কৃষি অর্থনীতিতে সংকট

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪৫
অনুন্নত দেশের ‘কৃষকরা দক্ষ, কিন্তু দরিদ্র’। কথাটি নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ থিয়ডোর শুলজের। বাংলাদেশের কৃষকরা জ্ঞানী। তারা জমির জো বুঝে চাষাবাদ করতে পারে। আকাশের অবস্থা দেখে বুঝতে পারে আবহাওয়ার গতি-প্রকৃতি। ডাক-খনার বচন বিবেচনা করে কৃষক ভাবতে পারে চলমান ফসল ভাগ্য। তবুও সে দরিদ্র। কৃষি অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অভ্যন্তরীণ সংকটের শুরু এখানেই। শত শত বছর ধরে কৃষকশ্রেণী তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে যেমনি জীবন-জীবিকা পরিচালনা করার জন্য চালায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। তেমনি দেশ-জাতিকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার কাজেও রাখেন পাইভোটাল রোল। বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশের কৃষিতে উল্লেখযোগ্য সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, কৃষি খাতের অভ্যন্তরে কতিপয় বৈপীরত্য দৃশ্যমান। প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর বাংলাদেশে চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিপরীতে গত ৫০ বছরে মোট ধান উত্পাদনের পরিমাণ বেড়েছে ৪ গুণের মতো। ৭০-এর দশকের মাঝামাঝি যেখানে তরল দুধের উত্পাদন ছিল ৫ লক্ষ টনের মতো, তা সম্প্রতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ লক্ষ টনে। ঐ সময় ডিম উত্পাদন হতো ১৩০ কোটি, যা এখন বেড়ে দাড়িয়েছে ৫৭৪ কোটিতে। উল্লেখিত সময়ে ৮ লক্ষ টন মাছ উত্পাদন হতো। এখন যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ লক্ষ টনে। ৫০ বছর আগে দেশের মোট সোয়া ২ কোটি একর আবাদি জমি কমতে কমতে ২০০৮-এ এসে পৌঁছেছে ১ কোটি ৮৮ লক্ষ একরে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, চাষাবাদযোগ্য জমি প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও কৃষক মোট উত্পাদন বৃদ্ধিতে সফলতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু কৃষকের দরিদ্রতা কমেনি। বেড়েছে উত্পাদন খরচ। বেড়েছে কৃষকের ধার-দেনার পরিমাণ। কৃষক তার সন্তানদের দিতে পারছে না প্রয়োজনীয় শিক্ষার সুযোগ। যে কারণে তাদের সন্তানেরা আয়-উপার্জনে পিছিয়ে আছে। অর্থাত্ কৃষক পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে না। সংসার জীবনে পশ্চাত্মুখিতা বা Backwardness linkage যেন কোনভাবেই পিছু ছাড়ছে না কৃষক পরিবারের। বাড়ছে কৃষি উত্পাদনের উপকরণের দাম। ফলে কৃষিপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সেক্ষেত্রে রয়েছে অন্যরকমের মারাত্মক সমস্যা। কৃষিপণ্যের দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস পায়। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা যায় বেড়ে। বিশাল জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনযাপনের অসুবিধা আর্থ-সামাজিক অবস্থায়ই শুধু বিরূপ প্রভাব ফেলে না, বরং তা সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই অস্থির করে তোলে। বিপরীতে কৃষিপণ্যের দাম কমে গেলে কৃষক পায় না ন্যায্যমূল্য। পরিশোধ করতে পারে না ধার-দেনা। চলে না কৃষকের সংসারজীবন স্বাভাবিকভাবে। হারায় সে জীবনের গতি। আরও অধিকতর মাত্রায় তাকে করতে হয় লোন। সরেজমিনে জরিপ করে দেখা গেছে যে, মধ্যম পর্যায়ের কৃষকরা ধার-দেনার কারণে প্রথমে জতি বন্ধক দেয়, তারপর মুখ কবলা (যা সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় বলে ঠিকা)। পর্যায়ক্রমে স্থায়ীভাবে কবলা দিয়ে প্রান্তিক চাষিতে পরিণত হয়। এক পর্যায়ে হয়ে যায় দিনমজুর। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের অভাবে এই মানুষগুলোই কাজের খোঁজে চলে আসে শহরে। কবওয়েব তত্ত্বানুসারে কৃষিপণ্যের দাম যে বছর হ্রাস পায় তার পরের বছর স্বাভাবিক নিয়মেই ঐ পণ্যের উত্পাদন কমে যায়। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চাষি ফসলের নায্যমূল্য না পেয়ে চাষে আগ্রহ হারায় এবং জমি বর্গায় দিতে আগ্রহ দেখায়। অর্থাত্ চাষ খরচের ব্যয় ঝুঁকি দেয় শিফট করে। চাষের ঝুঁকি সে আর বহন করে না। ফলে নিজ জমি চাষ করে এমন কৃষকের সংখ্যা হ্রাস পায়। ধীরে ধীরে বেড়ে যায় বর্গাচাষির সংখ্যা। এক কথায় প্রকৃত চাষি দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে আর বের হতে পারে না। বরং সে ক্রমান্বয়ে আরও পোভারটিচক্রে জড়িয়ে যায়। এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশে বিদ্যমান কৃষি অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সংকট দিন দিন আরও বেড়ে যাবেই কৃষির আধুনিকীকরণের ফলে। কারণ, প্রান্তিক কিংবা বর্গাচাষির পক্ষে তো মূলধন সংগ্রহ করে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য যে, ৮০ দশকের গোড়ার দিকে যেখানে মাত্র ১৪ হাজার গভীর নলকূপ একং ৫ লক্ষ অগভীর নলকূপ ছিল, সেখানে ২০০৯-২০১০ সালে ৩৩ হাজার গভীর নলকূপ ও ১৪ লক্ষ অগভীর নলকূপ ব্যবহূত হয়েছে। এক্ষেত্রে বিতর্কহীনভাবে একথা বলা যায় যে, কৃষিতে অধিক ফলনের বিষয়টি বহুলাংশে মূলধন নিবিড় উত্পাদন কৌশলের মালিকানায় চলে যাচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি অর্থনীতিতে উল্লেখিত পরিবর্তনের জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাড়ছে আয় বৈষম্যের আর এক নতুন মাত্রা। তাই, বাস্তবতার নিরিখেই কৃষি অর্থনীতির চলমান সংকট নিরসনে ভাবা প্রয়োজন। লেখক:প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, অতীশ দীপংকর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় মেইন ক্যাম্পাস, বনানী, ঢাকা। সাবেক এমপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন