ঔদার্য, ক্ষমা, বিশ্বনেতৃত্ব ও আমরা

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩৫
আমাদের মত আবেগপ্রবণ জাতি পৃথিবীতে খুব বেশি একটা নেই। আবেগ একদিকে দরকারি, মানুষকে শানিত করে প্রাণিত করে ও উদ্দীপ্ত করে। আবেগ ছিল বলেই মুক্তিযুদ্ধের মত অসম যুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছিলাম। বায়ান্ন থেকে একাত্তর অবদি আবেগ আমাদের শুধুই এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। কিন্তু অপরিমিত আবেগ এবং যখন তা অতীতাশ্রয়ী তখন তাকে বাগে আনতে হয়, নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। তখন যদি সে নিয়ন্ত্রণে না থাকে ব্যক্তিমানুষ বা জাতি কারোই মঙ্গল হয় না। আমাদের দেশটিতে নিয়ন্ত্রিত আবেগ ও যুক্তির চর্চা হচ্ছে না বলেই রাজনীতি এমন সাংঘাতিক আকার ধারণ করেছে। অথচ কত ছোট দেশে ছোট ভূখন্ডে ঝঞ্ঝা, লড়াই, মারামারি, হানাহানির সমাজে শান্তি ফিরে এসেছে। শান্তি ফিরিয়ে আনার পূর্বশর্ত যে সহিষ্ণুতা ও ক্ষমা আমেরিকা আর ভিয়েতনামই তার বড় উদাহরণ। দক্ষিণ ভিয়েতনামকে ঘাঁটি বানিয়ে উত্তরকে তথা ভিয়েতনামকে ধংস করার জন্য মরিয়া মার্কিনীরা আগাম বোমা ফেলতেও কসুর করেনি। সমুখ যুদ্ধে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহারের পরও পরাজিত হয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছিল তারা। সমাজতন্ত্র ও বাম আদর্শের পৃথিবীখ্যাত মানুষ হো চি মিনের দেশটি এখন আমেরিকান আর ইউরোপিয়ান পর্যটকদের তীর্থ ভূমি, শুধু তাই নয়, বাজার উন্নয়ন বিনিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে মার্কিন দেশের সমর্থন ও লগ্নিপুষ্ট হয়ে উভয়ে অতীতের গ্লানি দূর করছে। একদা শত্রু বা বিরোধী হলেই যে চিরকাল বৈরিতা থাকে না সে দৃষ্টান্ত কম্বোডিয়ায়ও দেখে এসেছি। ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে বিপ্লব-প্রতিবিপ্লবের নামে সে দেশেও হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। একে অপরকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা কম্বোডিয়ায় আজ যত কষ্ট বা অপমান থাকুক না কেন আত্মবিরোধ নেই। বিরোধ নেই ভারতের বা পাকিস্তানের রাজনীতিতেও। সবাই সেখানে কংগ্রেস, বিজেপি, মুসলিম লীগ করে না। ঐ দেশ দুটির জন্মপ্রক্রিয়া নিয়ে দলে বা পার্টিতে পার্টিতে দুস্তর মতবিরোধ থাকলেও অতীত নিয়ে হানাহানিতে মত্ত নয় তারা। তা হলে আমরা কেন এই অভিশাপ এড়াতে পারছি না? হপ্তাতিনেকের স্বদেশ ভ্রমণে দু হপ্তার অধিক ছিলাম চাঁটগায়। আড়াই দিন ঢাকায়। এর মাঝে কমপক্ষে তিন থেকে চার বার রাস্তায় সংঘাত আর উন্মাদনা দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে। বিজয়ের মাস নামে পরিচিত ডিসেম্বরে দাঁড়িয়ে আমরা কি অতীত জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হব না? কেন এই অশান্তি বা উত্পাত? জানতে চাইব না কোথায় এর প্রতিকার? প্রবাসী বাংলাদেশি হিসেবে দেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলাটা যৌক্তিক মনে করি না। আমি সে দিকে যাবোও না। শুধু বলি এগুতে হলে বিশ্বায়নের মুক্ত বাতায়নে খোলা চোখ রাখতে হলে উটকো ঝামেলা দূর করার বিকল্প নেই। এই সেদিন পূর্ব তিমুরের নোবেল জয়ী নেতা হোজে রামোস হোর্টার একটি সাক্ষাত্কার দেখছিলাম। যৌবন থেকে আজ অবদি সংগ্রাম আর যুদ্ধের পরও শান্তিপ্রিয় একটি মানুষ। পূর্ব তিমুরকে যখন কেউ চিনতো না, ইন্দোনেশিয়া তার অধীনে রাখার জন্য সৈন্য লেলিয়ে দিয়েছিল, কুখ্যাত কিসিঙ্গার আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের নীরব অনুমোদনে পূর্ব তিমুরে গণহত্যা চালানো হল, হোজে রামোস গোপনে নিউইয়র্ক চলে গিয়েছিলেন, বছরের পর বছর চেষ্টা করে বিল ক্লিনটনের সময় কিঞ্চিত্ আশার আলো আনতে পেরেছিলেন এই ভদ্রলোক, অত:পর পর্যায়ক্রমে পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতা লাভ। নোবেল জয়ী হোজে রামোস সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। অত:পর গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং ভোটে হেরে বিদায় নিয়েছেন। তারপরও তার কোন খেদ নেই। সাক্ষাত্কারটিতে তিনি বলছিলেন, তার পরাজয়ের পর ক্ষমতায় আসীনরা অনেক মেধাবী ও দেশপ্রেমিক। তার মতে দেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ক্ষমতায় থাকাটা জরুরি নয়। সত্যি কথা বলতে কি তার সুস্থির ভাষণ ও ক্ষমা করার যোগ্যতায় অভিভূত হবার বিকল্প নেই। তার সুচিন্তিত অভিমত নেতৃত্বের গুণাবলীই হচ্ছে, ক্ষমা, ঔদার্য, জনসম্পৃক্ততা আর অতীত নিয়ে মত্ত না থাকা। হোজে রামোসের দেশটিও আমাদের মত রক্ত আর মৃত্যুর ওপর দাঁড়ানো। তারপরও তিনি বলছেন, ক্ষমা মানে ভুলে যাওয়া নয়। ক্ষমা মানে নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজে নেয়া। অসাধারণ একটি উক্তি আছে তার, মাফ করে দিলে অতীত মুছে যায় না। তবে পাপ ক্ষয় হয়। আমাদের রাজনীতি না জানে ক্ষমা করতে না জানে উচিত শাস্তি দিতে। শুধু রাজনীতিবিদদের কথা বলব কেন, আমাদের নোবেলজয়ীও এমন স্নিগ্ধ, শান্ত, যৌক্তিক কণ্ঠে কথা বলেন না। অসাধারণ মেধাবী এই ভদ্রলোক এমন একটি দেশের প্রতিনিধি যার গণতন্ত্র চর্চার কোন ইতিহাস নেই। নেই আমাদের মত সংস্কৃতি, সৌন্দর্য বা মেধার ভান্ডার। তারপরও তিনি তা বলতে বা করে দেখাতে পারছেন। দেশে আজ যত সংঘাত, অপমান, হানাহানি আর রক্তপাত তার দুটো স্থূল কারণ, একটি অতীতমুখি প্রবণতা। অন্যটি মেধাহীন রাজনীতি চর্চা। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধকেও আবেগের বাইরে এনে কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ করা যাচ্ছে না। সবচে বড় কথা চল্লিশ বছর আগের পাপ নতুন প্রজন্ম কিভাবে ধুয়েমুছে সাফ হতে চায় সেটাও বিবেচনায় নেই আমাদের। অথচ আমরা সবাই গতায়ু, ভবিষ্যত্ ওদের জন্য, ওদের হাতে তুলে দেয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে। কোনদিনও কি সম্বিত ফিরবে না আমাদের? সিডনি থেকে [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন