চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে উছলে পড়ে আলো
ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধসুধা ঢালো
চন্দ্রালোকিত রজনীতে নির্জন পথে পথে ঘুরে বেড়াতে অনেকেই ভালোবাসেন। বিশেষ করে যার আছে একটি কবি মন। রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গানে এসেছে চন্দ্রের কথা, এসেছে নজরুলের কাব্যে, জসীম উদদ্ীন, আব্বাসউদ্দিন, হুমায়ূন আহমেদ, আমাদের বারেবারেই নিয়ে গেছেন চাঁদের কাছে। গ্রামে মফঃস্বলে এখানো চাঁদের রয়েছে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। সুনামগঞ্জের কুলহারা হাওরের স্বচ্ছ পানিতে পূর্ণিমার চাঁদ যখন আলো ছড়ায়, পৌরপিতা মউজউদ্দিন আদেশ করেন এক ঘণ্টার জন্য বিজলী বাতি বন্ধ করে পুরবাসীদের চান্নিপহর রাতের শোভা উপভোগের।
মনটি আমার হারিয়ে গেল দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত ছোট্ট একটি খবরের শিরোনামে ‘ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো’। ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌরহাটে সবজি বিক্রেতা হাসিমউদ্দিনের দুই কন্যা সুমি ও জেরিন মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার কঠিন বৈতরণী পার হয়েছে অসামান্য দক্ষতায়। দিন এনে দিন খাওয়ার জীবন তাদের। মাঠে সবজি ফলিয়ে সামান্য উপার্জন করেন হাসিমউদ্দিন। ঝিঙে বেগুন ঢেঁড়স আলু পটল বরবটি ধনে শাক, পালং শাক, সর্ষে শাক বিক্রি করে তিনি ক্রয় করেন চাল ডাল তেল নুন ইত্যাদি সামান্য উপকরণ। কিন্তু তার হূদয়ে অনেক স্বপ্ন সন্তানদের ঘিরে, তারা যেন লেখাপড়া করে উন্নত জীবন-যাপন করতে পারে। আজ সেই স্বপ্ন পূরণের মাহেন্দ্রক্ষণ। পাড়া প্রতিবেশী আশেপাশের লোকজনসহ গ্রামবাসীরা এসেছেন উল্লসিত হয়ে আনন্দ ব্যক্ত করতে। এ যে তাদের গ্রামের গৌরব। কিশোরী দুই কন্যা ডাক্তার হওয়ার আশা নিয়ে সেবা করার ব্রত নিয়ে অপেক্ষা করছে, একা তার বাবার পক্ষে উচ্চ শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হবে কিনা কে জানে, প্রয়োজন দশজনার এগিয়ে আসার।
বিত্তবানের তো অভাব নেই দেশে। রাস্তায় বেরুলেই দেখি চকচকে ঝকঝকে নিত্য নতুন মডেলের গাড়ি। আমি নাম না জানলেও আমার চালক মালেক আমাকে জ্ঞান দানের চেষ্টা করে বলে ‘এটা হলো প্রাডো, প্রিমিও, পাজেরো ইত্যাদি’। আমি থেকে যাই যেই তিমিরে সেই তিমিরে, গাড়ি একটা চড়লেই হলো জানালা বন্ধ করে ধূলো থেকে বাঁচার জন্য, আমার কাছে পুরনো মডেলের মরিস মাইনর থেকে শুরু করে লক্কড়-ঝক্কড় যে কোন গাড়ি চড়লেই একই রকম লাগে।
সনাতন মূল্যবোধ চিরন্তন। ভোগ নয়, ত্যাগ; বিলাস নয়, শ্রম। যেখানে আজ ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল থেকে শুরু করে বিদেশি নামধারী বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার টাকা বেতন দিয়ে সন্তানদের পড়তে পাঠানোর মতো লোকের অভাব নেই। কোচিং সেন্টারে মোটা অংক দিয়ে পড়াতেও অসুবিধা নেই, উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানোও ভাববার বিষয় নয়, সামান্য মাইগ্রেনের ব্যথার চিকিত্সায় ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় হাতের মুঠোয়। সেই দেশে এই দু’টি আধফোটা মনকে প্রস্ফুটিত করার দায়িত্ব নেয়ার মতো মনও তো থাকা চাই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে। শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেতে পারি আমরা, শিক্ষার জন্য ওয়াইজ উপাধি অর্জন করি আমরা, আমরা পাই মেগাসাস এওয়ার্ড, নাইট উপাধি সম্মানে ভূষিত হই আমরা। পরিবেশ দূষণ রক্ষায় আমরা অগ্রণী, নদীর নাব্যতা আমাদের চিন্তার বিষয়, বৃক্ষ নিধন রোধে আমরা সচেতন। আমাদের সচেতনতা অবৈতনিক বিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গণশিক্ষা, পোলিওমুক্ত বাংলাদেশ, আর্সেনিকমুক্ত পানীয়জল, আমরা যে আশার প্রদীপ জ্বেলে চলতে চাই। সেই আলোর ছটা আজ আলোকিত করুক না গৌরীপুরের সেই ছোট্ট পর্নকুটির।
লেখক :শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক
