পোস্টার, ব্যানার ও তোরণে নগর সয়লাব। যে দিকেই তাকান যায় সে দিকেই নানা রঙের সচিত্র পোস্টার, এখানে সেখানে বেঢপ ঝুলিয়া আছে ডিজিটাল ব্যানার। সে সবও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চিত্রিত, এক বা একাধিক মুখচ্ছবি যেন বা ঘোষণা করিয়া চলিয়াছে তাহাদের জয়ধ্বনি। এইসব পোস্টার-ব্যানার ও তোরণে মুদ্রিত বা উত্কীর্ণ রহিয়াছে অভিনন্দন, শুভেচ্ছা-স্বাগতম আরও কত কী! রাস্তার দুই পাশের দেওয়াল, লাইটপোস্টের খুঁটি, এমনকি সড়কদ্বীপ ও ফুট ওভার ব্রিজের রেলিং সবখানেই পোস্টার-ব্যানারের ছড়াছড়ি। কোথাও কোথাও জীর্ণ-পুরাতন ব্যানার নিরবধি উড়িয়া চলিয়াছে। দেখিয়া পুরবাসী যে কেহ সখেদে বলিয়া উঠিতেই পারেন, আহ! এই না হইলে আমাদের তিলোত্তমা ঢাকা! শাহজালাল (রঃ) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর হইতে বনানী পর্যন্ত সাধ করিয়া রাস্তার দুই ধার সুসজ্জিত করা হইয়াছে, করা হইয়াছে উদ্যান শোভিত, যাহাতে এই নগরে পদার্পণ করিয়া যে কোনও বিদেশির মন ভরিয়া যায়। বাঙালির সৌন্দর্যবোধ দেখিয়া তাহারা ধন্য ধন্য বলিবে। বলিহারি আমাদের নান্দনিক চেতনা! সেই সাজানো রাজপথেরও দুই পার্শ্বের স্থানে স্থানে অজস্র পোস্টার, ব্যানার, লাইফ সাইজ হোর্ডিং দেখিয়া যে কোনও বিদেশির মনে হইতেই পারে, এইখানে কোনও মহোত্সব কিংবা মচ্ছব চলিতেছে। এইসব দেখিয়া চক্ষু না জুড়াইলেও পীড়িত যে হইবে, তাহাতে কোনও সন্দেহ নাই। এই রাজধানী শহর আর শহরতলীর কথাইবা শুধু কেন, এই নগর হইতে বাহির হইয়া পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর কী দক্ষিণ যে দিকেই যাওয়া যাক না কেন, পথের দুই পাশে দেওয়ালে, খুঁটিতে দেখিতে পাওয়া যাইবে অগণিত পোস্টার-ফেস্টুন, ব্যানার, হোর্ডিং। কোনও কোনও দেওয়াল জুড়িয়া অংকিত রহিয়াছে দেওয়াল লিখন। তোরণও বিরলদৃষ্ট নহে। যে কোন উপলক্ষ্য হলেই রাস্তার উপর অসংখ্য তোরণ দেখিতে পাওয়া যায়।
হাতে লেখা পোস্টার-ফেস্টুন, দেওয়াললিখন ইত্যাদির সাথে এই উপমহাদেশের মানুষের পরিচয় অবশ্য বহু কালের। এই অঞ্চলে রাজনীতির অন্যতম অনুষঙ্গ হিসাবে ইহার চর্চা চলিয়া আসিতেছে সেই ঔপনিবেশিক আমল হইতে। বাম রাজনীতির তত্ত্ব ও শ্লোগান প্রচারের জন্য এই সবের প্রচলন হইলেও পাবলিসিটির এই কায়দাটি কালক্রমে বুজোয়া গণতান্ত্রিক দলগুলিও রপ্ত করিয়া নেয়। সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানের রাজনীতির অনিবার্য সহচর হইয়া ওঠে পোস্টার ও দেওয়াল লিখন। ষাটের দশকে ছোটবড় শহর-জনপদের পথের পাশে ভবনের দেওয়ালে উত্কীর্ণ রাজনৈতিক শ্লোগান পথচারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিত অহরহ। কোনও কোনও ক্ষেত্রে উত্কীর্ণ শ্লোগানের অন্তমিল ও কাব্যময়তা চিত্ত দোলায়িত করিয়া যাইত। জলে গোলা নানান রং দিয়া লেখা ওইসব পোস্টার ও দেওয়ালচিকার লিপিকৌশলও ছিল চিত্তাকর্ষক।
কিন্তু এ কালে রাজনীতির বাহিরেও বাণিজ্যিক প্রচার-পসারের কাজেও পোস্টার, ব্যানার এবং দেওয়াল লিখনের উপায় অবলম্বন করা হইতেছে আকসার। ব্যক্তির হাস্যকর স্থূল প্রচারের নিমিত্ত হিসাবেও রঙ-চঙা সচিত্র পোস্টার-ফেস্টুন, ব্যানার, হোর্ডিং ব্যবহার করা হয়। এইগুলি এখন মাল্টি কালারড, মুদ্রিত এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডিজিটাল। প্রচারের এই প্রতিযোগিতা হইতে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কেহই বাদ নাই। আর ইহার মধ্য দিয়া নাগরিক সৌন্দর্যের জায়গা দখল করিয়া নিয়াছে যেনবা নুইসেন্স। তিরোহিত হইয়াছে যেন নান্দনিক বোধ। এই অবস্থার প্রতিকারার্থ দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো নিয়ন্ত্রণ আইন করা হইয়াছে ২০১১ সালে। আইন অমান্য করিয়া যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগাইলে বা দেওয়ালে লিখিলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান করা হইয়াছে। কিন্তু সে আইনের প্রয়োগ কোথায়? যত্রতত্র পোস্টার-ফেস্টুন ও ব্যানারের জঙ্গল দেখিয়া কে বলিবে যে, এইখানে এইগুলি নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন রহিয়াছে! অতঃপর প্রশ্ন তো উঠিতেই পারে, যে আইনের প্রয়োগ নাই বা প্রয়োগ করা যায় না, সেই আইন থাকিবার কি প্রয়োজন!
