গার্মেন্টসে ঘটে যাওয়া অসামান্য ক্ষতি

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০৪
১৯১০ সালের ২৬ নভেম্বর আমেরিকার নিউ জার্সির নিউআর্ক শহরের একটি বস্ত্র কারখানায় আগুন লেগে ২৫ জন শ্রমিক, যারা প্রায় সবাই ছিল নারী, মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে ৬ জন জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়ে এবং ১৯ জন বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে ফ্যাক্টরি বিল্ডিং থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে প্রাণ দিয়েছিলেন। সেই ঘটনার একশ বছরের কিছুটা বেশি সময় পরে, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যা রাতে তাজরিন ফ্যাশন নামের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেল কমসে কম ১২৪ জন মানুষ। তারা প্রায় সবাই সরলমতি ‘বস্ত্র বালিকা’। ফ্যাক্টরিতে কাজে ঢুকেছিল দরিদ্র পরিবারকে কিছু সচ্ছলতার মুখ দেখাতে। আগুনে পুড়ে তাদের কচি দেহগুলো কয়লায় পরিণত হওয়ার সাথে সাথে নিঃশেষ হয়ে গেল তাদের সব স্বপ্ন। সাভারের আশুলিয়া ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর জনপদে যখন আমি আমার কিশোর বয়সে আসতাম তখন তা ছিল নিভৃত একটি গ্রাম। দু’দশক আগে থেকে সেই এলাকার আশপাশ জুড়ে শুরু হয়ে যায় গার্মেন্টস শিল্প এলাকা স্থাপনের হুড়াহুড়ি। নিশ্চিন্তপুর গ্রামকে গ্রাস করে নেয় শিল্প এলাকার আগ্রাসী প্রসার। সেই গ্রামে আগুনে জ্বলে অঙ্গার হয়ে গেল শতাধিক বালিকার দেহ। বাংলার শ্যামল গ্রামে এ কি বিসদৃশ ও মর্মান্তিক দৃশ্যপটের রূপান্তর। ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়’ নিশ্চিন্তপুর গ্রামে আজ মশালের মতো আগুন হয়ে জ্বললো ছোট ছোট বালিকাদের দেহ। আগুনে পুড়ে মানুষের দেহ কাঠকয়লা হয়ে উঠলে তার মুখমণ্ডল কি চেহারা নেয় তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। সে চেষ্টা করাটাও হয় অন্যের মনের ওপর এক ধরনের নিষ্ঠুরতা করা। সে চেষ্টা করাটা তাই উচিত নয়, তা করতে নেই। ক্যামেরায় সে ছবিকে অবশ্য ধারণ করা যায়। তবে কিছু ইতর প্রকৃতির মিডিয়া কর্তৃপক্ষ তাদের নিছক ব্যবসায়ী মনোবৃত্তি থেকে (কিংবা কোনো রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি থেকে) সে ধরনের ছবি প্রকাশ করলেও প্রায় সকলেই তা থেকে বিরত থাকে। মানুষের দেহের পবিত্রতার প্রতি সম্মান দেখাতে এবং দ্রষ্টার মানবিক স্পর্শকাতরতাকে বিবেচনায় নিয়েই সকলে এটি করে থাকে। কিন্তু ইন্টারনেটের ফেইসবুকের সব ‘বন্ধুদের’ এতোসব বিবেচনা থাকে না। কেউ কেউ তাদের ফেইসবুক প্রোফাইলে অঙ্গার হয়ে যাওয়া মৃতদেহের মুখমণ্ডলের ভয়ঙ্কর সব বীভত্স ছবি আপলোড ও পোস্ট করেছে। নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন ফ্যাশন কারখানায় অঙ্গার হয়ে যাওয়া মানবদেহের মুখমণ্ডলের ছবি এক মগ্ন চৈতন্যকে জাগিয়ে না তুলে পারে না। এ যেন এক পরাবাস্তববাদ (surrealism)-এর চিত্র। বিগত শতাব্দির তিরিশের দশকে স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় ফ্যাসিস্ট বাহিনী গুয়ের্নিকা শহরকে বর্বরভাবে বোমাবর্ষণ করে ধুলায় গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। বোমা বর্ষণের পর শহরে কোনো জীবিত প্রাণী অবশিষ্ট ছিল না। সেই বীভত্সতাকে ক্যানভাসে এঁকেছিলেন বিশ্ববরেণ্য শিল্পী পাবলো পিকাসো তার বিশ্বখ্যাত ‘গোয়ের্নিকা’ চিত্রে। আমার বড় আশা, ‘নিশ্চিন্তপুরের বিভীষিকা’ নামে একটি চিত্রকর্ম বাংলাদেশের কোনো শিল্পীর তুলিতে অঙ্কিত হোক। আশুলিয়ায় এবার আগুনে পুড়ে মরলো কয়জন? এ কি কেবল একটি বিশুদ্ধ বিমূর্ততার সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রশ্ন। শুধুই কেবল এক, দুই, তিনের একটি গণনা ক্রিয়া। গণনা কাজের মাঝেও স্বার্থের ব্যাপার রয়েছে। মৃতের সংখ্যা বেশি হলে বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিংবা স্ক্যান্ডেলটা বড় আকার নিবে। বিদেশে বেশি হৈ-চৈ হবে। তাহলে গার্মেন্টসের পণ্যের বায়ারের অর্ডার কমে যাবে। কমপ্লাইয়েন্সের জন্য চাপ বাড়বে। এসব ঘটনা বড় করে ঘটতে থাকলে মালিকদের রমরমা ‘টাকা কামাইয়ের’ কারবার দুর্বল হয়ে পড়বে। সরকারের ওপর দায় আসবে। মৃতের সংখ্যা বেশি হলে দায় বেশি পড়বে। তাই এসব মহল ও লোকদের মনের অন্তঃস্থলের তাগিদ হলো—জাতীয় স্বার্থে, সরকারের প্রয়োজনে, বিরোধী দলকে সুযোগ না দিতে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, কর্মকর্তা ও সংস্থাগুলোর দায় বা অহেতুক ঝামেলা পরিহার করার স্বার্থে মৃতের সংখ্যা সম্ভবমতো যতো কম করে দেখানো সম্ভব, সেভাবে দেখাতে চেষ্টা করো। মৃতের সংখ্যা ১১১ না ১২৪। দ্বিতীয় দিন তো সরকারি এক মুখপাত্র জানালেন যে, সরকারিভাবে (এ আবার কি? এক্ষেত্রে বেসরকারি হিসাব থাকতে হবে কেন?) মৃতের সংখ্যা ১১১। একই সংবাদ বুলেটিনে আরেকজন সরকারি মুখপাত্রের বরাত দিয়ে জানানো হলো যে, ১২৪টি মৃতদেহ উদ্ধার করে স্কুল মাঠে রাখা হয়েছে। তাহলে অতিরিক্ত ১৩টি অঙ্গার হয়ে যাওয়া মৃতদেহ আসলো কোথা থেকে? কিছু মৃতদেহের পরিচয় উদ্ধার করা গেলেও প্রায় অর্ধেক (৫৩টি) মৃতদেহের পরিচয় জানা যায়নি। অথচ শতাধিক পরিবার এখনো ফ্যাক্টরিতে কর্মরত তাদের নিখোঁজ পরিবার-পরিজনকে হন্যে হয়ে পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে। মৃতের সংখ্যায় হিসাব মিলছে না। এ যেন নিছকই একটি সংখ্যার হিসাবের ব্যাপার—যাতে কিনা দশ-বিশটা এদিক-সেদিক হতেই পারে! বিজিএমইএ’র নেতারা গলা ফাটিয়ে প্রোপাগাণ্ডা শুরু করলো, দুঃখজনক হলেও এটি তেমন বড় ঘটনা নয়। ৪০ লক্ষ শ্রমিক নিয়ে গার্মেন্টস শিল্প। মরেছে মাত্র ১২৪ জন। অর্থাত্ তেত্রিশ হাজার ভাগের এক ভাগ বা ০.০০৩১ শতাংশ। ক্ষতি সামান্য। যারা এটাকে ‘সামান্য ক্ষতি’ বলে স্বীকার না করে তাকে ‘অসামান্য ক্ষতি’ বলে প্রচার করতে চায় তারা নাকি দেশের শত্রু। দেশের গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য তারা নাকি বিদেশের লেলিয়ে দেয়া এজেন্ট। রবীন্দ্রনাথ তার ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতায় কাশীর রাণীর ঘাট থেকে স্নান সেরে ফেরার পথে মাঘের শীত নিবারণের জন্য পথের পাশের জীর্ণ কুটিরগুলো আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়ার একটি কাহিনী বর্ণনা করেছেন। ভস্মীভূত কুটিরগুলোর গরিব প্রজারা রাজার দ্বারস্থ হলে রাজা রাণীর কাছে তার এরূপ কাজের কৈফিয়ত চেয়েছিলেন। রাণী বলেছিলেন যে, এসব জীর্ণ কুটিরের দাম আর কতো, ক্ষতি হয়েছে সামান্য সম্পদের। রাজা রাণীকে একটি মাত্র চীরবস্ত্রে প্রাসাদ থেকে পথে নামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন যে, পথে পথে ঘুরে তুমি এ কয়টি জীর্ণ ‘সামান্য-মূল্যের’ কুটির নির্মাণের ব্যবস্থা সম্পন্ন করে বছরকাল পর রাজদরবারে এসে জানাও যে, তোমার ‘সামান্য ক্ষতির’ প্রকৃত মূল্য আসলে কতো? একথাই এখানে বলার চেষ্টা হয়েছে যে, একজনের কাছে কোনো কিছু ‘সামান্য ক্ষতির’ বিষয় হলেও অন্য সবার কাছে তা ‘অসামান্য ক্ষতির’ বিষয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকের মূল্য সামান্যই। ১০০ জন রহিমা, সালেহা, সখিনা, রহিম, করিম মরলে তার দাম আর কতো? কিছুই না। কারণ ৩,০০০/- টাকা মাসিক মজুরিতে অনায়াসে আরেক সেট রহিমা, সালেহা... পাওয়া যাবে। ক্রীতদাস আমলে একজন দাস বা দাসী মৃত্যুবরণ করলে মালিকদের বহু দাম দিয়ে আরেকজনকে বাজার থেকে কিনতে হতো। ক্রীতদাস আগুনে পুড়ে মরলে মালিকের ক্ষতি অনেক। তাই ক্রীতদাসকে বাঁচিয়ে রাখায় তার স্বার্থও ছিল অনেক। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মালিকের সেই বালাই নেই। একটি শ্রমিক গেলে সে একই দামে আরেকজন শ্রমিককে নিতে সক্ষম। সে শ্রমিককে কিনে না, কিনে শ্রমিকের শ্রমশক্তি। হালের বলদেরও দেখভালের জন্য একজন গৃহস্থ থাকে। কারণ একটি বলদ মরলে ২০/২৫ হাজার টাকায় তাকে আরেকটি কিনতে হয়। কিন্তু গার্মেন্টস শ্রমিকের দেখাশোনার জন্য কোনো গৃহস্থ নেই। তার মরা-বাঁচাতে মালিকের কিছুই আসে যায় না। শ্রমিকের মূল্য তার কাছে তাই আসলেই অতি সামান্য। তার কাছে একজন ব্যক্তি-শ্রমিক বেঁচে থাকা বা আগুনে পুড়ে মরার মাঝে কোনো তফাত্ নেই, তা তার কাছে কার্যত মূল্যহীন। যা তার জন্য মূল্যবান তা ব্যক্তি-শ্রমিক নয়, তা হলো শ্রমিক-শ্রেণির অস্তিত্ব। কারণ শ্রমিক-শ্রেণি না থাকলে তার মুনাফার যোগাড় হবে কোত্থেকে? এই বিবেচনায় দেখলে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ক্রীতদাস ব্যবস্থার চেয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অনেক বেশি অমানবিক। তাজরিন ফ্যাশনসের কারখানায় ১২৪ জনের মৃত্যু ‘দৈব-দুর্বিপাকজনিত’ দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ছিল জেনে-শুনে করা অবহেলাজনিত একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। প্রথম দিন মালিক মাথা চাপড়িয়ে বললেন, হায়-হায় আমার জাপানী সুতা, উন্নত সব সেলাই মেশিন, কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি সব গেল। বায়ারদের অর্ডার আমি এখন পূরণ করবো কিভাবে। সম্পত্তির বিষয়ে তার কপাল চাপড়ানোর যেন শেষ নেই। কিন্তু এতোগুলো যে তাজা প্রাণ গেল, তার মূল্য কে পরিমাপ করবে? হ্যাঁ! তাই নিহতদের পরিবারকে ১ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। এরপর আর কি চাই? সবাই এবার বগল বাজাতে বাজাতে কাজে যোগ দাও। গার্মেন্টস শিল্প বাঁচাতে হবে, বিক্রি করে লাভ আনতে হবে (মালিকের জন্য লাভ হলেই তা দেশের জন্য হয়ে যায়!), দেশপ্রেমিক হতে হবে। গোলমাল করো না! একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের দাম ১ লক্ষ টাকা। কথা শেষ! না, কথা এখানেই শেষ নয়। ২৬ নভেম্বর আশুলিয়ার রাস্তায় এক নিহত গার্মেন্টস শ্রমিকের মাঝবয়সী একজন মা আমাকে শোক মিছিল থেকে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘সরকারের ১ লক্ষ টাকা আমি চাই না। আমি সরকারকে উল্টো ২ লক্ষ টাকা দিব। সে শুধু আমার মেয়ের লাশটা আমাকে খুঁজে দিক।’ আমাদের দেশের গার্মেন্টস শিল্পের ওপর বিদেশের প্রচণ্ড চাপ আছে। যেক্ষেত্রে একটি দেশের তুলনামূলক সুবিধা (comparitive advantage) থাকে, সেটার জোরেই সেক্ষেত্রে সে দেশের জন্য বাণিজ্যিক সুবিধা সৃষ্টি হয়। গার্মেন্টস পণ্যের বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে তার ‘সস্তা শ্রমের’ সুবিধার কারণে। এর ফলে উন্নত দেশের গার্মেন্টস শিল্পে আউট সোর্সিং ঘটায় সংশ্লিষ্ট সেসব দেশে সে শিল্প সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় গার্মেন্টসের বিশ্ব বাজার দখলে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকতে পারছে সব দেশের তুলনায় তার শ্রমমূল্য, অর্থাত্ শ্রমিকের মজুরি সবচেয়ে কম হওয়ায়। বাংলাদেশের গার্মেন্টস মালিকরা গার্মেন্টসের বিশ্ব বাজারে নিজেদের অবস্থান প্রসারিত করার জন্য সস্তা শ্রমের সুবিধা বজায় রাখতে মরিয়া। বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বীরা তার সেই সুবিধা যথাসম্ভব সংকুচিত করতে সদা সচেষ্ট। একমাত্র সস্তা শ্রমের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের গার্মেন্ট মালিকরা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ও এগিয়ে যেতে সচেষ্ট রয়েছে। আসলে এছাড়া তাদের জন্য অন্য কোনো উপায় খুব একটা নেই। প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বা প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে তারা অন্যদের টেক্কা দিতে পারবে না। সে ইচ্ছাও তাদের নেই। সেই প্রবণতাও অনুপস্থিত। তাদের হাতে অন্যদের টেক্কা দেয়ার একমাত্র অবলম্বন হলো সস্তা শ্রম। কিন্তু শ্রমিকদের স্বাভাবিক স্বার্থ হলো সস্তা শ্রমের অবস্থাকে যতোটা সম্ভব তাদের অনুকূলে পরিবর্তনের চেষ্টা করা। এই পরিস্থিতিই দু’পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত অনিবার্য করে তুলেছে। একেই বলে শ্রেণিদ্বন্দ্ব। সস্তা শ্রমের পাশাপাশি গার্মেন্টস শিল্পে আনুষঙ্গিক খরচ যথাসম্ভব কমিয়ে রাখার মাধ্যমে ও বাংলাদেশের গার্মেন্টস মালিকরা একদিকে তাদের মুনাফা বৃদ্ধি ও অন্যদিকে গার্মেন্টসের বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতায় সুবিধা করে নেয়ার চেষ্টা করে থাকে। এটাই ফ্যাক্টরির নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ, শ্রমিকদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা ইত্যাদি বিষয়ে অবহেলা প্রদর্শনে মালিকদের প্রণোদনার উত্সরূপে কাজ করে। অবহেলাজনিত মৃত্যুর বাস্তব অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও কারণ হলো এখানেই। এই দৃশ্যপটের কাছে মালিকরা আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। রাতারাতি সহজ মুনাফার উন্মত্ত দৌড়ে গার্মেন্টস মালিকরা নিজেদের ও একই সাথে দেশের গার্মেন্টস শিল্পকে এভাবে এক বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে বেঁধে ফেলেছে। এই দৃশ্যপট বদলানোর সুযোগ আছে। সেজন্য অন্য পথ গ্রহণ করতে হবে। শুধু ব্যক্তি মালিকদের হাতে গোটা শিল্পটিকে ছেড়ে না দিয়ে সরকারের উচিত হবে তাতে সরাসরি শরিক হওয়া। তাছাড়া গার্মেন্টস পল্লী স্থাপন, চারতলার চেয়ে উঁচু কোনো ফ্যাক্টরি না বানাতে দেয়া, এরচেয়ে উঁচু ফ্যাক্টরি বিল্ডিংয়ের ৪ তলার উপরের অংশ ভেঙ্গে ফেলা, ফ্যাক্টরিতে আপত্কালীন নির্গমন সিঁড়ি, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নিরাপদ বিদ্যুত্ লাইন স্থাপন ইত্যাদি বাধ্যতামূলক করা, পর্যাপ্ত ফ্যাক্টরি পরিদর্শক নিয়োগ করে কমপ্লাইয়েন্স তদারকির ব্যবস্থা করা ইত্যাদি কাজ জরুরি। এসবের জন্য শ্রমিকের সচেতন অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সেজন্য তাদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দিতে হবে, বাঁচার মতো পর্যাপ্ত মজুরি দিতে হবে, কাজের ও বসবাসের ব্যবস্থা এবং পরিবেশ উন্নত করতে হবে, বীমা সুবিধাসহ আয়-উপার্জন-সঞ্চয়ের নিশ্চয়তার ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব করতে গেলে মালিকদের খরচ যেটুকু বাড়বে তা শ্রমিকরা তাদের শ্রম-দক্ষতার উন্নতি দ্বারা শুধু পুষিয়েই নয়, তাদের আয় আরো বাড়িয়ে দিবে। এই বিকল্প পথই দেশের গার্মেন্টস শিল্পকে রক্ষা ও সমৃদ্ধ করতে সক্ষম। কিন্তু সে পথ নিতে হলে দেশের সরকারের শ্রেণি চরিত্রে প্রগতিশীল পরিবর্তন আনতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে বামপন্থি-গণতান্ত্রিক-দেশপ্রেমিক একটি সরকার। অন্যথায়, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো ‘মৃত্যুফাঁদ’ হয়েই থাকবে। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি E-mail : [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন