সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে সোমবার শুরু হইয়াছে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) সম্মেলন। জাতিসংঘের অধীন এই সংস্থার সম্মেলনে বাংলাদেশসহ মোট ১৯৩টি দেশের সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অংশ নিতেছে। অনেকের আশঙ্কা, এই সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বের ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারে। ইহা মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে হুমকিতে ফেলিয়াছে। তবে আইটিইউ সবাইকে আশ্বস্ত করিয়াছে, তাহারা সেইরকম কিছু করিতে যাইতেছে না। সংস্থাটির বক্তব্য, ইন্টারনেটের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ও ইন্টারনেটে আরও বেশিসংখ্যক মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করিতে পদক্ষেপ লইবার প্রয়োজন রহিয়াছে। ইহার অর্থ ইন্টারনেটকে পৃথিবীব্যাপী আরও ছড়াইয়া দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ লওয়া হইবে সম্মেলনে। সম্মেলনের প্রথম দিনে জাতিসংঘের আর্টিকেল ১৯-কে সমুন্নত রাখিবার এবং ইহার মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করিবার ব্যাপারে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। প্রথম দিনে, ‘আরব বসন্ত’ শুরু হইবার দেশ তিউনিশিয়া সবার জন্য তথ্য নিশ্চিত করার প্রস্তাব লইয়া হাজির হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিদ্যমান ব্যবস্থার বদলে চাহিতেছে টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলি আন্তঃবাণিজ্যিক একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। ইহার ফলে প্রেরণকারীকে ব্যয় বহন করিতে হইবে। ইহার ধরনটা হইবে আন্তর্জাতিক ফোন কলের চার্জের মতো। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডাররা যেইসব দেশে বা লোকেশনে লাভজনক মনে হইবে না সেইসব জায়গায় ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ বা সীমিত রাখিবে। ইহাতে যাহারা দরিদ্র তাহাদের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছাইবার গতি আপনাআপনি শ্লথ হইয়া যাইবে এবং এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার উদ্যোক্তাদের আরও অনেক বেশি কষ্ট হইবে তাহাদের বিদেশি ক্রেতাদের নিকট পৌঁছাইতে। চীন এবং রাশিয়া ইন্টারনেট পুনঃনিয়ন্ত্রণ করিবার বিষয়ে খুবই উত্সাহী। এতদিন ইন্টারনেট শাসন হইয়া আসিয়াছে বহুপাক্ষিক পদ্ধতিতে। এখন এইগুলিকে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে লইয়া আসিলে কয়েকটি বিষয় ঘটিতে পারে: সাইবারনিরাপত্তা দেখভাল এবং ওয়েবের উপাত্ত আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে চলিয়া যাইবে; সকল বিদেশি ফোন কোম্পানিগুলি ‘আন্তর্জাতিক’ ইন্টারনেটের জন্য চার্জ করিবে, যাহা এখন পর্যন্ত ফ্রি রহিয়াছে; অদৃষ্টপূর্ব বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ হইবে — নানারকম শর্ত, ট্যারিফ বাড়িতেই থাকিবে। আন্তঃসরকার নিয়ন্ত্রণের মাত্রা বৃদ্ধির মধ্য দিয়া ইন্টারনেট প্রকৌশলের যেইসকল প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেটকে সচল রাখিয়াছে, তাহাদের উপর নিয়ন্ত্রণের মাত্রা বাড়িতেই থাকিবে।
আরব বসন্ত এবং সমরূপ নানান ঘটনার পর সাইবারপরিসরকে ঘিরিয়া সরকারগুলির উদ্বেগ ক্রমশই বাড়িতেছে। সরকারগুলির দিক হইতে ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণ করিবার একটা তাগিদ রহিয়াছে। অন্যদিকে সাইবারপরিসর বাণিজ্যের উত্তম একটি স্থানও বটে। বাণিজ্যে বরাবর বৃহত্ সংস্থার দাপট থাকে, একীভবন (মার্জার) ও অধিগ্রহণের (একুইজিশন) মাধ্যমে অধিক বৃহত্ কোম্পানিপুঞ্জের সৃষ্টি হইতেছে। কিন্তু সাইবারপরিসর এমন এক জায়গা যেইখানে ক্ষুদ্রেরও অধিকার রহিয়াছে। তাই সরকার এবং ব্যবসায় উভয় পক্ষই ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণ করিতে সচেষ্ট। জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা আইটিইউ যতই ইন্টারনেটের সর্বজনীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলুক, সরকার ও ব্যবসায়পক্ষের তত্পরতা থামিয়া নাই। সম্মেলন হইতে গণতান্ত্রিক ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণ করিবার নানান উদ্যোগ লওয়া হইতে পারে। মুক্তিকামী মানুষ ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সজাগ দৃষ্টি রহিয়াছে সম্মেলনে কী কী সিদ্ধান্ত লওয়া হয়, সেইদিকে।
