ডিজিটাল বাংলাদেশ ডিজিটাল দুর্নীতি

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৯
১/১১ আমাদেরকে যে ঝাঁকুনি দিয়ে গেছে, আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে, আমাদের রাজনীতিবিদদের চরিত্র কিছুটা উম্মোচিত হয়েছে, আমরা মনে করেছিলাম দুর্নীতিগ্রস্ত জাতি হিসেবে বিশ্ববাসী আমাদেরকে আর দেখবে না। আমরা জাতি হিসেবে কিছুটা হলেও দুর্নীতিকে ছুঁড়ে ফেলে সুনীতিতে ফিরে আসবো। আমাদের রাজনীতিবিদদের কিছুটা হলেও বোধোদয় হবে। তারা সাদাকে সাদা, আর কালোকে কালো বলতে নতুন করে শিখবে। গত সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনেক বড় বড় কথা বলেছিলেন। আমাদেরকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ যে ডিজিটাল দুর্নীতির দেশ হবে তা সেদিন আমরা অনুধাবন করতে পারিনি। অবশ্য পারলেও আমাদের কিইবা করার ছিল? আমরাতো মুদ্রার এপিট আর ওপিঠের মধ্যেই আটকা পড়ে আছি। ইতোমধ্যেই দুর্নীতির নৌকা নদী পেরিয়ে সাগরে বিচরণ করছে। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও অবস্থান করছে। দুর্নীতিতে আমাদের দেশ অনেক আগেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন । তবে আগে দুর্নীতি হতো গোপনে এখন হয় প্রকাশ্যে। আগে দুনীতি হতো দেশে এখন হয় দেশে বিদেশে। আগে দুর্নীতি হতো কিছু সেক্টরে এখন দুর্নীতি হয় না এম সেক্টর আর পাওয়া যায় না। আগে দুর্নীতি হতো গতানুগতিক পদ্ধতিতে এখন হয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে। পদ্মা সেতুর চূড়ান্ত চুক্তি না হতেই দুর্নীতির সংবাদ পেয়ে গেছে বিশ্ববাসী। কি অবাক কান্ড। সেতু হবে পদ্মা নদীতে দুর্নীতি হয় বিশ্বব্যাংকের অফিস কক্ষে। সেখানেতো রাঘব-বোয়াল ছাড়া অন্য কারো প্রবেশাধিকার নেই। সরকার দুর্নীতির কথা একবার স্বীকার করে আবার অস্বীকার করে। যাকে বলে চোরের মার বড় গলা। অর্থাত্ ডিজিটাল পদ্ধতি। এর মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু। অবশ্য বিষয়টা নিয়ে এখন আর কেউ মাথা ঘামায় না। ডিজিটাল পদ্ধতিতে আমরা ভুলে যাচ্ছি দিনে দিনে। দেশে কত সিন্ডিকেট আর সিন্ডিকেটের খবর। কিন্তু সেই সিন্ডিকেটের মুখতো এখনো দেশবাসী দেখলো না। সিন্ডিকেটের কালো বিড়াল আর সাদা বিড়াল এখনো থলে থেকে বের হলো না। সরকার বের করতে পারলো না। অথচ রেলের কালো বিড়াল সড়কের কালো বিড়াল স্বাস্থ্যের কালো বিড়াল শিক্ষার কালো বিড়াল একটু একটু করে বের হতে শুরু করছে। অথচ কালো বিড়াল নেই কোথায়? কোন সেক্টরে? সরকার কি একবার বুকে হাত দিয়ে একটি সেক্টর দেখিয়ে বলতে পারবে এখানে দুর্নীতি নেই, এখানে কালো বিড়াল নেই। সে সাহস কি সরকারের আছে? সে মুখ কি আছে? যদিও এখন কেউ আর কালো বিড়ালের গল্প বলে না, লেখে না। আমরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভুলে যাচ্ছি। সরকারের দলীয়করণের নমুনা দেখলে মনে হয় আব্রাহাম লিংকনের গণতন্ত্রের সেই বিখ্যাত সংজ্ঞাটি এখানে অচল। এখানে সরকার দেশের জন্য নয়, জনগণের জন্য নয়। সরকার দলের জন্য। এখানে দেশ মুখ্য নয়, দলই মুখ্য। দল এবং দলীয় লোকদের মোটাতাজাকরণের জন্যই সরকারের ক্ষমতায় আসা। ডিজিটাল পদ্ধতির উদ্ভাবন করা। সরকারের প্রতিটা সেক্টর এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত দলীয়করণের ভারে ন্যূব্জ। নগ্ন দলীয়করণের ফলে হেন অপকর্ম নেই যা আজ হচ্ছে না। দলের প্রতি নগ্ন আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ না থাকায় অনেক যোগ্য ব্যক্তি আজ রাষ্ট্রে পর্যাপ্ত সেবা দিতে পারছে না। কোণঠাসা হয়ে পর্দার অন্তরালে পড়ে আছে অনেক যোগ্য প্রশাসনিক কর্মকর্তা। ফলে বঞ্চিত হচ্ছে রাষ্ট,্র বঞ্চিত হচ্ছি আমরা। দেশ আজ নিয়োগ বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, প্রমোশন বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রশ্নপত্রের বাণিজ্য পর্যন্ত বাদ যাচ্ছে না। প্রথম শ্রেণীর ভর্তি থেকে বিসিএস চাকরি পর্যন্ত সর্বত্র বাণিজ্য। যার ফলে যোগ্য লোকেরা বঞ্চিত হচ্ছে। অযোগ্যরা নিয়োগ পাচ্ছে, ভর্তি হচ্ছে, প্রমোশন পাচ্ছে। আর এই ডিজিটাল অপকর্মগুলো তো তারাই করছে যারা ডিজিটালের উদ্ভাবক। কথায় কথায় ডিজিটালের জিকির গায় যারা। অন্যদেরতো এক্ষেত্রে চান্সই পাওয়ার কথা নয়। অন্যেরাতো দৌড়ে আছে। ডিজিটাল দৌড় তাদের পিছনে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। এদেশের দলীয় লোকেরা সব সময়ই আখের গোছায়। কিন্তু ডিজিটাল পদ্ধতিতে আখের গোছানোর ইতিহাস এই প্রথম। ক্ষমতায় আসার পরই শেয়ার বাজার কেলেংকারি থেকে হলমার্ক কেলেংকারি পর্যন্ত কেলেংকারির বাদ আছে কি? যুবক-ডেসটিনির চুরি থেকে শুরু করে ভূমিদস্যুতা পর্যন্ত সর্বত্রই ডিজিটাল পদ্ধতি। শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা, তুরাগের দিকে তাকালে বুক খা খা করে। কিভাবে ভরাট হয়ে যাচ্ছে দুকূল, সাধারণ মানুষ সবই দেখে কিন্তু সরকারে যারা তার দেখে না। কারণ তাদের চোখ হলো ডিজিটাল চোখ। ডিজিটাল চোখ দিয়ে নিজেদের চুরি-ডাকাতি, খুনখারাপি-বাটপাড়ি, দখলদারি-চাঁদাবাজি দেখা যায় না। শুধু অন্যের ফাঁক-ফোকর দেখা যায়। আবহমানকাল থেকেই আমরা বঞ্চনার শিকার। বঞ্চনার ঘা সইতে সইতে অল্প কথাতেই তুষ্ট হয়ে যাই। না পেয়েই সন্তুষ্ট হয়ে যাই। আমাদের রাজনীতি আমাদেরকে ভেড়ার পালের মত একবার এদিকে একবার ওদিকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। দিল্লীকা লাড্ডুর মত আমরা পস্তাই। ব্রিটিশ গেলো পাকিস্তান গেলো এলো স্বাধীনতা। এলো বারাক ওবামার পরিবর্তনের হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে ডিজিটালের হাওয়া। কিন্তু আমরা কি পেলাম। ১৬ কোটি লোক কি পেলো? ডিজিটাল বাংলাদেশ না ডিজিটাল দুর্নীতি? আমেরিকার জনগণ পরিবর্তনের হাওয়াকে পুনরায় সমর্থন দিয়েছে। আমাদের জনগণ ডিজিটাল দুর্নীতিকে কি করবে? সমর্থন না প্রত্যাখ্যান? দেখার আরো অনেক দিন বাকি। লেখক : প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, আফাজউদ্দিন খান ডিগ্রী কলেজ, কাটাবাড়ীয়া, মনোহরদী, নরসিংদী।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন