[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

পাশের বাড়ির সাথে সখ্য স্থাপন

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৫৩
প্রতিবেশী মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক হওয়া উচিত অত্যন্ত আন্তরিক ও মধুর। মধুর না হওয়ার কোনো কারণ কিন্তু নেই। শাহ সুজার মেয়ের কাহিনী ও তার করুণ পরিণতি অতীত ইতিহাস মাত্র। রাজা-বাদশাহদের উত্থান-পতনের ইতিহাস যা কালের গহ্বরে নিমজ্জিত। বস্তুত: শাহ সুজা বাংলা থেকে গেলেও তিনি ত আর বাঙালি ছিলেন না। তিনি ছিলেন মুঘল যুবরাজ। অবশ্য মোঘলদের সাথে ভারতবর্ষের আপামর জনগণের মতো বাঙালি বিশেষ করে মুসলমানদের একটি মোহাবিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে বর্তমান পেক্ষাপটে তা আর তেমন তাত্পর্যপূর্ণ নয়। আরাকানে শতবছর বা তারও আগে থেকে বসবাসকারী মুসলমানদের সমস্যা রয়েছে। সমস্যাটি মূলত সামাজিক। মুসলমানেরা নিজেদেরকে মোগল মনে করে, যদিও বেশিরভাগ বাঙালি জনগোষ্ঠী চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, হাতিয়া এলাকার। আপাতদৃষ্টিতে ১৯৪৮ সালে সংগঠিত কাসেম মাঝির বিদ্রোহ রাজনৈতিকপ্রসূত হলেও বাস্তবে তা নিতান্তই আবেগপ্রবণ রোমাঞ্চকর কার্যক্রম। মংডু ও বদ্ধিদং এলাকায় ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী মুসলমান। এখনো সম্ভবত একই অবস্থা বিরাজমান। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট তারা পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে দেয়—মনে করেছিল ভারত বিভক্তির ন্যায় তাদের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলটি পূর্ববঙ্গের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। সেই থেকে বার্মা/মিয়ানমারবাসী বিশেষ করে বর্মনরা মুসলমানদেরকে অবিশ্বাসের চোখে দেখতে শুরু করে। একই সময়ে কাসেম মাঝি ও একযোগে কমিউনিস্টদের বিদ্রোহ তাদের অবিশ্বাসকে আরো দৃঢ়তর করে। অন্যদিকে ১৯৪১ সালের ব্রিটিশ আমলের সর্বশেষ জনসংখ্যা জরিপ রিপোর্ট বলে যে, সারা আরাকানে মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ মুসলমান। এই বিপুল জনগোষ্ঠী শাহ সুজার সৈন্যবাহিনীর সদস্য দ্বারা গঠিত হওয়া সম্ভব নয়। কালক্রমে শাহ সুজার কেভেলরি রাজা বানানো কারিগর বনে যাওয়ায় বর্মণরাজ (রাজধানী রেঙ্গুন/পেগু থেকে) উপরি উক্ত কেভেলরি সদস্যদের মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়। এমনকি রেঙ্গুন থেকে ৮০০ কি.মি. দূরে মেমিও শহর ও নিকটবর্তী এলাকায় এখনো ১০০ পরিবার বসবাস করছে, যাদেরকে বাঙালি/ভারতীয় বলে ধরা হয়। যদিও তারা কেউই বাংলায় কথা বলতে পারে না। আসলে শাহ সুজার কেভেলরির বেশিরভাগ সদস্য ছিল ইরানিয়ান, উজবেক/টার্ক, আফগান, উত্তর ভারতের অধিবাসী—কদাচিত্ ঘোড়া ও হাতির সহিসরা বাঙালি ছিল। তারা সবাই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে বিবাহ বন্ধন ও অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তবুও তাদেরকে বাংলাদেশি হিসেবে বর্মণরা মনে করে। মংডু ও বদ্ধিদংবাসীর পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলন এবং আরাকান উপকূল এলাকায় কাসেম মাঝির (১৯৪৮ সালে) উপদ্রব বর্মণদের সজাগ করে তোলে। তারা আরাকান এলাকায় মুসলমান জনসংখ্যা কমিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর হয়। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ১৯৪১ সালের জরিপকে গায়েব করে দেয়। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে মগের মুল্লুক তথা জোর যার মুল্লুক তার। বার্মাকে কেন্দ্র করে এই ধারণার জন্ম। ১৯৫০ সালের পর বস্তুত ১৯৬১ সালের দিকে পুনরায় জরিপ শুরু করে প্রতি বছর বা প্রতি তিন বছর পর জরিপের পর মুসলমান জনগোষ্ঠীকে বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে ১৯৭০ দশক থেকে নিয়মিত খেদাও অভিযান চালায়। তাতে করে উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী পূর্ববঙ্গে এসে আশ্রয় নিতে শুরু করে—যেমন করে ১৭৯৪ সালে ইঙ্গ-বার্মা বর্ডার সংঘর্ষে রাখাইন, চাকমা ও অন্যান্য উপজাতি আরাকান ও বার্মা থেকে কক্সবাজারে ঠাঁই নেয়। সেই সময় ইংরেজ বাহিনীর অভিযান পরিচালনায় ছিলেন ক্যাপ্টেন কক্স এবং তারই নামকরণে কক্সবাজার এলাকাটি ধীরে ধীরে একটি জনবসতি হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৮২৪-১৮৫২ সাল ইঙ্গ-বার্মা যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং ১৮৮৬ সালের মধ্যে ইংরেজরা সমগ্র বার্মা জয় করে নেয়। ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত বার্মা (বর্তমানে মিয়ানমার) ব্রিটিশ ভারতের একটি প্রদেশ বলে বিবেচিত হতে থাকে। ফলে ভারতীয় নাগরিক, বিশেষ করে বাঙালি জনগোষ্ঠীর এক চারণভূমিতে পরিণত হয় মিয়ানমার। চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহের বহু অভিজাত পরিবারের ছেলে ও মেয়ে (১৯৫০ দশক পর্যন্ত) রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত। রেঙ্গুন চেম্বার অব কমার্স থেকে শুরু করে বার্মা ইস্টার্ন সর্বত্রই বিদেশি ও ভারতীয়দের প্রভাব ছিল অপ্রতিরোধ্য। নোয়াখালীর রউফ চৌধুরী উনুর কেবিনেটের একজন সদস্য ছিলেন। বার্মা বা মিয়ানমারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী উনু পণ্ডিত নেহরুর নিয়মিত শলাপরামর্শ নিয়ে দেশ শাসন করতে শুরু করেছিলেন। জেনারেল নে উইন এসে পাইকারি হারে বহুজাতিক তেল কোম্পানি থেকে শুরু করে পানের দোকান পর্যন্ত যাকিছু বিদেশিদের নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে ছিল সেসব সম্পত্তি ও ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু সরকারিভাবে বাজেয়াপ্ত করেন। তাতে বাঙালিসহ ভারতীয়রা ক্ষতিগ্রস্ত হলো প্রচণ্ডভাবে। তবে ব্যবসা সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী সুরাটী মুসলমানরা বর্মিজ মহিলা বিয়ে করে বর্মিজ স্ত্রীর নামে তাদের অধিকাংশ স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি আজ অবধি রক্ষা করে এসেছেন। অবশ্য বহুজাতিক কোম্পনি ও বিদেশিরা তাদের বাণিজ্য সাম্রাজ্য হারিয়ে ক্ষেপে যায়। সেই থেকে হারিয়ে যাওয়া বাণিজ্য সাম্রাজ্য পুনরম্নদ্ধারে তাদের নিরন্তর প্রচেষ্টা। তবুও তেমন কিছু করতে পারেনি। বরং মাও সেতুং ফায়দা তুলে নিলেন। সালয়ুন নদীর পূর্বাঞ্চল এই সেদিনও সান বিছিন্নতাবাদীদের সাথে নিয়ে চীন কমিউনিস্টদের (১০ হাজারের উপর সশস্ত্র কমিউনিস্টদের শক্ত ঘাঁটি ছিল) অধীনে বলতে গেলে প্রায় স্বাধীন ছিল। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল এলাকা চিয়াংকাসের দুই জেনারেল তাদের সৈন্যবাহিনী দিয়ে রীতিমতো নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে (১৯৪৯ সালে চিয়াংকাস চীন থেকে তাইওয়ানে আশ্রয় নেয়াকালে তার দুই ডিভিশন সৈন্য সান প্রদেশের দুর্গম এলাকায় ঢুকে পড়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে সমস্ত চোরাকারবারের হর্তাকর্তা-বিধাতা বনে যায়)। বর্মণদের শাসন শুধু মধ্যমিয়ানমারে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তা না হলে পূর্বাঞ্চলে খ্রিষ্টান কেরেন জনগোষ্ঠী ব্রিটিশদের বার্মা/ বর্তমানে মিয়ানমার ত্যাগের সময়ে বিদ্রোহ করে। তাদের দুই ব্যাটালিয়ন ইংরেজ কমান্ডিং অফিসারের অধীনে বিদ্রোহের আগুন প্রজ্বলিত করে। প্রায় একই সময় ১৯৪৮ সালে রণদীবের বর্ণিল বিশ্লেষণমূলক নির্দেশাবলির পরিপ্রেক্ষিতে একযোগে সারা ব্রহ্মদেশে কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘটিত হলো। ভারতে অবশ্য কমিউনিস্টরা তথা কথিত বিপ্লব সংগঠিত করতে পারেনি। বিপ্লবের ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ে সদ্য স্বাধীন বার্মা/মিয়ানমার। প্রাথমিকভাবে নে ইউন একটি মাত্র ব্যাটালিয়নকে ভর করে বিদ্রোহীদের দমনে তত্পর হয়ে অত্যন্ত সাহসের সাথে রেঙ্গুনকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়। একইভাবে মোন জনগোষ্ঠী বর্মণদের কর্তৃত্বের বাইরে থাকতে চাইল। কাশ্মিরী পণ্ডিতেরা যেমন উপনিষদ লেখার গৌরবে গৌরবান্বিত, তেমনিভাবে মোনরা বৌদ্ধ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক বলে মনে করে। মোনরা অন্তর্মুখী। কেরেনরা থাইল্যান্ড-নির্ভর এবং উভয়েই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের থেকে অস্ত্রসাহায্য পেত। মিয়ানমারে ২৩২টি উপজাতি বাস করে। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় আজও তত্পর। মিয়ানমার অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ন্যায় আরাকান লিবারেশন আর্মি (মুখ্যত মাওবাদী) আরাকানকে স্বাধীন করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয় অত্যন্ত সাহসের সাথে। বস্তুত ১০ হাজার ফুট উচ্চ আরাকান হিল রেঞ্জ আরাকানকে মূল মিয়ানমার ভূখণ্ড থেকে একেবারে আলাদা করে রেখেছে সেই অনাদিকাল থেকে। আরাকান হীল রেঞ্জে একটি মাত্র গিরিপথ দিয়ে বাত্সরিক দুই মাস যাতায়াত করা সম্ভব। অন্য সময়ে প্রায় অসম্ভব। আরাকান আবহমানকাল থেকে বাংলার সুলতানদের উপর নির্ভর ছিল। তারা মুসলমান নাম ধারণ করে আরাকানে আরবী হরফে মুদ্রা প্রচলন করেন। অবশ্য পরবর্তীকালে পর্তুগিজদের সাথে মিলে চট্টগ্রাম অঞ্চল নিজেদের দখলে আনে। শায়েস্তা খান ১৬৬৬ সালে তাদেরকে বিতাড়িত করে। তবে ১৬৪৩ সালের দিকে মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যের মহাকবি আলাওল পদ্মাবতী রচনা করেন আরাকান রাজসভার (মগন ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায়) কবি হিসেবে। তবুও প্রচন্ড ধরনের টানাপোড়েন থেকে যায়। মুসলমানেরা নিজেদের মোগল মনে করে মগদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চায় না। প্রায়ই বাড়ির চতুর্দিকে দেয়াল সৃষ্টি করে তারা আলাদাভাবে বসবাস করতে চায়। তাতে শুরু হয় দাঙ্গা-ফ্যাসাদ। প্রায়ই মুসলমান ছেলে মগ মেয়েকে বা মুসলমান মেয়েকে মগ ছেলে জোর করে বিয়ে করলে শুরু হয় দাঙ্গা। সুযোগ বুঝে সরকার মুসলমান খেদাও অভিযান চালায়। এর থেকে নিস্তার পেতে হলে ঈসায়ীদের সাথে মিলেমিশে থাকতে হবে। এই বিষয়ে মুসলমানেরা সুবিধাজনক অবস্থানে অবস্থান করছে। আরাকান লিবারেশন আর্মির পুরোধাতে আছে বর্মণরা। মুসলমানেরা সেখানে পেছনের সারিতে থাকে। আরাকানের ভেতরে কোনো অস্ত্রধারী রোহিঙ্গা তথা মুসলমান কিন্তু নেই। আরাকান অঞ্চলে অস্ত্রধারী রোহিঙ্গা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার উর্বর মস্তিষ্কের অনুর্বর সব ধ্যানধারণার ফসল। রোহিঙ্গার নামে আমদানিকৃত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে স্থানীয় জঙ্গীবাদের ও সন্ত্রাসীদের হাত শক্তিশালী করার এক কৌশল মাত্র। প্রশিক্ষণের নামে টাকা হাতিয়ে নেয়ার ফন্দি মাত্র। বলা হয় যে, আরব বণিকরা বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ে সাঁতার কেটে উপকূলে এসে স্থানীয় লোকেদেরকে বলতো ‘রহম’ বা আরবীতে বলতো দয়া কর। সেই থেকে রোহিঙ্গা শব্দের উত্পত্তি বলে অনেকে মনে করলেও এর ঐতিহাসিক কোন ভিত্তি নেই। অন্যদিকে বহু বছর আগে থেকেই বর্মণ ও চীনাদের মধ্যে প্রায়ই দাঙ্গা হতো। ১৯৬৭ সালে রেঙ্গুন শহরে ভয়াবহ বর্মণ-চীনা দাঙ্গা চলাকালে চীনা দূতাবাসে ঢুকে পড়ে চীনা টেকনিশিয়ানকে বর্মণরা হত্যা করে। তবে মাও সেতুং-এর মৃত্যুর পর বিশেষ করে ১৯৮০’র দশকের মাঝামাঝি থেকে কমিউনিস্ট চায়নার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সাথে সাথে মিয়ানমার মাওবাদী আন্দোলনে প্রচণ্ড ধরনের ভাটা নেমে আসে। আগে মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনী ইসরাইলি দ্বারা ট্রেনিংপ্রাপ্ত হতো। বর্তমানে চীনা অস্ত্রশস্ত্রে মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনী আরো বেশি করে শক্তিশালী হচ্ছে। মিয়ানমার পদাতিক বাহিনী খুবই উন্নতমানের। তবে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে নেভী ও এয়ারফোর্সও সুসজ্জিত হচ্ছে। এটা অবশ্যই লক্ষণীয় বিষয় যে, মিয়ানমার স্বাধীনতা সংগ্রামে ৩০ কমরেডের চিরস্মরণীয় অবদান রয়েছে। আউংসান মাত্র ২৬ বছর বয়সে তাদের নেতা হয়েছিলেন। নে উইন (জন্ম ১৯১১ সালে) সামরিক কামান্ডার হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন টিন উ/ম্যায়ং (নাম সঠিকভাবে মনে করতে পারছি না)। তিনি পরবর্তীকালে আন্ডার গ্রাউন্ড সশস্ত্র কমিউনিস্টদের কমান্ডার ইন চিফ হয়েছিলেন। ৩০ কমরেড জাপানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন। ৩০ কমরেড জাপানে থাকা অবস্থায় সুভাষ বোসের আইএনএর মতো মিয়ানমার ন্যাশনাল আর্মি গঠন করে ১৯৪৩-৪৪ সাল পর্যন্ত জাপানিদের সাথে মিলে আউংসান এর নেতৃত্বাধীনে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শেষ অবধি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সাথে আউংসান দেখা করে এবং কথা বলে দল পরিবর্তন করে ব্রিটিশদের সাথে মিলে আউংসান-এর নেতৃত্বে বার্মিজরা জাপানিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। বলা বাহুল্য, এক সময়ে রেঙ্গুন শহরে নেতাজী সুভাষ বোস অবস্থান করেছিলেন। ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহের পর মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহকে মিয়ানমারে নির্বাসনে পাঠানো হয়। রেঙ্গুন শহরে মোগল স্ট্রীট নামে এখনো একটি লেন আছে। ১৮৬২ সালে নির্বাসনে বন্দী অবস্থায় বাহাদুর শাহ মারা যান। তার কবর বা মাজার রেঙ্গুন শহরের অদূরে অবস্থিত এবং তা এখনো অক্ষত আছে। তবুও মিয়ানমার সরকার আরাকানের মুসলমানদেরকে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্ত। মুসলমানদের গোঁয়ার্তুমি ও বর্মণদের বদ্ধমূল ধারণাই মূলত দায়ী। আরাকান রাজাদের মুসলমান নাম ধারণ করে আরবি হরফে মুদ্রা চালু করার যে ঐতিহ্য রয়েছে তার মূলোত্পাটন করাই হয়তোবা একটি বড় উদ্দেশ্য—পরে তা পালিয়ে যাওয়া মুসলমানদের সম্পত্তি দখল করার এক সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। রামুতে বৌদ্ধ নির্যাতন নতুন করে মুসলমানদের উপর নির্যাতন ও খেদাও অভিযান পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। যারা রামুতে এই অঘটন ঘটিয়েছে তারা শুধু রোহিঙ্গাদের হয়ে প্রতিশোধ নিয়েছে তা কিন্তু নয়। তারা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক উন্নয়নে চিড় ধরাতে অনেক বেশি উদগ্রীব। কাদের প্ররোচনায় তারা এই কাজটি করলো তাদেরকে চিহ্নিতকরণ আবশ্যক। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কে অবনতি ঘটলে ভারত অনেক বেশি সুবিধাজনক স্থানে উপনীত হবে বিশেষ করে সমুদ্রসীমা চিহ্নিতকরণে। এ কথাটি আমাদের সকলকে বিশেষ করে সরকার ও নীতি নির্ধারকদের বেশি করে মনে রাখতে হবে। মায়নমারের সাথে হূদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। মিয়ানমার থেকে বিদ্যুত্, গ্যাস, তেল ইত্যাদি এনে প্রয়োজন মিটানো সহজ হবে। বাংলাদেশের শিল্প কারখানায় উত্পাদন স্থিতিশীল হবে। প্রয়োজনে চাউল, মাছসহ শাক-সবজি আমদানি করা সম্ভব। আর ঔষধ, পোশাক শিল্পজাত সামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মিয়ানমার বাজার উন্মুক্ত হবে। বঙ্গোপসাগরে সম্পদ আহরণ সহজতর হবে। আঞ্চলিক সংযোগ ও চট্টগ্রামে গভীর সমুদ্র বন্দর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিরাট এক সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হতে পারে। এই সুযোগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে দুই প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতের সাথে আন্তরিকভাবে সখ্যতা স্থাপন অপরিহার্য। লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সাবেক রাষ্ট্রদূত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন