চালের ন্যায্যমূল্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:২৭
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়া যাহারা কাজ করেন তাহাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় ভাল আর্থিক বত্সরের ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি সর্বদা লক্ষ্য করা যায়, নিঃসন্দেহে তাহার উত্তর হইবে কৃষিতে বাম্পার ফলন। অর্থাত্ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনও দারুণভাবে নির্ভর করিতেছে কৃষি এবং কৃষকের উপর। এক সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা যখন সাড়ে চার কোটি ছিল তখনও পাঠ্যবইতে ‘জনসংখ্যা সম্পদ না আপদ’ এই ধরনের প্রশ্নের উপস্থিতি দেখা যাইত। অথচ এখন ষোল/সতের কোটি মানুষের দেশে জনসংখ্যাকে সম্পদ হিসাবেই দেখা হয়। তাহার একটা কারণ তখন ঐ সাড়ে চার কোটিকেই খাদ্যের ঘাটতিতে ভুগিতে হইতো। আর এখন ষোল/সতের কোটি মানুষের অন্নসংস্থান করিতেছে আমাদের কৃষক সমাজ। মাঝেমধ্যে আমরা বিদেশে চালের মতো পণ্যের রপ্তানির চিন্তাও করিতেছি। এই সবই আমাদের কৃষক সমাজের অবদান। কিন্তু প্রশ্ন হইলো তাহাদের জন্যে আমরা সবাই কী করিতে পারিয়াছি? বাংলাদেশে সবকিছুর দাম বাড়িতেছে প্রতিনিয়ত। এই বর্ধনশীল দামদস্তুরকে অর্থাত্ মূল্যস্ফীতিকে বাগে আনার জন্য আর্থিক আর রাজস্ব নীতিকে নানাভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হইতেছে। এই অবস্থার মধ্যেও কমিতেছে চালের দাম। মূল্যস্ফীতি ধর্তব্যে আনিলে বাংলাদেশে চালের দাম অর্থাত্ প্রকৃত দাম প্রতি বত্সর কমিতেছে। তাহার পরেও কৃষক বাঁচিয়া আছে উত্পাদনশীলতা বাড়ার কারণে। কিন্তু সেই উত্পাদনশীলতা তো এখন আর তেমন একটা বাড়িতেছে না। ফলে চালের কম দাম কৃষকের প্রকৃত আয় অর্থাত্ ক্রয়ক্ষমতা কমাইয়া দিতেছে। কৃষক ফসল বিশেষ করিয়া ধান কাটার পর বাজারে ধানের কম দামের কারণে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। বর্তমানে বাজারে আমন ধানের যে দাম তাহাতে কৃষকের উত্পাদন খরচই উঠে না। এই উত্পাদন খরচের মধ্যে আবার কৃষক তাহার নিজের শ্রমের দাম ধরে না। কৃষকের নিজের শ্রমের দাম হিসাবে আনিলে ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বাড়িয়া যায়। ফলে এই অবস্থা চলিতে দেওয়া যায় না। চড়া দামে বীজ, সার ও কীটনাশক ব্যবহার করিয়া যে ফসল ঘরে তোলেন কৃষক তাহার ন্যায্যমূল্য না পাইলে তাহারা তো হতাশ হইবেনই। সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী কৃষকের প্রতিমণ ধানে গচ্চা দিতে হয় একশ হইতে দেড়শ টাকা। এই গচ্ছা কিন্তু ধানের ফলনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতে বাধ্য, যদি সময়মতো ন্যায্যমূল্যের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া না হয়। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, সরকার ২৬ টাকা কেজিদরে তিন লাখ টন চাল কিনিবে। চলতি সপ্তাহ হইতে আমন ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হইবে এবং ফেব্রুয়ারি মাস ধরিয়া তাহা চলিবে। তবে আমনের এই সংগ্রহ অভিযান আরও অনেক আগে হইতেই শুরু হওয়া উচিত ছিল। এখন দেখিতে হইবে এই সংগ্রহ অভিযানের ফল কৃষকরা পায় কি না। নাকি শুধু চালের আড়তদার আর চালকল মালিকরা ইহার সুবিধা লাভ করিয়া যাইবে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইলো সরকারের সংগ্রহের ক্ষেত্রে চালের নির্ধারিত দাম যৌক্তিক পর্যায়ে ঠিক করা। প্রশ্ন উঠিয়াছে যে, সরকার চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও দাম যৌক্তিক পর্যায়ে ঠিক করে নাই। বরং ভর্তুকির টাকার পরিমাণ কমাইয়া রাখার জন্য সরকারি সংগ্রহের ক্ষেত্রে চালের দাম কমাইয়া রাখা হইতেছে। অবশ্য সরকারের দিক হইতে নীতি নির্ধারকরা বলিতেছেন যে, যদি চালের মূল্য আরও উপরে ধার্য করা হয় তবে সরকার দাম সেই পর্যায়ে ধরিয়া রাখিতে পারিবে না। কারণ দাম আরও উপরে ধরিয়া রাখিতে আরও অনেক বেশি পরিমাণে সংগ্রহ করিতে হইবে। তাহা করার মতো জায়গা অর্থাত্ গুদাম সরকারের নাই। আরেকটা সম্ভাব্য সমস্যা হইলো দাম আরও উপরে থাকিলে পরের মৌসুমে আরও অনেক বেশি চালের উত্পাদন হইবে এবং দাম আরও পড়িয়া যাইবে। এই সবের মধ্যে অবশ্যই যুক্তি আছে। তবে কোন না কোনভাবে কৃষককে ন্যায্যমূল্য পাইতে সাহায্য করিতে হইবে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী থাকার জন্য; বিশ্ববাজারে খাদ্যমূল্যের ও যোগানের অস্থিরতা হইতে দেশ ও দেশের মানুষকে মুক্ত রাখার জন্য।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন