ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আই কে (ইন্দর কুমার) গুজরাল গতকাল শুক্রবার ৯৩ বছর বয়সে পরলোকগমন করিয়াছেন। তিনি ছিলেন ভারতের দ্বাদশ প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯৭ সালের ২১ এপ্রিল হইতে ১৯৯৮ সালের ১৯ মার্চ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। স্বল্পকালীন প্রধানমন্ত্রী থাকিলেও তিনি ছিলেন এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী। ইহার আগে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬-১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন সাবেক সোভিয়েট রাশিয়ায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত। এই গুণী রাজনীতিকের জন্ম ১৯১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর পশ্চিম পাঞ্জাবের ঝিলম (বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত) শহরে। তাহার পিতা-মাতা দুইজনই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পারিবারিক আবহ ও পরিবেশ এবং তত্কালীন ভারতীয় জনগণের দুর্দশাই তাহাকে রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করিয়া তোলে। তিনি পিতা-মাতার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হইয়া পড়েন অল্পবয়সেই। তাহাছাড়া ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয় নেতায় পরিণত হন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর তিনি এক পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় জনতা দলও গঠন করেন।
বাংলাদেশ আই কে গুজরালকে স্মরণ করে নানা কারণে। শুধু স্মরণই নয়, তাহার মত বিচক্ষণ ও সহানুভূতিশীল নেতার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে সর্বদা। বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমানে যে টানাপোড়েন চলিতেছে, তাহার অন্যতম কারণ তিস্তা নদীর পানি বন্টন নিয়া সৃষ্ট জটিলতা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক রহস্যজনক বিরোধিতায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক গতিশীল হইতে পারিতেছে না। অথচ গঙ্গার পানিবন্টন চুক্তির সময় আইকে গুজরালের যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল তাহা অবিস্মরণীয়। এই চুক্তির আলোকে আমরা কতটা নায্য হিস্যা বুঝিয়া পাইয়াছি তাহা একটি প্রশ্ন বটে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি আই কে গুজরাল বরাবরই ছিলেন আন্তরিক। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির মন্ত্রিসভার সদস্য। সেই সুবাদে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত প্রকৃত সরকারের নীতিনির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। ভারতীয় পার্লামেন্টে মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষাবলম্বন করেন অত্যন্ত জোরালোভাবে। মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা ও শরণার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী সংস্থানে তাহার তত্পরতার কথা ভুলিবার নহে। বাংলাদেশ সরকার গত ২০ অক্টোবর তাহার অনন্য অবদানের জন্য তাহাকে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ প্রদান করিয়াছে। আমরা তাহার নিকট আজও ঋণী।
আইকে গুজরাল ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত ভদ্র ও সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আশির দশকের মাঝামাঝিতে কংগ্রেস ছাড়িয়া জনতা দলে যোগদান করেন। এই দলের আদর্শ সমাজতন্ত্র। তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে রাশিয়াপন্থি হিসাবেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু উদারতা ও সদ্ব্যবহারের কারণে তিনি সকলের নিকট ছিলেন সমাদৃত। ১৯৯৬ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি ভারতের জন্য পাঁচটি নীতি গ্রহণ করেন যাহা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে ‘গুজরাল ডকট্রিন’ নামে খ্যাত। ইহার প্রথম নীতিই ছিল বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলিকে আস্থায় নিয়া আসা এবং কিছু দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের বিনিময় প্রত্যাশা না করা। তাহার এই তত্ত্ব সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী দক্ষিণ এশিয়া গঠনের জন্য খুবই উপযোগী ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, এইতত্ত্ব পরবর্তীতে হালে পানি পায় নাই। এখন ভারত শুধু প্রত্যাশাই করে, বিনিময়ে তেমন কিছু দিতে আগ্রহী বলিয়া মনে হয় না।
আই কে গুজরাল প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের একজন অকৃত্রিম বন্ধু ও পরম শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। আমরা তাহার মৃত্যুতে তাহার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। একই সঙ্গে প্রয়াতের পরিবারের সদস্যদের প্রতি জানাই গভীর শোক ও সমবেদনা।
