[ অ র্থ নী তি ]

চাল রপ্তানির প্রসঙ্গ কথা

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩৫
বিশ্বে চাল রপ্তানিকারক দেশের সংখ্যা খুব বেশি নয়, যদিও পশ্চিম এশিয়া ব্যতীত এশীয় প্রায় সব দেশেই চাল প্রধান খাদ্যশস্য। প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে রয়েছে থাইল্যান্ড, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম, চীন, পাকিস্তান। বাংলাদেশের কৃষিতে ধানের প্রাধান্য বলা যায় একক। একশত ভাগ চাষাধীন জমির ৭৬ শতাংশই ধান চাষের আওতাধীন। অগ্রহায়ণও এখন আর ধান কর্তনের প্রধান মৌসুম নয়। জাত হিসেবে বোরো উঠে এসেছে এক নম্বরে। উত্পাদন প্রায় ১৮.৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন, আমন ১২.৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন এবং আউশ ২.৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ১৯৭৪-৭৫ সালে চালের মোট উত্পাদন ছিল ১১ দশমিক ১ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১১-১২ অর্থ বছরে মোট উত্পন্নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩.৮০ মিলিয়ন টনে। জনসংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১০-১১তে পৌঁছেছে ১৫২.৫০ মিলিয়নে (১৫ কোটি ২৫ লক্ষ)। গত চার বছরে কৃষিতে সাফল্য ছিল ধারাবাহিক এবং উল্লেখযোগ্য। গত চারটি বছরই প্রকৃতি ছিল অনুকূল। ফসলহানিকর বানবন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি বা বড় রকমের অনাবৃষ্টি হয়নি। কৃষিখাতের ব্যবস্থাপনাও ছিল চমত্কার, সার বা জ্বালানির কোথাও অভাব হয়নি। সার বিক্রেতারাই কৃষক খুঁজেছে সার বিক্রির জন্য। ডিজেল, বিদ্যুত্, সারে কৃষক ভর্তুকি পেয়েছে অতীতের চেয়ে অনেক বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ আগ্রহে, বর্ধিত হারে পেয়েছে কৃষিঋণ বর্গাচাষীরা, মশলা চাষীরা বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। গত ২০১১-১২ আর্থিক বছর থেকেই পত্র-পত্রিকায় উত্পাদক কৃষকদের আর্জি প্রকাশিত হচ্ছিল যে, কৃষকবৃন্দ ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না এবং বলা হচ্ছিল উত্পাদন খরচও উঠে আসছে না। সারাদেশে মোটা চালের দাম ছিল গড়ে ৩০ থেকে ৩২ টাকা। জাত ভেদে অঞ্চল ভেদে উত্পাদন খরচের পার্থক্যও আছে। বাজারেও গত এক বছরে চালের দামের তেমন বেশি উঠানামা হয়নি। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে আবার এ বছরের (২০১২-১৩) আমন ধানের কর্তন শুরু হয়েছে। গত ২৮ নভেম্বর ডেইলি স্টার পত্রিকা প্রতিবেদন ছেপেছে (পৃষ্ঠা-৯), রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারি, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে ধান কাটা শুরু হয়েছে, ফলন আশানুরূপ হলেও দাম অত্যন্ত কম থাকায় কৃষক লোকসানের সন্মুখীন হচ্ছে। গুটি স্বর্ণা ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতিমণ ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। এই ধান চাষে একরে খরচ হয়েছে ২৮ হাজার টাকা। একরে ফলেছে ৪২ মণ। সেই হিসেবে প্রতিবেদন অনুযায়ী মোট বিক্রি হবে ২১ হাজার থেকে ২৩ হাজার টাকা। লোকসান একর প্রতি ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। ২১ নভেম্বরের ডেইলি স্টারের বিজিনেস পাতায় ঐ রকম আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বলা হয়েছে ধানের সরবরাহ অত্যধিক এবং দাম পড়ে যাচ্ছে সর্বত্র, যা কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত গড় উত্পাদন খরচেরও অনেক কম। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকায় মোটা চালের খুচরা গড় দাম ২৮ দশমিক ৫০ টাকা যা গত বছরের চেয়েও ৮ দশমিক ১ শতাংশ কম। অবশ্য ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকায় চালের দাম কেজি প্রতি গড়ে ২-৩ টাকা অবশ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে চালের ব্যাপক সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে, চালের দাম আর হয়তো বাড়বে না। যদিও ফসলের ভরা মৌসুমে সবসময়ই কৃষি পণ্যের দাম থাকে সর্বনিম্ন। যাইহোক, বছরব্যাপী চালের গড় দাম কমই ছিল। ছিল ভোক্তাদের সন্তুষ্টির মধ্যেই। তবে উত্পাদন খরচ মোটামুটি উঠে না এলে, উত্পাদকবৃন্দ হতোদ্যম হবেই এবং ব্যয়বহুল ধান চাষে উত্পাদকবৃন্দ উত্সাহ হারাতেই পারে। সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বোরো চাষাবাদে। গত বছর মূল্য কম থাকায়, এই বছর চালের মোট উত্পাদন গত বছরের চেয়ে না কমে গেলেও খুব বেশি বাড়বে না-এমনটা আশাই করা যায়। এ বছরও উত্পাদকবৃন্দ কিছু মুনাফার মত দাম না পেলে আগামীতে ধান চাষে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। চালের দাম ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আমার মূল বক্তব্য হচ্ছে; আমরা কি চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ? বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্স (বিবিএস) কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের বরাতে যে হিসেব দিচ্ছে ২০১১-১২ অর্থবছরে চালের উত্পাদন বলা হয়েছে ৩৩ দশমিক ৮০ মিলিয়ন টন। আমাদের লোকসংখ্যা ২০১০-১১ সাল শুমারি অনুযায়ী ১৫২ দশমিক ৫০ মিলিয়ন। বিবিএস এর তথ্য অনুযায়ী মাথাপিছু বছরে চাল প্রয়োজন হয় ১৫২ কেজি। শুধু মাথাগুণতিতে বাত্সরিক চালের প্রয়োজন ২৩ দশমিক ১৮ মিলিয়ন টন। উত্পন্ন চালের থেকে বীজ, অপচয় ও গো-খাদ্য মিলিয়ে আরো প্রয়োজন কমপক্ষে ১২ শতাংশ, যা মোট উত্পন্ন চালের ৪ দশমিক ০৬ মিলিয়ন টন। সবমিলিয়ে দেশে চালের প্রয়োজন (২৩.১৮ + ৪.০৬)=২৭.২৪ মিলিয়ন টন এবং এই হিসেবে উদ্বৃত্ত ৬ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন টন। ২০১২-১৩ আর্থিক বছরের এ বছরের আমন ধানও বাম্পার ফলন হচ্ছে। বোরো ফসল হয়ে থাকে ঝড় ঝঞ্ঝাহীন মৌসুমে, কৃষির ভাল ব্যবস্থাপনা বিগত চার বছরের মতই অব্যাহত থাকবে এ আশা করা যায়। বোরোও বাম্পার উত্পাদন হবে, কেননা বিদ্যুত্ সরবরাহের চমত্কার উন্নতি হয়েছে। মোট চাল উত্পাদন অবশ্যই ৩৪ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে ৭ মিলিয়ন টন বা সত্তর লক্ষ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। আমাদের আপত্কালীন চাল মজুত ১৩ লক্ষ টনের কাছাকাছি ছিল গত অর্থবছরে। এটা যদি আমরা ২০ লক্ষ টনে (২ মিলিয়ন টন) রাখার প্রস্তুতি নেই এবং তারপরেও দৈব-দুর্যোগ ও আগামী বর্ষায় বন্যা কিংবা বর্ষণ মৌসুম শুরুতে ফ্লাশফ্লাড ইত্যাদি ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের অভ্যন্তরে বাড়তি মজুত হিসেবে কৃষক পর্যায়ে ২ মিলিয়ন টন রেখে দেই, তারপরেও অনায়াসে প্রথম উদ্যোগ হিসেবে ভাল মানের চাল (মধ্যম মানের চাল রপ্তানি করা ঠিক হবে না), আড়াই থেকে ৩ মিলিয়ন টন মানে ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ টন রপ্তানির জন্য অনুমতি দেয়া যেতে পারে অনায়াসে। চাল শুধু প্রধান কৃষিপণ্য নয়, এটা বড় রাজনৈতিক পণ্যও। চালের দাম রাজনীতির অন্যতম নিয়ামকও। সে কারণেই পর্যাপ্ত মজুদের পরই রপ্তানির কথা প্রস্তাব করছি। ২ মিলিয়ন টন সরকারি পর্যায়ে মজুতের পুরো ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। নতুন ২ মিলিয়ন টন চাল রাখতে হলে গত বছরের চাল (১ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন চাল) বিক্রি করে দিতে হবে। জৈবপণ্য হিসেবে ১ বছরের বেশি চাল মজুত রাখলে তা, ব্যবহার উপযোগী থাকবে না। সে কারণে এই মজুত ব্যবস্থাপনাও বেশ ব্যয়বহুল। চাহিদার চেয়ে বেশি সরবরাহ বাজারে থাকলে দাম অবশ্যই পড়ে যাবে। এবং যা পড়ে গিয়েছে। পশ্চিম বাংলায় চাল কালোবাজারি হয়ে যাবে না কেননা ঐ রাজ্য চালে উদ্বৃত্ত। কাজেই দাম কৃষক পর্যায়ে উত্পাদন খরচের চেয়ে কিছুটা বেশি করতে হলে, উত্পাদকদের বাঁচাতে হলে রপ্তানি ছাড়া বিকল্প নেই। আর বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে এর রাজনৈতিক মূল্যও কিন্তু কম নয়। চাল রপ্তানির অনুমতি না দিলে এর যে বিকল্প দৃশ্য হচ্ছে তা হল, পরপর দুই বছর কিংবা তারও বেশি চাল রপ্তানির সুযোগ না দিলে চাল উত্পাদন লোকসানি পণ্য হিসেবে শুধু পরিবারের ভরণ পোষণের প্রয়োজনীয় অংশ রেখে বাকি জমিতে বিকল্প ফসল কিংবা কিছু অংশ বনায়নে রূপান্তরিত হতে পারে (তুলনামূলক উঁচু জমিগুলোতে)। এতে হয়তো ফসল বৈচিত্র্যায়নে কিছুটা ঝোঁক বাড়বে, তবে আমরা আবার খাদ্য ঘাটতি দেশে পরিণত হব। এতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হবে, বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে চাল যোগানের অনিশ্চয়তাও থেকেই যাবে (২০০৮-০৯ সালে টাকা দিয়েও চাল পাওয়া যায়নি)। চাল রপ্তানির সুযোগ দেয়া হলেও চালের উত্পাদন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেই হবে। এর কারণ হল বাংলাদেশের জনসংখ্যার সংগে প্রতিবছর বাড়তি লোকসংখ্যা যোগ হচ্ছে প্রায় ১৮ লক্ষ এবং এর জন্য প্রতিবছর ২ লক্ষ ৭৪ হাজার টন অতিরিক্ত চালের চাহিদা বাজারে আসছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি বন্ধ না হলে এ চাহিদা ক্রমবৃদ্ধি ঘটতেই থাকবে। আসলে কৃষি নিয়ে আমাদের পরিতৃপ্তি বোধ করার কারণ নেই। একর প্রতি চাল উত্পাদনে এখনো আমরা থাইল্যান্ড, চীন, ভিয়েতনামের অনেক পিছনে রয়েছি। সবরকম কৃষি পণ্যের প্রতি একর উত্পাদনে আমরা আমাদের তুলনীয় দেশগুলো থেকে পিছিয়ে আছি। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে এই উত্পাদন পার্থক্য আমাদের অন্ততঃ ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এই মূলধারার কৃষিতে আমাদের আরো অনেক বেশি উত্কর্ষ অর্জনের সুযোগ রয়েছে। আমাদের প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে যাতে উত্পাদন ব্যয় কমে আসে। ব্যবস্থাপনায় উন্নতি ঘটাতে হবে। এনিয়ে প্রায়োগিক গবেষণার উপর আরো জোর দিতে হবে, কৃষি শিক্ষার ক্ষেত্রে আরো অনেক বেশি মানোন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। জৈব প্রযুক্তি, টিস্যু কালচার, দুর্যোগ সহায়ক জাত উদ্ভাবনে আমাদের গবেষণা প্রচেষ্টা ও ব্যয় বাড়াতে হবে। পানি ব্যবহারে (সেচের জন্য) আমাদের আরো দক্ষতা বাড়াতে হবে। এখন উত্তোলিত পানির মাত্র ২৭ শতাংশ কাজে লাগে, বাকিটা সবই অপচয়। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার দ্রুত কমাতে হবে, সেজন্য বর্ষা মৌসুম শেষে নদী ও গ্রাম বাংলার খালসমূহে রাবার ড্যাম প্রযুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমের জন্য পানি সংরক্ষণের মহাপরিকল্পনা নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও সংরক্ষণ ড্রেজিং এর কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। মূলধারার কৃষির সফলতা অর্জনে বিজ্ঞানী, সমপ্রসারণকর্মী, গবেষণার ক্ষেত্রে সকলের সম্মিলিত জোরদার প্রয়াস প্রয়োজন। ‘শহুরে কৃষি’, ‘গৃহস্থালী কৃষি’ (বহুকাল ধরেই সুপ্রতিষ্ঠিত), জলাধারে চাষবাস (হাইড্রোপনিক্স, যা কোন কোন অঞ্চলে বহুকাল থেকেই চলে আসছে), ‘দোতলা কৃষি’, জৈব জ্বালানি ইত্যাকার প্রান্তিক বিষয়গুলো নিয়ে BRAC এর মত কোন কোন এনজিও কিংবা বিশেষজ্ঞ নামধারী ইদানীং মাতামাতির চেষ্টা করছে, যেখানে মূলধারার কৃষিতেই আমাদের আরো অনেকদূর যেতে হবে, এই প্রান্তিক বিষয়গুলোতে অতিরিক্ত সম্পদ ব্যয়ের আমাদের এখনো সময় আসেনি। আর ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে শহুরে কৃষির কথা বলাতো বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ জানানোর সামিল। যেখানে জনজীবনের পানি সরবরাহে ঢাকা শহরে ৬০০ গভীর নলকূপ অহর্নিশি পানি তুলছে, এতে প্রতিবছর ২-৩ মিটার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। বরং বৃষ্টির পানি নির্ভর হয়ে শহরকে বড় বড় কাঠ, ফল, ছায়াদাত্রী গাছ লাগিয়ে সবুজায়নের কর্মসূচি জোরদার করা যায়। ব্যয়বহুল ছাদের কৃষি হতে পারে শুধু বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে—তবে সেটাও মনিটরিং করা হবে ব্যয় বহুল। ঘটা করে ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানোর মত ‘শহুরে কৃষির’ বাগাড়ম্বর করা হবে আরেক আত্মঘাতী বিলাস। লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতি সমিতি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন