ডিসেম্বর। বিজয়ের মাস। স্বপ্নের মাস। সেই ৪২ বছর আগে দক্ষিণ এশিয়ার একটি ছোট্ট মানচিত্রে নিজেদের আত্মপরিচয় লাভের জন্য একটি জাতি স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। রাষ্ট্র হয়েছে। নিজেদের শাসক পেয়েছে। আত্মপরিচয়ও পেয়েছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র তৈরির পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরির যে স্বপ্ন এই জাতি দেখেছিল সেটি কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে — বিজয়ের মাসে সেই প্রশ্ন অনেকের মনেই উঁকি দিচ্ছে। রাজনৈতিক মুক্তি, অর্থনৈতিকভাবে সামর্থ্য অর্জন — এ সবই ছিল স্বপ্ন। একাত্তর সালের স্বপ্ন। এই ভূখণ্ডের তাঁতী, মজুর, কৃষক ও কৃষাণীর স্বপ্ন। ৪২ বছর অতিক্রম হতে চলেছে। এদেশের মানুষকে সে স্বপ্ন এখনো হাতছানি দিয়ে বেড়াচ্ছে। এখনো রাজনৈতিক দলগুলো স্লোগান দেয় মুক্তির স্লোগান। কৃষক, তাঁতী এখনো অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা বলে। আমলারা প্রশাসনিক বঞ্চনার কথা বলে। শিক্ষকগণ দেশ থেকে শিক্ষার পরিবেশ ‘গেল গেল বলে রব’ করে। ব্যবসায়ীরা হতাশ। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে এখনো ছাত্ররা নিহত হচ্ছে। শিক্ষকরা লাঞ্ছিত হচ্ছে। মন্দির, প্যাগোডাগুলো পুড়ছে। কোটি কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠছে। বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিজয়ের এই মাসেও চারদিকে হাহাকার। অস্থির রাজনীতি। গলাকাটা গণতন্ত্র। সাধারণ মানুষের অর্থনীতি বিধ্বস্ত। নির্বাচন কানাগলিতে। এখনো চারদিকে সভা — সমাবেশ হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির জন্য। রাজনীতিবিদগণ বক্তব্য দিয়ে মানুষকে আবেগাপ্লুত করেন অর্থনৈতিক বঞ্চনা থেকে মুক্তির জন্য। রাষ্ট্রের অত্যাচারের বিরুদ্ধে মিডিয়া সরব। ৪২ বছর পর ৪২ বছর আগের সেই স্লোগানগুলোই আবার আকাশে বাতাসে মুখরিত করছে। তবে কেন?
বাংলাদেশের মানুষ যখন ৪২-তম বিজয় উদযাপন করবে ঠিক তখনি গণতান্ত্রিক আদর্শের জন্মের আড়াই হাজার বছর পার হচ্ছে। খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে এথেন্সে গণতন্ত্রের জন্ম। আজ থেকে ২৪০০ বছর আগে প্লেটো এই গণতন্ত্রকে ‘চারমিং ফরম অব গভর্নমেন্ট’ (সরকারের আবেদনময়ী রূপ) হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। মধ্য যুগের শেষদিক থেকে ইউরোপীয় পুঁজি বিকাশের হাত ধরাধরি করে গণতন্ত্র সমগ্র ইউরোপ মাতিয়ে আসছে। ম্যাকিয়াভেলির জাতি রাষ্ট্রের ধারণা এই গণতন্ত্রের স্থায়ী ভিত্তি গড়ে তুলে। গণতন্ত্র ইউরোপ ছাড়িয়ে আমেরিকায় রপ্তানি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নতুন কাঠামোর গণতন্ত্রের বিজয় হয়। এশিয়ায় জাতি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। শুরু হয় অ-উপনিবেশিকরণ। জন্ম হয় অসংখ্য রাষ্ট্রের। আর এই জাতি রাষ্ট্রগুলো পুঁজিবাদী জাতি রাষ্ট্রের আবশ্যক উপাদান হিসেবে গণতন্ত্রের মন্ত্রও গ্রহণ করে। একই সময়ে পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের নেতৃত্বে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবত্ লড়াই চলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের সাথে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের। ৯০-এর দশক টার্নিং পয়েন্ট। পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও চূড়ান্ত আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ইতোমধ্যেই পুঁজিবাদী গণতন্ত্র অনেক পথ পাড়ি দিয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অ-উপনিবেশিকরণের স্রোতেই বাংলাদেশের জন্ম। ৭১ সালে পুঁজিবাদী জাতি রাষ্ট্রের পাশাপাশি গণতন্ত্রের মন্ত্রেও আমরা মুগ্ধ হই। বাঙালিরা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই শুরু করে ভারত বিভক্তির আগে থেকেই। সেই লড়াই অব্যাহত থাকে ৪৭-এর পর পাকিস্তানী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে। ৭১ সেই লড়াইকে জীবন এনে দেয়। কিন্তু গত ৪২ বছর এই জীবন্ত গণতন্ত্রের গলা গণতন্ত্রের প্রেমিকরা এমনভাবে খুঁচিয়েছে যে তার গলা দিয়ে রক্তের ফিনকি বের হচ্ছে। গলাকাটা গণতন্ত্র রক্তশূন্য হয়ে ধীরে ধীরে যেন নির্জীব হয়ে যাচ্ছে।
রক্তশূন্য গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের পুনরুত্থানের বাইশ বছর অতিক্রম করছি। গণতন্ত্রের রক্তশূন্যতা দিন দিন বেড়েই চলছে। দু’টি দল পালাবদল করে ক্ষমতায় এসেছে। জনগণের নামে জনগণের স্বাধীনতা হরণ করার চেষ্টা করেছে। বিরুদ্ধ মতকে অবরুদ্ধ করেছে। জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির চেয়ে দলের কতিপয় ব্যক্তির অর্থনৈতিক মুক্তিকেই প্রাধান্য দিয়েছে। সভা-সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। ধর্ম ও ধর্ম নিরপেক্ষতা উভয়কেই ব্যবহার করেছে ক্ষমতা লাভের সিঁড়ি হিসেবে। রাষ্ট্রকে পুলিশি চরিত্র দিয়েছে। উপনিবেশিক আমলের মতো জনতাকে পুলিশের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়েছে। অথচ তত্ত্বগতভাবে, এই পুঁজিবাদী গণতন্ত্রও মানুষের মত প্রকাশের অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সকল সিদ্ধান্তেই জনগণের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা দেয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে যে সংসদ সেই এখন প্যারালাইজড। যে গণতন্ত্রে সংসদ আছে বিরোধী দল নেই, যে গণতন্ত্রে বিচার বিভাগ আছে আইনের শাসন নেই, যে গণতন্ত্রে সরকার আছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই সেটাতো গলাকাটা গণতন্ত্র। গণতন্ত্র আছে ভিন্নমত নেই এতো রক্তশূন্য গণতন্ত্র। এই গলাকাটা, রক্তশূন্য গণতন্ত্র দেশের মানুষকে বিভক্ত করছে। দেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিজয়ের মাস থেকেই বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের কর্মসূচি দিচ্ছে। আবারো আন্দোলন। বিরোধী দলগুলো এই আন্দোলনকে বলছে মানুষের মুক্তির আন্দোলন। অন্যদিকে, সরকারও মানুষের মুক্তির জন্য সেই আন্দোলন জম দূতের নিকট পাঠাচ্ছে। এই যে গণতন্ত্রের নামে মানুষের মুক্তির জন্য বিপরীতধর্মী লড়াই সেই লড়াইয়ের অবসান হবে কীভাবে? এক সময় জনগণ বিরক্ত হয়ে বলে উঠবে’ নাতো— ‘যথেষ্ট হয়েছে’। প্লিজ আমাদের মুক্তির জন্য লড়াই করবেন না। আমাদের গণতন্ত্র রক্ষার নামে গণতন্ত্রের গলাকাটার জন্য যুদ্ধ বাধাবেন না। আমরা শুধু আপনাদের লড়াই থেকে মুক্তি চাই।
নির্বাচন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের ক্ষমতায় আসা ও ক্ষমতায় থাকার বড় স্লোগান। নির্বাচন হলো গণতন্ত্রে প্রবেশের তোড়ন। গত ৪২ বছর যাবত্ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সেই তোড়ন রক্ষার জন্যই লড়াই করছে। আমরা যখন সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লড়াইয়ের ৪২ বছর উদযাপন করব তখন স্পার্টা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলের ২৭০০ বছর অতিক্রম করছে। খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ধারা স্পার্টায় শুরু হয়েছিল। এই নির্বাচনকেই গণতন্ত্র সরকার পরিবর্তনের উপায় হিসেবে নিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ গত বাইশ বছর সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিশেষভাবে লড়াই করছে। এক সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংবিধানিক ফর্মুলা তৈরি হলো। আমরা ভাবলাম এই বুঝি আমাদের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের প্রাথমিক ধাপ অর্জিত হলো। কিন্তু সেই আগের অবস্থা। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানেই আছি। অথবা অন্যরা যেখানে এগিয়েছে, আমরা সেখানে পিছিয়ে গেছি। আবার লড়াই শুরু হয়েছে। বিজয়ের মাসেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য লড়াই। বিরোধী দলগুলোর ভাষায় এই লড়াই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লড়াই। গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই। মানুষের ভোটের অধিকারের লড়াই। অন্যদিকে, সরকার বলছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে না। গণতন্ত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় না। সুতরাং সরকারের ভাষায় গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে এই লড়াইকে নিবৃত্ত করতেই হবে। তাই বাংলাদেশের গলাকাটা গণতন্ত্রে নির্বাচন কানাগলিতে।
দেশ অনিশ্চয়তার পথে। গণতন্ত্র অন্ধকারে। মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত। রাজনীতি উত্তপ্ত। গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য গত ৪২ বছর যাবত্ যে লড়াই শুরু হয়েছে বাংলাদেশে সেই লড়াইকেই মানুষ এখন ভয় পাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো লড়াই চায়। মানুষ লড়াই চায় না। শান্তি চায়। স্থিতিশীলতা চায়। মুক্তি চায়। গণতন্ত্র এখন তামাশায় পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রের নামে মানুষ মরছে। গণতন্ত্রের নামে লুটপাট হচ্ছে। গণতন্ত্রের নামে দুর্নীতি হচ্ছে। বাংলাদেশে সকল অগণতান্ত্রিক কাজই যেন এই গণতন্ত্রের নামে। এই অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করতে হবে। প্রাথমিকভাবে, নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য এক ধরনের অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের মেয়াদ ৫ বছরের পরিবর্তে ৪ বছর করতে হবে। সাংসদদের উপর দলগুলোর একক আধিপত্য দূর করার জন্য সাংসদদেরকে স্বাধীনভাবে মতামত প্রদানের আইনী সুযোগ দিতে হবে। বিচার বিভাগকে স্বাধীন করতে হলে একটি স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে বিচারকদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং যেকোনো রায়ের চুলচেরা বিশ্লেষণের অধিকার জনগণকে দিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই বিরোধী দল সংসদ বর্জন করবে না — সেই প্রতিশ্রুতি সকল রাজনৈতিক দলকেই দিতে হবে। প্রার্থী হিসেবে অসত্ ও দুর্নীতিবাজদের মনোনয়ন দিলে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদেরকে বর্জন করতে হবে। অন্যথায় আমাদেরকে গলাকাটা গণতন্ত্রে থেকে আজীবন সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লড়াই করে যেতে হবে। ২৪০০ বছর পর আবার প্লেটোকে স্মরণ করতে হবে। প্লেটো গণতন্ত্রকে আকর্ষণীয় সরকার ব্যবস্থা বললেও এর স্বৈরতান্ত্রিক রূপ পরিগ্রহের ব্যাপারেও সতর্ক করেছিলেন। আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে স্বৈরতান্ত্রিক গণতন্ত্রের ব্যাপারে। আর সেই স্বৈরতন্ত্রের হাত ধরে দেশ যেন রসাতলে না যায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। গণতন্ত্রের প্রহরীরা কি ঘুমিয়ে আছেন নাকি নৈরাজ্য সৃষ্টি করছেন?
লেখক : শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Email: [email protected]
