আইএমএফের শর্ত প্রসঙ্গে

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:১২
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তার সম্প্রসারিত ঋণ সহায়তার (ইসিএফ) দ্বিতীয় কিস্তি ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক সংকেত দিয়াছে। তবে তাহার জন্য বরাবরের মতো আলোচিত নানাবিধ শর্ত মানিতে হইতেছে সরকারকে। আইএমএফ-এর মতে, ঋণের এই কিস্তি ছাড় দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অন্যান্য সংস্থার কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করিবে। বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং বাড়াইবে। এই কথা সত্য যে, এই ঋণ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরিয়া রাখিতে সাহায্য করিবে। আন্তর্জাতিক লেনদেনের সহিত সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করিবে। কিন্তু প্রশ্ন হইলো, এই ঋণের কিস্তির ছাড় পাইতে যে সকল শর্ত মানা হইতেছে তাহা কতটা গ্রহণযোগ্য। অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত করিয়াছেন যে, শীঘ্রই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হইবে। এই শীঘ্রই-এর মানে ঋণের শর্ত পূরণ করিতেই দামের এই পরিবর্তন আনা হইবে। শর্ত পূরণের অংশ হিসাবে সারের ভর্তুকি সমন্বয় করিবার কথাও আসিয়াছে। আরো আসিতেছে ব্যাংক কোম্পানি আইন লইয়া আরোপিত শর্ত। এই আইনের আওতায় পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা কত হইবে তাহা লইয়া মতবিরোধ রহিয়াছে আইএমএফের সাথে। আইএমএফ এই সীমা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের ২৫ শতাংশে রাখিতে বলিয়াছে। সরকার চাহিতেছে তাহা ৪০ শতাংশে রাখিতে। শর্তগুলি তলাইয়া দেখিলে ইহার বেশিরভাগই সরকারের এমনিতেই করা উচিত বলিয়া অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। তবে সবচাইতে কঠিন শর্ত হইলো, সারের ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি। আইএমএফের ঋণ সহায়তা যেমন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরিয়া রাখিতে সাহায্য করিবে তেমনই পর্যাপ্ত কৃষি উত্পাদন ও অর্থনীতির স্থিতি বজায় রাখিতে ভূমিকা রাখিবে। ফলে কৃষিতে ভর্তুকির ব্যাপারে সরকারের মনোভাব এবং অবস্থান কঠোরভাবে অনুসরণ করিতে হইবে। কৃষিতে ভর্তুকি শুধু অর্থনীতির স্থিতিই বজায় রাখে না, এই ভর্তুকির ফলে দেশের কৃষক সমাজ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হইয়া থাকে। এই ভর্তুকি দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখে। কৃষিতে ভর্তুকির বিষয় ছাড়া অন্য সকল বিষয়ে আইএমএফের অবস্থান দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই। অন্তত দীর্ঘ মেয়াদের প্রেক্ষিতে চিন্তা করিলে। জ্বালানির উপর হইতে ভর্তুকি তুলিয়া নিলে মূল্যস্ফীতি খানিকটা বাড়িবে এই কথা ঠিক, তবে এই সকল খাতে ভর্তুকি না কমাইলে, যাহা জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ, তাহা কিন্তু সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করিতেছে। ভর্তুকির পরিমাণ আমাদের উন্নয়ন বাজেটের প্রায় সমান। এত বড় ভর্তুকির দায় হইতে সরকারকে বাহির হইয়া আসিতে হইবে। পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগের সীমা পূর্ব হইতেই পরিশোধিত মূলধনের পঁচিশ, চল্লিশ কিংবা একশত শতাংশে রাখিলেই শেয়ার বাজারের এই বেহাল অবস্থা হইত না। এই সীমা পূর্বে ছিল ব্যাংকের মোট দায়ের দশ শতাংশ। নাম না উল্লেখ করিয়া কোন একটা ব্যাংকের মোট দায় এবং পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ দেখিলে পূর্বের নিয়ম বা আইন কতটা সমস্যাভারাক্রান্ত ছিল তাহা বুঝা যাইবে। কোন একটা ব্যাংকের বর্তমানে মোট দায় প্রায় চল্লিশ হাজার কোটি টাকা অথচ ইহার মোট পরিশোধিত মূলধন হইল এক হাজার কোটি টাকা। পূর্বের নিয়মে ঐ ব্যাংক আইন মানিয়া চার হাজার কোটি টাকা শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করিতে পারিত। আর এখন আইএমএফের প্রস্তাব অনুযায়ী পারিবে ২৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী ৪০০ কোটি টাকা। ইহার মানে পূর্বের নিয়ম হইতে বাহির হইয়া আসিতে আইএমএফ যে চাপ দিয়াছে তাহা সঠিক ছিল। ফলে আইএমএফের সকল শর্তই দেশের জন্য ক্ষতিকর নয়। আইএমএফের কিছু শর্ত দেশের স্বার্থেই মানিতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন