প্রতিবন্ধীদের আনন্দময় ভুবন চাই

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০৫
৩ ডিসেম্বর ২১তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিবসটি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘একীভূত সমাজ নির্মাণে সংঘবদ্ধ অঙ্গীকার’। উন্নত দেশগুলোতে আমরা দেখি, সেখানকার প্রতিবন্ধীরা যথেষ্ট সৌভাগ্যবান। তাদের জন্য রাষ্ট্র দায়িত্ব গ্রহণ করে, সরকারের নানা ব্যবস্থাপনা আছে। সমাজের মানুষও এদের ভালোবাসে, সহযোগিতা করে এবং এদের আনন্দে রাখার জন্য পাশে থাকে। এদের চিকিত্সা, শিক্ষা, খাদ্য ও জীবন যাপনে কোন গাফিলতি হলে আইন আছে, সেই আইনে বিচার হলে শাস্তি আছে। এদের প্রতি নিষ্ঠুর ব্যবহার করলে তারও শাস্তি আছে। আর অনুন্নত দেশগুলোর প্রতিবন্ধীরা দুর্ভাগ্য নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। তাদের প্রতি সমাজের উপেক্ষা ও পরিবারের অবহেলা তো থাকেই, সেই সঙ্গে সরকার ও রাষ্ট্রের থাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দায়সারা গোছের কর্মসূচি। সকলের করুণা অথবা বিদ্রূপ-উপহাস নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। এরা সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত। সেটাই এদের পরিচয়, মা-বাবার কাছেও এরা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, অনাদর-অবহেলায় এরা মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। প্রতিবন্ধী কারা এবং তাদের ধরন কি কি যদি চিহ্নিত করি, তাহলে দেখতে পাবো — অটিজম (Autism), চলন প্রতিবন্ধিতা (Locomotor Disability), দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা (Mental illness leading to Disability), দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা (Visual Disability), বাক প্রতিবন্ধিতা (Speech Disability), বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা (Intellectual Disability), শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা (Hearing Disability), সেরিব্রাল পালসি (Cerebral Paly), বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা (Multiple Disability), অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা (Other Disability)। প্রতিবন্ধীদের সহায়তার জন্য আমাদের দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অধীনে ৬৪ জেলায় রয়েছে ৬৪টি দৃষ্টিবন্ধী স্কুল, ৫টি শ্রবণ প্রতিবন্ধী স্কুল, ২টি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুল এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হচ্ছে ১৫০টি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে প্রথমে ব্যক্তিগত এবং আর্থিক সাহায্যের ওপর নির্ভর করে। পরবর্তীতে বিদেশি সাহায্য নিয়ে পরিচালিত হয় কোনও কোনও সংগঠন। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যক্লিনিক এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিত্সারও কোন ব্যবস্থা ছিল না। বিশেষ করে যারা অটিজিমে আক্রান্ত তাদের চিহ্নিত করে চিকিত্সারও কোন ব্যবস্থা ছিল না। শিশু বিশেষজ্ঞরাই সাধারণত চিকিত্সা করতেন। এছাড়া, রাষ্ট্র বা সরকার এবং সমাজ ও পরিবারে প্রতিবন্ধীদের অবস্থান হয়ে আছে খুবই অসহায় এবং উপক্ষেণীয়। প্রতিবন্ধী শব্দটাই ছিল বিদ্রূপ ও উপহাসের। আজ একুশ শতাব্দীতে এসে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান শুরু হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ বিশেষভাবে সনদ প্রণয়ন করেছে এবং তাদের অধিকার রক্ষায় সদস্য দেশগুলোকে কর্মসূচি বা প্রকল্প গ্রহণ করতেও বাধ্য করছে। আমাদের দেশে ১৯৯৬ সাল থেকে সরকারি উদ্যোগ নিতে দেখা যায় সমাজ কল্যাণ বিভাগের মাধ্যমে। কিন্তু পরবর্তী সরকারের সময় তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অর্থ বরাদ্দ করে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে সারাদেশে এর শাখা গঠন করে প্রতিবন্ধীদের জন্য চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করেছেন। প্রতিবন্ধীদের নিবন্ধিকরণ, ভাতা প্রদান, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিবন্ধী জরিপ এবং তাদের অধিকার রক্ষায় নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী দিবস ও নানা কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে জনগণকে সচেতন করে তোলার উদ্যোগও প্রচার করা হচ্ছে। প্রতিবন্ধী মানুষদের মধ্যে যারা অটিজম আক্রান্ত তাদের অবস্থা আরও অসহায়। কেউ কেউ চিকিত্সা ও পারিবারিক পরিচর্যায় অনেকখানি সুস্থ হলেও সম্পূর্ণ সুস্থ কখনই হয় না। স্বল্প বুদ্ধি নিয়ে জীবন কাটায়। এদের সারাজীবন পরিচর্যা এবং খাওয়া-পরার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। এদের পরিবারগুলোও এটুকুই চায়। কেননা এদের চিকিত্সা ও ওষুধ ব্যয়ে বেশ বড় একটা অর্থ লাগে, দরিদ্র মা-বাবার পক্ষে বহন করা সম্ভব হয় না। আজ বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস উদযাপনকালে সমাজের সবাইকে মনে রাখতে হবে, প্রতিবন্ধীরাও মানুষ। তারা জন্মেছে কোন অভিশাপ নিয়ে নয়, সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ নিয়ে। তাদের জন্য ভালোবাসা ও আনন্দ প্রতিষ্ঠা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। দয়া-মায়া, করুণা এবং কোনও প্রকার ছিটেফোঁটা সাহায্য নয়, তাদের জন্য আমরা যেন একটি আনন্দময় ভুবন প্রতিষ্ঠা করতে পারি, এটাই হোক তাদের জন্য আমাদের শ্রেষ্ঠ উপহার। লেখক :সাংবাদিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন