গত ৬ নভেম্বর হয়ে গেলো মহাশক্তিধর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রেতো বটেই সারা পৃথিবীতেই টান টান উত্তেজনা বিরাজ করে। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সবদেশই নির্বাচনী ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকে। নির্বাচন নভেম্বরে হলেও এক বছর পূর্ব থেকেই হিসাব-নিকাশ চলতে থাকে। বড় দুটি দল অর্থাত্ ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি থেকে প্রার্থী বাছাই, মনোনয়ন ও প্রচারণা চলতে থাকে। প্রার্থীরা কে কার চেয়ে বেশি যোগ্য, দক্ষ, দেশপ্রেমিক এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে বেশি পারঙ্গম সে মহড়ার পর মহড়া দিতে থাকে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সমস্ত কৌশলই তারা অবলম্বন করে। পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই নির্বাচনে বিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে কার্পণ্যবোধ করে না যুক্তরাষ্ট্রবাসী। সব আয়োজন, সাজ-সরঞ্জাম, প্রচার-প্রকাশনা, তর্ক-বিতর্ক তুমুল বিরোধিতা ও প্রতিযোগিতার পর নির্বাচনী যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। প্রশ্নটা এই জয় - পরাজয় নিয়েই।
পরাজিত রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনি সহাস্য বদলে অভিনন্দন জানালেন বিজয়ী প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামাকে। দেখে মনে হলো তিনি যেন এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন। অথচ তিনি বিজয় বক্তৃতাও লিখে রেখেছিলেন। তিনি অভিনন্দন জানালেন তার সমর্থক ও সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রবাসীকে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত জন ম্যাককেইন সবার আগে মিস্টার প্রেসিডেন্ট বলে ওবামাকে সম্বোধন করেছিলেন এবং বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ তাদের রায় দিয়ে দিয়েছে। এখন ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার পালা। ২০০৪ সালে ডেমোক্রেটিক জন কেরি ডব্লিউ বুশকে একইভাবে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ২০০০ সালে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী আল গোর বিজয়ী রিপাবলিকান ডব্লিউ বুশকে প্রথমে অভিনন্দন জানালেন, কিন্তু ফ্লোরিডার ইলেক্টোরাল ভোট নির্ধারণ না হওয়ায় পুনরায় ফোন করে অভিনন্দন স্থগিত রাখলেন। শেষ পর্যন্ত ফ্লোরিডার বিষয়টা আদালত পর্যন্ত গড়ালো।
আদালতের রায়ে ডব্লিউ বুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। আল গোর সানন্দে বিজয়ী প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানালেন। একবারও আদালতের প্রতি বাঁকা দৃষ্টিতে তাকালেন না। তার দল কিংবা সমর্থকরা কেউই আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করলো না। ইতিমধ্যেই বারাক হোসেন ওবামা মিট রমনির সাথে হোয়াইট হাউসে নৈশভোজ সেরেছেন।
২০০৮ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়নযুদ্ধ দেখেছি। বারাক ওবামা ও হিলারী ক্লিনটনের মধ্যে এই যুদ্ধ ছিল ইতিহাসখ্যাত হাড্ডাহাডিড লড়াই। জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে সেই মনোনয়ন যুদ্ধটা কোন অংশেই কম ছিল না। অথচ মনোনয়ন শেষে সেই হিলারী ক্লিনটন ও তার স্বামী বিল ক্লিনটন কি খাটাটাই না খাটলেন বারাক ওবামার জন্য। শেষ পর্যন্ত হিলারী ক্লিনটন বারাক ওবামার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছেন। এই চিত্র শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই নয়। গভর্নর, সিনেট, প্রতিনিধি পরিষদ থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সর্বত্র এই একই রেওয়াজ।
কিন্তু আমাদের দেশের রেওয়াজটা কেমন? নির্বাচন মানেই অবিশ্বাস, অনাস্থা, নির্বাচন মানেই সংঘাত, সংঘর্ষ, মারামারি, কাটাকাটি, অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত ফল প্রত্যাখান। বিজয়ী হলেই নির্বাচন সুস্থ, অবাধ ও নিরপেক্ষ। আর পরাজিত হলে সূক্ষ্ম কারচুপি, স্থূল কারচুপি, ভোটচুরি, ভোট ডাকাতি। অভিনন্দনতো দূরের কথা, মুখ দেখা বা চাওয়া পর্যন্ত বন্ধ। আন্দোলন, পাল্টা আন্দোলনের ঘোষণা। এ অবস্থা জাতীয় পর্যায় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সর্বত্র। মারামারি, হানাহানি আর লাঠালাঠি। কখনো কখনো বিজয়ীরা পরাজিত প্রার্থী এবং সমর্থকদের তেড়ে-মেরে ঘরবাড়ি ছাড়া করে ছাড়ে। অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, এমনকি ধর্ষণের মত ঘটনা পর্যন্ত ঘটে। আমাদের অভিনন্দন আর ধন্যবাদটা প্রায় ক্ষেত্রে এমনই হয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে আমাদের আগ্রহ কম নয়। আমাদের নেতা-নেতৃদের আগ্রহ কম নয়। বিজয়ী প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানাতে আমাদের মোটেও বিলম্ব হয় না।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র কেন? বৃটেন, ফ্রান্স, জাপান, জার্মান এমনকি আমাদের প্রতিবেশী এবং বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে পর্যন্ত দেখা যায় সাধারণ নির্বাচনের পর পরাজিত প্রার্থী বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানায়। সহযোগিতা করার প্রত্যয় ঘোষণা করে।
এসবই আমরা দেখি, আমাদের নেতা-নেতৃরা দেখে, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা দেখে, রাজনৈতিক কর্মী, সমাজ কর্মী থেকে সচেতন প্রতিটা নাগরিকই দেখে। কিন্তু আমরা কিছুই শিখি না।
যে কোন জাতীয় দুর্যোগ মুহূর্তে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি দল ও বিরোধী দল দুর্যোগ মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এক টেবিলে বসে খোলামেলা মতামত ব্যক্ত করে। তাদের সহযোগিতা হয় দেশের স্বার্থে, বিরোধিতাও হয় দেশের স্বার্থে।
কিন্তু আমাদের সরকারি দল আর বিরোধী দলের দিকে তাকালে কি মনে হয়? সাপে-নেউলের অবস্থা। একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে বছরের পর বছর ধরে। তারা রাষ্ট্রের কথা ভাবে কখন? জনগণের কথা ভাবে কখন?
৪১ বছর হয়ে গেলো আমরা স্বাধীন হয়েছি। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের বয়সও প্রায় ২১। আমরা আর কবে শিখবো? নাকি অন্যেরটা দেখে দেখেই দিন কাটাবো। কখনো শিখবো না? ৪ বছর পর পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। আমরা গভীর আগ্রহ ভরে দেখি, কিন্তু কিছুই শিখি না।
লেখক : প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, আফাজ উদ্দিন খান ডিগ্রী কলেজ, কাটাবাড়ীয়া, মনোহরদী,
নরসিংদী
