আজ ৬ ডিসেম্বর। ঐতিহাসিক গণতন্ত্র দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্যোজ্জ্বল দিন। ১৯৯০ সালের এ দিনে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে স্বৈরাচারকে পরাজিত করে মুক্ত হয়েছিল আমাদের গণতন্ত্র। দীর্ঘ নয় বছরের রক্তস্নাত আন্দোলনের মধ্যেই পতন ঘটে সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের।
গণতন্ত্র কি আগে তা জানা দরকার। গণতন্ত্র হলো জনগণের জন্য; জনগণের দ্বারা জনগণের শাসন। জনগণের ইচ্ছাই গণতন্ত্রের মূলভিত্তি। অর্থাত্ গণতন্ত্র হল এমন এক ধরনের সরকার, যা জনগণের দ্বারা জনগণের জন্য তৈরি শাসন ব্যবস্থা। দেশের কল্যাণ, জনগণের কল্যাণ সাধনই গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু আজ কেমন গণতন্ত্র পেল জাতি ? ঘুরে ফিরে এমন প্রশ্নই এখন সামনে আসে। আজকের গণতন্ত্র হলো পিঠাপিঠি মিছিলের অপর্যাপ্ত উচ্ছ্বাস, প্রতিযোগিতা, ‘দেখিয়া দিবার’ উত্তুঙ্গ প্রতিশ্রুতি! বিরোধী পক্ষের একটি মিছিলের উত্তরে সরকার পক্ষের কোমর বেঁধে দুই-দুইটি মিছিলের ব্যবস্থা। ফলো-আপ কিংবা ফলো-অন, যে নামেই তাকে ভূষিত করা হোক না কেন, যুক্তিটি প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত সহজ। শক্তি প্রদর্শন বলে কথা! গণতন্ত্র অর্থ কী মিছিল, হরতাল, জ্বালাও পোড়াও, অরাজকতা ? পুলিশ বাহিনী দিয়ে দলীয় স্বার্থ রক্ষা ? সমাবেশে আসতে না দেয়া ? পথ রোধ করে দেয়া ? গণতন্ত্র মানেই কি কথা কথায় ঘুষ-দুর্নীতি, চাপাবাজি ? যদি এর কোনটাই না হয়, তাহলে এ দেশবাসী আজ কি প্রত্যক্ষ করছে ? গণতন্ত্র চর্চায় সরকারি দল যেমনটা ; অন্যদিকে বিরোধী দলও কম নয়। তাদের কথা “আমি মরিয়া প্রমাণ করিব; এক দিন হূদয় ছিঁড়া দেখাইব”। উভয়ে দেশবাসীকে তাদের উেড় ওঠা ভালবাসা দেখানও বটে ! এভাবেই কি আমাদের গণতন্ত্রের অভিযাত্রা এগুতে থাকবে? এ পথে যে, দেশের অগ্রগতি নেই কিংবা জনপ্রিয়তা নেই তা উপলব্ধির জন্য তো গবেষণার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আমাদের কোন সরকারেরই থিংকট্যাঙ্কে তেমন শুভবুদ্ধির উদয় হয় কিনা- সেটাই প্রশ্ন ? আজকাল ‘বিরোধীরা করেছে বলে তা আমরাও করব’, এহেন ধারাই চলছে দেশে। এমন বালখিল্যপনা শোভনীয় নয় মোটেও। বাস্তব হলো, শোভনীয় না হলেও লোভনীয়তো অবশ্যই। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বৃহত্তর সংখ্যার ব্যবস্থা করতে ছুটেছেন, কোনও ফাঁক রাখেন না, কারণে অকারণে অকাতরে মানুষ আমদানি করেন চতুর্দিক হতে। যেমনটা করছেন আমাদের দেশনেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; তেমনটাই করছেন আপোষহীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। “চাই চাই আমাদের লোক চাই। শক্তির কসরত চাই। যেন না হারি কিছুতেই।” আর তাদের এমন চাওয়া পাওয়ায় যে, দেশের মানুষের জানকবজ হওয়ার জো হয় তা কি তারা ভাবেন কখনো ? ভাববার কথা নয়; ভাবলে হয়তো সমঝোতার একটা পথে আসতেন তারা। তা কখনই হয়নি। হয়তো হবেও না। সমঝোতা হলে দেশের মানুষ সুখ পাবে; এটা অন্তত তাঁদের ভাবা দরকার।
আজকাল গণতন্ত্র মানে কেন যেন মনে হয়, বাহুবল (বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে) ? হালে যা দেখছি শক্তি প্রদর্শনের নামই গণতন্ত্র ? আমার শতবর্ষী নানাজান গণতন্ত্রকে সঙ্গায়িত করলেন এভাবে-“কাহার মুখে কত বল, কাহার বাহুতে কত শক্তি, কাহার দলে কত লোক; তাহা দেখাইয়া দিবার নামই এখনকার রাজনীতি, আজকের গণতন্ত্র।” বেশ বলেছেন নানা আমার। অন্তত এই দেশে রাজনীতি কিংবা গণতন্ত্রের সংঙ্গা এমনটাই হওয়ার কথা। দেশের দুইটি প্রধান রাজনৈতিক গোষ্ঠী ; দুইটি বাহুবলি শিবির, দুইটি হুঙ্কার-ব্যবস্থা তাই বলে। আমাদের জনগণও বুঝে গেছে কি চাইছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রধান দল দুইটি। দুই-এর মরণপণ লড়াই, কার ভাগে কত লোক, কার ভাগে কত দল-উপদল, তা প্রমাণ করে রাজনীতি খেলার ফলাফল নিশ্চিত করার ইঁদুর-দৌড় চলছে তো চলছেই। আজকাল আমাদের নেতারাও রাজনীতি বলতে তাই বুঝেন, নেতাদের অনুসারী মনুষ্যসাধারণও রাজনীতির নামে তারই আরাধনা করেন।ইজ্জত হারিয়ে ‘বাংলা মা’ আমার তবুও বেঁচে আছে। বেঁচে থাকবে কেবলই আত্মবিশ্বাসের জোরে ...। গণতন্ত্রের আশায়। আমরাও সেই দিনটির অপেক্ষায় রইলাম।
লেখক- সাংবাদিক
