দুই মেরু থেকে ফিরিয়ে আনা কঠিন

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:০৩
আমরা সম্ভবত রাজনীতির সবচেয়ে নষ্ট সময় অতিবাহিত করছি বর্তমান চলমানতায়। অন্যদের কথা বাদ দিলাম বড় দুই দল—আওয়ামী লীগ আর বিএনপির নেতা-নেত্রীদের ভাষা আচরণ আর পদক্ষেপ দেখলে ও শুনলে মনে হয় তারা এই মাটি সংশ্লিষ্ট কেউ নন। অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছেন। সেসব গ্রহে কোনো নক্ষত্রের আলো প্রবেশ করে না। শুধু ব্ল্যাকহোলে ঠাসা। তাই শব্দ চয়ন আর ছুঁড়ে দেয়া বাক্য পরিমার্জনার দরকার পরে না। তাদের কথাগুলো সাধারণ মানুষ কিভাবে নিলো কি নিলো না এসব যে একটি বিবেচনার বিষয় তা তারা আমলেই নেন না। যে মঞ্চ থেকে অভব্য, অগণতান্ত্রিক ও অমেধাবী বাচন ছুঁড়ে দেন সম্ভব সে মঞ্চের চারপাশে মোসাহেব এবং নির্বিচারে তালি দেয়া কর্মী সমর্থকদের দেখে বিভ্রান্ত হন। এটিই দেশের চিত্র মনে করে পুলকিত হন এবং অতি উত্সাহে বাচনে রঙ ছড়ান। সমপ্রতি বড় দুই দলের আচরণ ও দলীয় প্রধান নেত্রীদের ‘নীতি নির্ধারণী’ বক্তব্য শুনে আমরা রীতিমত আতঙ্কিত। সচেতন মানুষ এখন এসব দলের কাণ্ডারিদের বক্তব্য ও দলীয় আচরণ দেখে গণতন্ত্র ফিরে আসবে বলে আর আশা করতে পারছে না। গণতান্ত্রিক না হোক প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেশের মর্যাদা ও মানুষের ভাগ্য কিছুটা সংরক্ষিত থাকুক তেমন আশা করতেও ভয় পিছু ধাওয়া করছে। দুই দলের দুই নেত্রী এবাউটটার্ন হতে হতে দুই মেরুর প্রান্তিকে এসে ঠেকেছেন। এই সেদিন সশস্ত্র বাহিনী দিবসে একই অনুষ্ঠানে দুই নেত্রী উপস্থিত থেকেও মুখ দেখাদেখি না করায় সাধারণ মানুষ যে খুব বিস্মিত হয়েছে তা নয়। কারণ আমাদের রাজনীতির পরিচালকদের সাংস্কৃতিক গড়ন সম্পর্কে এখন সাধারণ মানুষের ধারণা অনেকটা স্বচ্ছ। বরঞ্চ এর উল্টোটি হলে—অর্থাত্ দুই নেত্রী পরস্পরকে দেখে একটু সৌজন্যের হাসি দিলে এবং অন্তত ত্রিশ সেকেন্ডের জন্য হলেও কুশল বিনিময় করলে মানুষ বিস্মিত হতো। যাক তেমন বিস্ময়ের সুযোগ তারা দেননি। এদেশের আশাবাদী বোকা মানুষ তবুও গণতন্ত্র ফিরে পেতে চায়। তাই সকল তিক্ত অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা ভুলে গিয়ে বিশ্বাস করতে চায় এই দুই দলের নীতি-নির্ধারকদের ক্ষমতার ও কঠিন দলতন্ত্রের ঘোর কাটবে। আবার তারা গণমানুষের রাজনীতিতে ফিরে আসবেন। তেমন বক্তব্য আর দলীয় নীতি-নির্ধারণের কথা শুনে মানুষের মন আবার চনমনে হয়ে উঠবে। অনেক সময় নির্বাচনকে ঘিরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রাজনৈতিক দলগুলো আবার ঘুরে দাঁড়ায়। পাঁচ বছর পরে হলেও একবার সাধারণ মানুষের কাছে ফিরে আসার তাগিদ অনুভব করে। নতুন পোশাকে শরীরের ঘা আড়াল করতে চায়। দলের নীতি আদর্শ পুনর্বার গণমানুষমুখী করার পদক্ষেপ নেয়। সেই সুযোগে কখনো কখনো নিজেদের স্বচ্ছ করার ইচ্ছে জাগে। এসব কারণে ঘরপোড়া এদেশের অনন্যোপায় বিপন্ন মানুষ ভেবেছিল অন্তত নির্বাচনের এই প্রস্তুতিবেলায় আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটবে আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা-যাওয়া করা বড় দুই দল। কিন্তু এই অবেলায় দুই দলের ছোট-বড় নেতা তো বটেই খোদ দুই প্রধান নেত্রী যেভাবে জনসভা ও নানা অনুষ্ঠানে মুখর হচ্ছেন তাতে এমন গণবিচ্ছিন্ন ও অগণতান্ত্রিক শব্দ চয়নের মত মনের জোর পান কেমন করে তা ভেবে বিস্মিত মানুষ! গত ২৮ নভেম্বর বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া নয়াপল্টনে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। একই দিনে টাঙ্গাইলের ধনবাড়িতে জনসভায় ভাষণ দেন আওয়ামী লীগ প্রধান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এই দুটো ভাষণ নিয়ে জনমনে আগ্রহ ছিল। রাজনীতি গতানুগতিকভাবে চললেও নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষের ইচ্ছে ও আকাঙ্ক্ষাকে মূল্য দিয়ে দুইপক্ষ কিছুটা নেমে আসবে বলে মানুষের প্রত্যাশা ছিল। বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপির জনগণকে সম্পৃক্ত করে আন্দোলন করার যেমন সুযোগ রয়েছে তেমনি আওয়ামী লীগ তার প্রতিপক্ষ জামায়াত বিএনপি বলে জনগণকে আস্থায় নিয়ে এসে রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে এবং নিজ সৃজিত অচলায়তন ভেঙ্গে গণআস্থায় আসার চেষ্টা করবে এমন প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের ছিল। কিন্তু দুই নেত্রীর ভাষণেই যথারীতি মানুষ হতাশ হয়েছে। সকলেই বুঝতে পেরেছে দুই মেরু থেকে প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছে কারো মধ্যে নেই। তেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার ইচ্ছে বা ক্ষমতা আছে বলেও মনে হয় না। সাধারণ মানুষের সামনে বিএনপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তারা সংসদ বর্জনের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে ভোটারদের সাথে প্রতারণা করে চলছে। রাজপথের ভাষণ ও কর্মসূচিতে নিজেদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফিরে যাওয়ার অভিলাষ ছাড়া অন্য কোনো ইস্যু গুরুত্ব পাচ্ছে না। জনগণের হাজারটা সংকট বিরাজ করলেও সেসব ইস্যু বানিয়ে আন্দোলনে নামার কথা বলছে না। ভাঙ্গা রেকর্ডের মত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবিতেই ঘুরপাক খাচ্ছে। সংখ্যা স্বল্পতার কারণে উপযুক্ত জায়গা হলেও সংসদে এসে বলার সাহস নেই বিএনপির। মেঠো বক্তৃতায় ও সাংবাদিকদের সামনে গত্বাধা দাবি জানাচ্ছে বটে তবে তার ভেতর বর্তমান বাস্তবতার আলোকে কোনো পরিমার্জনা ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা নেই। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বারোয়ারিভাবে পরিবেশন করার কোনো অর্থ থাকে না। এসব কারণে বিএনপির রাজনৈতিক সততা নিয়ে প্রশ্ন বড় হচ্ছে। ঠিক একই সাথে রাজনৈতিক আচরণে ও বক্তব্যে গণতান্ত্রিক শব্দ না থাকায় এবং ঘোষিত কর্মসূচিতে গণস্বার্থ বিবেচনা না পাওয়ায় বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচিও প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি নেত্রী ও অন্য নেতারা যখন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন না করার জন্য আন্দোলনের কথা বলেন তখন সে আচরণে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বজায় থাকে। কিন্তু যখন এই বলে কথা শেষ করেন যে, ‘নির্বাচন করতে দেয়া হবে না’ তখন এর ভেতর অগণতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারের বল প্রয়োগের ইঙ্গিত থাকে। জনগণের চাওয়া না চাওয়ার বিষয়টি কি বিএনপি পরীক্ষা করে দেখেছে? পাশাপাশি অবাধ নির্বাচনের কথা এলে মানুষ কি নিকট অতীতে বিএনপির আচরণ ভুলে যাবে? ভোটারবিহীন মাগুরা নির্বাচনের কথা না হয় বাদ দিলাম। ভুয়া ভোটার তালিকায় আজিজ মার্কা নির্বাচনের আয়োজনের কথা তো মানুষ এখনো বিস্মৃত হয়নি। সুতরাং যুক্তি থাকলেও নির্বাচন নিয়ে বিএনপির ওয়াজ সাধারণ মানুষকে খুব বেশি ছুঁয়ে যাবে বলে মনে হয় না। বিএনপি আমলের দুর্নীতি আর অরাজকতার কথা মানুষ ভুলে গেছে ভাবাটা ঠিক হবে না। হাওয়া ভবন আতঙ্ক এখনও অনেককে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কোকোর পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনা নিয়ে বিএনপি যতই চিত্কার করে আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রৃিতবাদ জানাক সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করবে না। গত ২৮ নভেম্বরের জনসভায় বেগম জিয়া যেভাবে আন্দোলন কর্মসূচি দিয়েছেন তাতে জনস্বার্থ রক্ষা প্রসঙ্গের বদলে ক্ষমতায় যাওয়ার উদগ্র বাসনাই স্পষ্ট হয়েছে। আর সে পথ চলায় জনগণের ঘাড়ে পা রাখার অভিপ্রায়ই ব্যক্ত করেছেন। কারণ বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে প্রয়োজনে লাগাতার হরতাল ডাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অর্থাত্ জনগণকে জিম্মি করে তাদের জানমাল অর্থ আর নাগরিক অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের দলীয় উদ্দীষ্ট সাধন করবেন। এছাড়াও নাগরিক জীবন থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এখন বিএনপির দলীয় সংহতি বজায় নেই। রয়েছে নানা রকম বিভ্রান্তি। এমন অবস্থায় বড় কোনো আন্দোলন মানানো বিএনপির জন্য মোটেও সহজ হবে না। একারণেই বোধ হয় জামায়াতে ইসলামীর হঠাত্ করে ডাকা হরতালে ততোধিক হঠাত্ করে বিএনপির ‘নৈতিক সমর্থন’ জানোর মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বের খরকুটো ধরে টিকে থাকার আর্তিই যেন প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু পরিবর্তিত এই অবস্থায় জামায়াত সংশ্লিষ্টতা বিএনপিকে কতটা স্বস্তি দেবে তা একটি বড় প্রশ্ন বটে। আওয়ামী লীগ নেত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও কি নিজেদের গড়া অচলায়তন ভাঙ্গতে পেরেছেন? ধনবাড়ির ভাষণে বিরোধী দলীয় আন্দোলনের রাজনৈতিক মোকাবেলা, বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি, দেশের সুশাসন সংকট ইত্যাদি বিষয়ে নীতি-নির্ধারণী বক্তব্য সকলে আশা করেছিল। রাজনৈতিক সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বশীল প্রস্তাবনা নিয়ে আসবেন এমনটি আশা করেছিল আশাবাদী মানুষ। কিন্তু মেরুর প্রান্তে অবস্থান নেয়া প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ কোথায় সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়াকে আমলে আনার? তাই পুরো ভাষণে পুরোন রেকর্ড বাজলো। মনে হলো না নির্বাচন সামনে রেখে সাধারণ মানুষের সামনে কথা বলছেন। নির্বাচনী বিধি ব্যবস্থা নিয়ে দলীয় সিদ্ধান্তে অনড় থাকার কথাই বলে চললেন। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসে মানানসই না হলেও কোকোর পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনা নিয়ে রসালো বক্তব্য রাখলেন অনেকটা সময় ধরে। আর রাজনীতির মাঠে সহযোগী আরেক নেত্রীকে সৌজন্য বা সম্ভ্রম দেখানোর সংস্কৃতিকে আড়াল করে বহুবার উচ্চারিত এবং সচেতন মানুষ কর্তৃক সমালোচিত ‘চোরের মায়ের বড় গলার’ মত নিম্নমানের উক্তি করতেও কসুর করলেন না। অর্থাত্ দুই দলের মধ্যে অহিনকুল সম্পর্কের বরফ যে আরো জমাট হয়েছে তাই প্রকাশ পেলো দুই দলের দুই নেত্রীর ভাষণে। অবস্থাদৃষ্টে এখন মানতেই হচ্ছে দুই মেরু থেকে দুই নেত্রীকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে আনা সুকঠিন একটি বিষয়। এমন অবস্থা চলতে থাকলে জনগণের আস্থা থেকে দুই দলই যে ক্রমে সরে যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমন কোনো আস্থাশীল পক্ষ দাঁড়ায়নি যে সাধারণ মানুষ শেষ আশ্রয়ের জন্য সেখানে ছুটে যাবে। এই বাস্তবতায় জনমনে বিভ্রান্তি বাড়তে পারে। তাতে ক্রমে অশান্ত হবে রাজনৈতিক অঙ্গন। আমরা আমাদের রাজনৈতিক ভাগ্য বিধাতাদের অনুরোধ করবো এই বাস্তবতা গভীরভাবে অনুভব করতে। অপনারা সমস্ত বদ্ধবুদ্ধি অতিক্রম করে, সমস্ত অচলায়তন ভেঙ্গে একবার দলীয়, পারিবারিক ও ব্যক্তি স্বার্থভাবনা কমিয়ে গণতান্ত্রিক হওয়ার চেষ্টা করুন। সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি সর্বাধিক মূল্য দিন। এদেশের সাধারণ মানুষ অকৃতজ্ঞ নয়। ঋণ পরিশোধ তারা করতে জানে।  লেখক:অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন