দেশের পরিবহন ক্ষেত্রে ঝুঁকি দিনকে দিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। সড়ক, নৌ কিংবা রেল এই তিন ধরনের পরিবহনই আজ যাচ্ছেতাই রকমের ঝুঁকিপূর্ণ। সড়কপথে চালকদের পর্যাপ্ত ও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব, আইন না মানার প্রবণতা, অতিরিক্ত বেগে গাড়ি চালনা, রাস্তাঘাটের দুরবস্থাসহ আরও হরেক রকম কারণেই দুর্ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে এবং এ কারণে বহু মূল্যবান প্রাণই বলিতে গেলে প্রতিদিনই অকালে ঝরিয়া পড়িতেছে। নৌ পরিবহন ক্ষেত্রের চিত্রও তথৈবচ। পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌযান, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা, আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করা, নদীর গতিপথ সম্পর্কে যথাযথ সতর্কতা বা সংকেত না থাকা ইত্যাকার কারণে নৌ দুর্ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, রেল পরিবহনের দিকে তাকাইলে আরও নাজুক পরিস্থিতিই চোখে পড়ে। গত রবিবার পত্রিকান্তরের খবরে প্রকাশ, দেশে ঝুঁকিপূর্ণ লাইন দিয়া রেল চলিতেছে। রেল পরিবহন সকল বিচারেই যাত্রীদের জন্য অর্থ ও সময় সাশ্রয়ী বিবেচিত হইলেও ইহার প্রতি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে কোন সরকারই তেমন কোন যত্ন বা মনোযোগ দেয় নাই। ইহার নানাবিধ কারণ রহিয়াছে, যাহা বর্ণনা করিতে গেলে সপ্তকান্ড রামায়ণের আকারই ধারণ করিবে। এই পরিসরে সে সুযোগ নাই। তবে সেই বৃটিশ আমল হইতেই যাত্রীসাধারণেরা রেল ভ্রমণকে অধিক নিরাপদ, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী হিসাবে দেখিয়া আসিতেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কিংবা এশিয়া, ইউরোপের ও উন্নত দেশগুলিতে রেল পরিবহন বিশেষ গুরুত্ব লাভ করিয়া থাকে। আমাদের এই দারিদ্র্য-পীড়িত দেশে ইহার গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থতা বাস্তবিকপক্ষে আমাদের দেশ পরিচালকদের অপরিণামদর্শী মনোভাবেরই পরিচায়ক মাত্র।
বর্তমানে রেল প্রকল্প খাতটি অবহেলা, উপেক্ষা আর অযত্নে মুমূর্ষু রূপ ধারণ করিয়াছে যেন। সারাদেশে ২ হাজার ৮৩৫ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে এক হাজার একশত কিলোমিটার লাইন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। আর এ কারণেই লাইনচ্যুতির ঘটনা অহরহই ঘটিতেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই জানমালের ক্ষতিসাধিত হইতেছে। বিগত এক বত্সরে এই রূপ ১৬২টি লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটিয়াছে। দুর্ঘটনার ভয়ে দেশে অনেক স্থানেই রেল অত্যন্ত ধীর গতিতে চলিতেছে। ইহাতে জানমালের ক্ষতির ঝুঁকি খানিক হ্রাস করা সম্ভব হইলেও গন্তব্যে পৌঁছিতে অধিক সময় লাগিতেছে। এইদিকে এই ঝুঁকিপূর্ণ লাইনের মধ্যে কমপক্ষে ১ হাজার একশত কিলোমিটার লাইন জরুরি মেরামত প্রয়োজন বলিয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানাইয়াছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে বিগত কিংবা বর্তমান কোন সরকারের আমলেই তেমন কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত হয় নাই। রেল লাইনের নিচের স্লিপার ক্ষয় হইয়া গিয়াছে। অনেক স্থানে আবার স্লিপারের নিচের পাথর সরিয়া গিয়াছে। রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের অধিকাংশ রেলপথকে এইরূপ জরাজীর্ণ রাখিয়া রেল পরিবহনের উন্নতি সাধনের চিন্তা যে এক ধরনের অর্বাচীনতা উহা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না।
রেলপথ মেরামত ও আধুনিকীকরণের তোড়জোড়ের কথা প্রায়ই শোনা যায় এবং এজন্য প্রচুর অর্থ বরাদ্দও করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সে সব কোথায় যে শেষ পর্যন্ত উড়িয়া যায় তাহা নির্ণয় করা সহজসাধ্য নহে। কেননা, সরিষার ভিতরই যখন ভূত বসিয়া থাকে তখন সেই সরিষা দিয়া ভূত বিতাড়ন সম্ভব কি রূপে? তবুও বিষয়টিকে উপেক্ষা করা চলিতে পারে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রেল পরিবহন খাতের সত্যিকার উন্নতি সাধনে সচেষ্ট হইতেই হইবে যদি তাহারা সত্যি সত্যি দেশের উন্নতি চাহেন।
