরই ক্ষমতার আশীর্বাদ বা পৃষ্ঠপোষকতা থাকে— তাহাও কোনো নূতন কথা নহে। ফলে এই ‘সৌভাগ্যবান’ ব্যক্তিরা নিজেরা যেমন আইন-কানুনের তোয়াক্কা করেন না, তেমনি সংশ্লিষ্ট থানা-প্রশাসনও তাহাদেরকে হয় তোয়াজ করিয়া চলে অথবা ঘাটাইতে সাহস পায় না। যুগ যুগ ধরিয়া এই অবস্থা চলিয়া আসিতেছে। সরকার বদল হইলেও অবস্থার কোনো বদল হয় নাই। হইবার আলামতও দেখা যাইতেছে না। আমরা আশা করি, সরকারের নীতিনির্ধারক মহল বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করিবেন। হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাইতে হইবে। পাশাপাশি, এই অসহিষ্ণুতার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করিয়া উহার মূলোত্পাটনেও যথাযথ ব্যবস্থা গৃহীত হইবে— ইহাই আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন