[ রা জ নী তি ]

পেশাজীবীদের দলীয় রাজনীতির যত কথা

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪৫
গেলো ১৭ নভেম্বর ২০১২ একটি জাতীয় পত্রিকায় ‘তিন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন’ শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠায় যে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে তার উপশিরোনামগুলো ছিল এরকম: ‘ভয়ভীতি হুমকিতে এফবিসিসিআইর প্রার্থী ও ভোটাররা’, ‘আইইবিতে গতবারের বিএনপি প্রার্থী এবার আওয়ামী লীগের!’, ‘বিএমএ নির্বাচন নিয়ে কোন্দলে নাজুক স্বাচিপ, নীরব প্রচারণায় ড্যাব’। (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৭ নভেম্বর ২০১২) সংবাদ তিনটি পড়লেই একজন পাঠকের কাছে এটা স্পষ্ট হবে যে, বাংলাদেশে ডাক্তার, প্রকৌশলী আর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পেশাজীবীদের অধিকার রক্ষার নামে দলীয় রাজনীতির কোন পংকিলতায় নিজেদের নিয়োজিত করেছেন। ভোটে জেতার জন্য টাকাপয়সা লেনদেন, প্রার্থীকে ঘুষ দিয়ে বসিয়ে দেয়া, হুমকি-ধামকি প্রদানসহ হেন কাজ নেই তারা করছেন না! ২৫ নভেম্বর সমকালের খবর: ‘দু’ভাগ হলো সরকার সমর্থক আইনজীবীদের সংগঠন: একপক্ষে সাজেদা, অন্যপক্ষে সাহারা’—এর মানে আরো ভয়াবহ, এমনিতেই পেশাজীবীরা দলীয় রাজনীতিতে বিভক্ত, তার ওপরে এই বিভাজন কেবল পক্ষ-প্রতিপক্ষে সীমাবদ্ধ নয়, নিজ পক্ষ/দলের ভেতরে আবার উপদলীয় কোন্দলে তারা বিভাজিত হয়ে পড়ছেন। মানতে দ্বিধা নেই, পেশাজীবীদের স্বার্থ-অধিকার রক্ষায় সংগঠন থাকতেই পারে, এতে কোনো দোষ নেই, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দুঃখজনক বাস্তবতা এই যে, পেশাজীবীরা মোটা দাগে সরকারি দল আর বিরোধী দলে ভাগ হয়ে পড়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্যানেলের একটি হয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত, অন্যটি হয় বিএনপি সমর্থিত; এতে কোনো রাখঢাকের বালাই থাকে না। পিয়ন থেকে সচিব বলতে গেলে সবাই এই দুই শিবিরে ভাগ হয়ে পড়েছেন। আরো ভয়ংকর যে, মহামান্য আদালতের মান্যবর বিচারকদের ক্ষেত্রেও এই রকম সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতিতে ঢুকে পড়ার অভিযোগ উচ্চারিত হচ্ছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, বাসমালিক, আইনজীবী, ট্রাকচালক, ব্যাংক, বীমা, সচিবালয়, ওলামা-মাশায়েখ, ভ্যানচালক সমিতি সবাই দলীয় রাজনীতির ভিত্তিতে তাদের তথাকথিত নেতা নির্বাচিত করছেন। কোনোটা হচ্ছে একেবারে নগ্নভাবে, প্রকাশ্যে দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে, কোনোটায় আবার কিছুটা আড়াল রাখা হচ্ছে। তবে মুখোশ চিরেমুখ চিনে নিতে বোধকরি কারোরই অসুবিধে হয় না। আর এই নেতারাই সংশ্লিষ্ট বিভাগের নিয়োগ বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, পদোন্নতি, টেন্ডারসহ তাবত্ বিষয় নিয়ন্ত্রণ করছেন। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দাপট থাকে বেশি, কারণ সুযোগ আর সম্পদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে প্রবল আর বিরোধী পক্ষ অপেক্ষায় থাকে কবে তারা ক্ষমতায় যাবে। পদ বা টাকাপয়সা ভাগাভাগির ক্ষেত্রে অনেকসময় দু’পক্ষের নেতাদের গোপন আঁঁতাতের খবরও আমরা পাই। পুলিশদের ক্ষেত্রে কেবল দলীয় রাজনীতিই একমাত্র বিষয় নয়, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিশেষ এলাকাকেন্দ্রিক প্রভাববলয়; একজন মানবাধিকার নেত্রী বিষয়টিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন: ‘আওয়ামী লীগের সময় গোপালগঞ্জের পুলিশ আর বিএনপির সময় বগুড়ার পুলিশ দেশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে’। এসব কারণে পেশাজীবীদের সংগঠনগুলোর কাছে তাদের পেশার মান-মর্যাদা-স্বার্থের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতামুখীন দলের রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি। এর ফলে একজন ডাক্তার কিংবা একজন আমলা কতো ভালো ডাক্তার বা কতো ভালো আমলা তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ সে কতো তীব্র আওয়ামী লীগ কিংবা কতো তীক্ষ বিএনপি! কারণ এই দলীয় আনুগত্যই শেষ বিচারে ঠিক করবে তার পদ, অবস্থান, বিদেশে পড়ার বৃত্তি, অর্থ-বিত্ত, প্রভাব, সস্ত্রীক বা সস্বামী পরদেশ সফরের কাঙ্ক্ষিত সুযোগ; জীবনের রোশনাই আর ভাগ্যের খোলতাই নির্ভর করছে দলীয় রাজনীতির জটিল সমিকরণে তার খেলবার শক্তির ওপর; চাল আর কূটচালে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে দলীয় নেতাদের কতোটা নৈকট্যে কারা পৌঁছাতে পারলেন তার ওপরে নির্ভর করছে শান-শওকত, ক্যারিয়ার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দুটো প্যানেল—একটি আওয়ামীপন্থি নীল দল, অন্যটি বিএনপি-জামায়াত-পন্থি সাদা দল। এদের ভেতরে আবার আনুগত্যের বিচারে পরিমাণগত ও গুণগত পার্থক্য আছে; যেমন কেউ গাঢ় নীল, কেউ আকাশী নীল আবার কেউবা হালকা নীল; অন্যদিকে আছে সাদা সাদা আরো সাদা। কেউ কেউ এমন সাদা যে, বাড়তি নীলের দরকারই নেই! তাদের মতাদর্শগত রঙের ঘনত্ব বা গাঢ়ত্বই হয়ে উঠে ক্যারিয়ারের নীল লিটমাসকে লাল করার অন্যতম ক্যাটালিস্ট। তাকে যে সত্যিকার অর্থেই কোনো রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস করতে হবে বিষয়টি এমন নয়, তবে ভান করতে হবে যে, তিনি ওই আদর্শের জন্য গাজী/শহীদ হতেও সদা প্রস্তুত। ভান বলছি এ কারণে যে, স্বার্থ/ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার মহত্ উদ্দেশ্যে যে কেউ যেকোনো সময় নিজ দলের আদর্শ ত্যাগ করে অন্য দলে নাম লেখাতে পারেন। দেশ যেহেতু স্বাধীন তাই ‘আদর্শ’(?) পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও তারা একশো ভাগ স্বাধীন। বাংলাদেশে এর নমুনা ভূরিভূরি। সকালে আওয়ামী লীগ, দুপুরে জাতীয় পার্টি, বিকেলে বিএনপি। এই তো আমাদের আদর্শের নমুনা। তবে হ্যাঁ, এ কাজে পেশাজীবীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ওই ‘ভান’টাকে অন্যদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে হবে। অর্থাত্ ভানটাকে ক্রেডিবল করার ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘প্রফেশনালিজম’ তাদের মধ্যে ‘গ্রো’ করাতে হবে! এভাবে রাষ্ট্রে দলীয় রাজনীতি চর্চার যে নেতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেখানে মেধা-যোগ্যতা প্রতিনিয়ত মার খাচ্ছে; দক্ষতা, সততা আর কর্মনিষ্ঠতার যথার্থ মূল্যায়ন হচ্ছে না। কে কতোটা নগ্নভাবে দলীয় স্বার্থে গলাবাজি করতে পারে জীবনে তাই হয়ে ওঠে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। আর রাজনীতিবিদরা, যারা মূলত দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পান, তারা পেশাজীবীদের এই দলীয় রাজনীতিকে গেলো কয়েক দশক ধরে কেবল উত্সাহিতই করেননি বরং ক্রমে ক্রমে তা উস্কে দিয়ে আজকের এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন; তাদের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ের ফল আজকের বাংলাদেশে গজিয়ে ওঠা দলীয় লেজুড়বৃত্তির হাজারো পেশাজীবী সংগঠন। রাষ্ট্র ও সমাজে এর অভিঘাত যে খুবই মারাত্মক তার নমুনা এখন আমরা ঠিকই টের পাচ্ছি; এর ফলে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে সুস্থ-সুন্দর প্রতিযোগিতার বোধ ক্রমশ তিরোহিত হয়ে যাচ্ছে। দলকানা রাজনীতিই হয়ে যাচ্ছে সব কিছুর মূল চালিকা শক্তি। অন্ধ দলীয় আনুগত্যের কাছে প্রতিদিন মার খাচ্ছে যোগ্যতা-দক্ষতা-মেধা-সততা-ন্যায়নিষ্ঠা। কী আওয়ামী লীগ, কী বিএনপি বছরের পর বছর ধরে দেশে চলছে দলীয়করণের মহোত্সব। দিনে দিনে মেধা-দক্ষতা-যোগ্যতা পিছিয়ে পড়তে পড়তে এখন আর অবশিষ্ট বিশেষ কিছুই নেই। পেশাজীবীদের রাজনৈতিক মতাদর্শ এমন বিশালাকার ধারণ করেছে যে, এখন চাইলেও একে আর সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। এই দলীয়করণ এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ গ্রহণ করে ফেলেছে। পেশাদারিত্বের অবহেলার ফল সরকার ভোগ না করলেও জনগণ পদে পদে তা অনুভব করছে। ব্যাংকিং খাতের বৃহত্তম জালিয়াতি সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি, কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ উত্পাদন, শেয়ারবাজার, পদ্মা সেতু কেলেংকারি সবই রাজনৈতিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফল। পেশাদারি মনোভাবের অবহেলার কারণে সৃষ্ট সংকট শুধু বিপর্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে অচলাবস্থারও সৃষ্টি হয়েছে। অন্ধ-উগ্র-দলীয় রাজনৈতিক মতাদর্শের লোক দিয়ে দিনবদল সম্ভব নয়; কারণ তারা ব্যক্তিগত দিনবদলে নিবেদিত। ফলে জাতির দিনবদল পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। পেশাজীবীদের পেশাদারিত্বের মূল্যায়ন না করে দেশে উন্নয়ন ও উত্পাদনকে চরম অবহেলা করা হয়েছে, এর কুফল জাতিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভোগ করতে হবে। আমাদের বৃহত্ দুই রাজনৈতিক দল দুই মেরুতে অবস্থান করে। একান্ত কিছু ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের লক্ষ্য ছাড়া সর্বক্ষেত্রেই তাদের মধ্যে বিকর্ষণ লক্ষণীয়। মূল রাজনৈতিক দলের যখন এমন অবস্থা তখন তাদের পক্ষের লোকদের কাছ থেকে ভিন্নতা কীভাবে আশা করা যায়; আত্মসমালোচনার কোনো জায়গা সরকারি দল, বিরোধী দল কিংবা পেশাজীবী সংগঠন কোথাও নেই। নিজ দলের সবই ভালো আর প্রতিপক্ষের সব খারাপ—এরকম দ্বিকোটিক বিভাজনে রাষ্ট্রে আদর্শিক চিন্তাসমূহ ক্রমশ ক্ষয়ে ভেঙে বিচূর্ণীভূত হয়ে যাচ্ছে। আমরা দেখছি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত স্বার্থান্ধ পেশাজীবীরা দলের অন্ধ গুণগানে এতোটাই পারঙ্গম যে, অনেক সময় তা নিজ দলের রাজনীতিবিদদের তোষণ দক্ষতাকেও ছাড়িয়ে যায়, বাংলা প্রবাদে যাকে বলে ‘সূর্যের চাইতে বালুর তাপ বেশি’। মুখে যতই দল নিরপেক্ষ থেকে পেশার উন্নয়নের কথা বলা হোক না কেন, পেশাজীবীরা যে তাদের পেশার চেয়ে দলীয় রাজনীতির কথা বলতে বেশি আরাম বোধ করেন এহো বাহ্য। কিছুদিন আগে এক পেশাজীবী সংগঠনের জাতীয় সম্মেলনে সরকারপ্রধানকে মঞ্চে বসিয়ে তাদের সভাপতি বলে চলেছেন তাদের সংগঠন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচালিত। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নিবিড় আন্তরিক সম্পর্কে সম্পর্কিত ও স্নেহধন্য। বলা যায় ‘দি রোমান মোর দ্যান দি রোমান’। তিনি সংগঠনের সব সদস্যকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে দিনবদলের সৈনিক হিসেবে নিবেদন করেন। অনুরূপভাবে অন্য একটি অংশ প্রেসিডেন্ট জিয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে ওই পেশাজীবী সংগঠনের সব সদস্যকে বিরোধী দলের নেত্রীর কাছে নিবেদন করে দেন। দেশে পেশাজীবীদের এমনই বিচিত্র নিবেদন-নৈবেদ্য চলছে। আমাদের নেতানেত্রীরা এমন নিবেদনে আপ্লুত হন বলেই প্রতীতি হয়। কারণ এই পেশাজীবী নেতাদেরকেই দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সমাদর করে। ফলে পেশাজীবীদের রাজনৈতিক বিভক্তি দিনে দিনে চরম আকার ধারণ করে চলেছে। বিভিন্ন পেশার মানুষকে কতিপয় লোকের স্বার্থরক্ষায় বলি দেয়ার আয়োজন চলছে এবং আশঙ্কা ভবিষ্যতেও তা চলতে থাকবে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষাকতায় পেশাজীবী ‘টাউট’দের উত্তরোত্তর বিকাশ রোধ করা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার আন্দোলনে প্রশাসনের একাংশ জনতার মঞ্চে যোগ দিয়ে পুরস্কৃত হয়েছেন। সেই পুরস্কারের ফলে প্রশাসন যে কেবল তার গতি হারিয়েছে তা শুধু নয়, বরং সব সরকারের সময় দেখছি রাজনৈতিক কারণে কয়েক শ কর্মকর্তাকে ওএসডি বানানো হয়। প্রশাসন তার চেইন অব কমান্ড হারিয়ে অবিশ্বাসের বলয়ের মধ্যে বাস করছে। আইন ভাঙার জন্য শাস্তির বদলে পুরস্কার পাওয়ার ফল জাতি মর্মে মর্মে অনুভব করছে। বাঙালি জাতি এরও আগে অন্যায়কারীকে পুরস্কৃত করা প্রত্যক্ষ করেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারীদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল। ৩৭ বছরে জাতি পাপমুক্ত হতে পারেনি। যুদ্ধাপরাধ আর মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার এতো বছরেও সম্পন্ন হয়নি; এখনও পুরো জাতি প্রতিনিয়ত পাপমুক্তির জন্য চিত্কার করে চলেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে অন্যায় সব সময় অন্যায়। কোনো বিবেচনায় তা একবার প্রশ্রয় পেলে এটি ডালপালা বিস্তার করবে। তাকে নিয়ন্ত্রণ করা তখন কঠিন হয়ে পড়বে। দেশে ছোট ছোট অন্যায়কে পুরস্কৃত করতে করতে মহীরুহ সৃষ্টি করা হয়েছে। ছোট অন্যায়ের প্রতিকার করা গেলে বড় অন্যায়ের সুযোগ কমে যায়। এই যে এখন সারাদেশে সব পেশাজীবীদের রাজনৈতিক বিভাজন চলছে, কামার-কুমার-তাঁতী থেকে শুরু করে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-কৃষিবিদ-আইনজীবী কেউ বাদ থাকছে না, ওলামা-মাশায়েখ-শ্রমিক-সাংবাদিক সবাই রাজনৈতিক মতাদর্শে ভাগ হয়ে সংগঠন পরিচালনা করছেন আর ক্ষমতার রাজনীতিতে আপেক্ষিক সুবিধা লাভের আশায় রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ত এসবের পৃষ্ঠপোষকতা করে চলেছে কিন্তু এর পরিণাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? রাজনৈতিক দলগুলোর এটি ভুলে গেলে ভুল হবে যে, দেশের শিক্ষক-সাংবাদিক-ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-শ্রমিক-কর্মচারীদের রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত করে নিজেকে বশংবদ হিসেবে ধরে রাখলেও চূড়ান্ত বিবেচনায় দেশ ও জাতির জন্য তা সমূহ বিপদের। পেশাদারিত্ব মূল্যায়ন না হওয়ায় যমুনা সেতুতে ফাটল দেখা দিয়েছে, চট্টগ্রামে গার্ডার ভেঙে পড়ছে, পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির প্রমাণ মিলছে, শিক্ষার মান ধারাবাহিকভাবে পড়ে যাচ্ছে, পোশাক কারখানার শ্রমিকরা অগ্নিকাণ্ডের জ্বালানি হচ্ছেন, বিমান থেকে পাটকল সর্বত্র কেবল লোকসান বাড়ছে। দক্ষতা, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা। এই হচ্ছে সুশাসনের মৌল উপাদান- কিন্তু এর মূল্যায়ন না হওয়ায় প্রশাসন প্রতিনিয়ত তার গতি হারাচ্ছে। স্ব-স্ব পেশার স্বার্থে পেশাজীবীদের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্তির বিপক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ তাই জরুরি। আমরা মনে করি বিভিন্ন পেশায় এখনও বড় অংশ আছেন যারা এই সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতি থেকে নিজেদের বিপদমুক্ত দূরত্বে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন, রাষ্ট্রীয় কল্যাণের বিবেচনায় যারা এই ক্ষতিকর সংস্কৃতির চর্চাকে অন্তর থেকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছেন, তাদেরকে নীরবতা ভেঙে এগিয়ে আসতে হবে, জোটবদ্ধ হতে হবে এবং অবস্থার পরিবর্তন যে সম্ভব তাকে প্রমাণ করে দিতে হবে। সবকিছুই নষ্টদের অধিকারে যেতে পারে না—এই আত্মম্ভর আশায় যারা স্বপ্ন দেখেন তাদের সম্মিলিত প্রতিবাদ-প্রতিরোধই পারে ভেতর থেকে এই সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটাতে। আর তাদের এই সংগ্রামে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে তারা সাথে পাবেন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। অসুর আর অসত্যের দাপট সাময়িক, সত্য আর সুন্দরের জয় চিরকালীন। লেখক :শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন