প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বাংলা একাডেমী

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৮
বাংলা একাডেমীর ৫৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর আলোচনায় বক্তাগণ বলিয়াছেন, বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য আজও বাস্তবায়িত হয় নাই। কারণ, এখনও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করা যায় নাই; শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বাংলার পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা যেমন হয় নাই, তেমনই সর্বোচ্চ আদালতে এখনও পর্যন্ত আমরা বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করিতে পারি নাই। অথচ একুশের প্রেরণাই বাংলা একাডেমীর জন্মবীজ রচনা করিয়াছে। তবে বক্তাগণ ইহাও উল্লেখ করিয়াছেন যে, কেবল ভাষা ও সাহিত্যের প্রতিষ্ঠান হিসাবে বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হইলেও কালক্রমে বইমেলার আয়োজনসহ নানামুখি কর্মসূচির মাধ্যমে ইহা দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গবেষণার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হইয়াছে। ১৯৮৪ সাল হইতে আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা বর্তমানে জাতীয় আবেগ ও সৃজনশীল উদ্ভাবনার সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক মেলায় পরিণত হইয়াছে। বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, ছাত্র, গণমাধ্যম-কর্মী, প্রকাশক, সাহিত্যপত্র-লিটল ম্যাগাজিনের উদ্যোক্তা, গবেষণা সংস্থা ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সর্বোপরি লেখক ও পাঠকের সমাবেশে বাংলা একাডেমীর একুশের এই আয়োজন অনন্যসাধারণ। একুশের চেতনা কেবল বাংলা একাডেমী নামের প্রতিষ্ঠানটিরই জন্ম দেয় নাই। সর্বাগ্রে বলিতে হইবে যে, ৫২’র ভাষা আন্দোলন এমন একটা বীজমন্ত্র যাহার প্রভাবে ধর্মীয় পরিচয়ের বিপরীতে দাঁড়াইয়া ভাষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উদ্বোধন ঘটিয়াছে। ইহার প্রভাবে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক জীবনের বাঁকবদল ঘটিয়া যায়। বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি নূতন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় অনিবার্য হইয়া উঠিয়াছিল। তবে, ভাষা আন্দোলন ও একুশের চেতনা ওতপ্রোতভাবে জড়াইয়া আছে বলিয়াই অন্যান্য দেশের ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলির তুলনায় বাংলা একাডেমীর নিকট আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। জাতীয় আবেগের স্পন্দন বাংলা একাডেমী নামের প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরিয়া আঁকুপাঁকু করে বলিয়াই ইহার সাধ্যের অতিরিক্ত অনেক কিছুই আমরা চাহিয়া বসি। তাই, আদালত হইতে শুরু করিয়া সর্বস্তরে, এমনকি শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বাংলা প্রচলনে জাতীয় ব্যর্থতার সবটুকু দায় বাংলা একাডেমীর উপর চাপাইয়া দিতেও আমরা কুণ্ঠাবোধ করি না। যদিও, সর্বস্তরে বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করিবার গুরুভার চাপাইয়া দেওয়ার বদলে বরং শিল্প-সাহিত্যের উত্সাহবিধানে, বাংলা ভাষার জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানিক ধারার ভাষারূপ ও সাহিত্য লইয়া গবেষণা ও সংরক্ষণের কাজ করিতে, বিদেশি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যের ভাষান্তরে এবং সর্বোপরি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সম্ভার আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলিয়া ধরিতে বাংলা একাডেমী কতোটুকু সাফল্য দেখাইতে পারিতেছে তাহাই আমাদের অগ্রগণ্য বিবেচ্য বিষয় হওয়া দরকার। স্বাধীনতার পরে বাংলা একাডেমীর বিভাগসমূহ পুনর্বিন্যস্ত করিয়া অনুবাদের জন্য একটি আলাদা বিভাগ খোলা হইয়াছিল। যদিও সামরিক প্রশাসকের এক কলমের খোঁচায় ১৯৮৩ সাল হইতে তাহার আর আলাদা অস্তিত্ব নাই। অথচ, বাংলা ভাষায় উঁচু দরের আন্তর্জাতিক চিন্তা-চেতনা, বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যের পরশ পাইতে হইলে এবং বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বহির্বিশ্বে পরিচিত করিতে শক্তিশালী অনুবাদ বিভাগ গড়িয়া তুলিবার বিকল্প নাই। তদুপরি, বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটিতে বাঙালি ছাড়াও অন্য অনেকগুলি নৃগোষ্ঠীর মানুষ তাহাদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি লালন করিয়া চলিয়াছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে একুশের স্বীকৃতি কেবল আমাদের ভাষাগৌরবকেই প্রতিষ্ঠা করে না, উদার হইয়া অন্য নৃগোষ্ঠীগুলির মাতৃভাষার শ্রীবৃদ্ধি করিতেও আহ্বান জানায়। বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশে বাংলা একাডেমীর অবদান কম নহে। তবুও বলিতে হইবে যে, সরকার ও দলীয় নানাবিধ স্বার্থের তাঁবেদারি করিতে গিয়া বতর্মানে জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধি ও বিস্তারে মনোযোগ দেওয়ার বদলে বত্সরব্যাপী সেমিনার, আলোচনা সভা, স্মরণসভা, স্মারক বক্তৃতা এবং জাতীয় দিবস উদযাপন, সাহিত্য পুরস্কার প্রদানসহ নানাবিধ অনুষ্ঠানের আয়োজন করিতেই বাংলা একাডেমীকে শ্রম ও মেধা নিয়োজিত রাখিতে দেখা যায়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন