তৃণমূল পর্যায়ে চিকিত্সক সংকট

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:২৭
উত্তরাঞ্চলীয় দুই জেলা ঠাকুরগাঁও ও রংপুরের তৃণমূল পর্যায়ে চিকিত্সক সংকটের করুণ চিত্র তুলিয়া ধরিয়াছেন ইত্তেফাক-এর স্থানীয় সংবাদদাতা। গত বুধবার প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র ভরসা হইল ৫০ শয্যাবিশিষ্ট গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কখনই প্রয়োজনীয় চিকিত্সক থাকেন না। তাঁহারা আসেন আবার চলিয়া যান। প্রতিবেদনে এই যাওয়া-আসার যে-যিকঞ্চিত্ তথ্য তুলিয়া ধরা হইয়াছে তাহা এককথায় অবিশ্বাস্যই বলা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই আসা-যাওয়ার মধ্যে ব্যবধান মাত্র কয়েক ঘন্টার। আবার কারণে-অকারণে অনুপস্থিত চিকিত্সকের সংখ্যাও একেবারে কম নহে। ফলাফল হইল, গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১ জন চিকিত্সক থাকিবার কথা থাকিলেও বর্তমানে আছেন মাত্র ১০ জন। উপজেলাভুক্ত ইউনিয়নগুলির অবস্থা আরও করুণ। দশটি ইউনিয়নের মধ্যে ৮টিই এখন চিকিত্সকশূন্য। অন্যদিকে, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রসমূহে ১৯ জন চিকিত্সকের স্থলে বর্তমানে আছেন মাত্র ৭ জন। তাহা হইলে প্রশ্ন উঠা সঙ্গত যে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি চলিতেছে কিভাবে? এই প্রসঙ্গে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার মন্তব্য এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন যে ‘জোড়াতালি দিয়া কোনোরকমে’ চলিতেছে। সারা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির চিত্রও যে ভিন্ন নহে— তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। সংবাদপত্রগুলিতে প্রায় প্রতিদিনই স্থানীয় পর্যায়ে চিকিত্সক সংকট এবং চিকিত্সাবঞ্চিত সাধারণ মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলিয়া ধরা হইতেছে। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলও বিষয়টি সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত আছেন। কিছুদিন আগে এক চিকিত্সক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এই ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করিয়াছিলেন। কিন্তু এই সতর্কবার্তায়ও কোনো কাজ না হওয়ায় জাতীয় সংসদে ক্ষুব্ধ সদস্যদের তোপের মুখে পড়িতে হইয়াছিল স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে। তিনি তাঁহার অসহায়তা প্রকাশ করিয়াই দায় সারিয়াছেন। সবকিছু আগের মতোই চলিতেছে। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকিয়া কিংবা জনগণের অর্থে প্রতিপালিত সরকারি কর্মকর্তা হিসাবে অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব-কর্তব্যের তোয়াক্কা না করিয়াও একশ্রেণীর চিকিত্সক নিয়মিত বেতনভাতা পাইতেছেন। আর ইহার প্রতিকার বা প্রতিবিধান করা যাহাদের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সেই কর্তাব্যক্তিদেরও সুযোগ-সুবিধার কোনো ব্যাঘাত ঘটিতেছে না। অথচ যাহারা তাহাদের বেতন-ভাতার অর্থ জোগাইতেছে সেই জনগণের ভাগ্যে ন্যূনতম চিকিত্সা সেবাটুকুও জুটিতেছে না। বিশেষ করিয়া গ্রামগঞ্জের সিংহভাগ মানুষের এমনিতেই নুন আনিতে পান্তা ফুরাইয়া যায়। চাহিদা অনুযায়ী সরকারি চিকিত্সা সেবা না পাওয়ার কারণে তাহাদের দুর্ভোগের মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পাইতেছে। কারণ বেসরকারি চিকিত্সা সুলভ হইলেও ইহার ব্যয়ভার বহনের সামর্থ্য তাহাদের নাই। ইহা অনস্বীকার্য যে তৃণমূল পর্যায়ের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে চিকিত্সকের উপস্থিতি নিশ্চিত করিবার দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। কোনো অজুহাতেই এই দায়িত্ব এড়াইয়া যাওয়ার উপায় নাই। তাহারা তাহাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিলে বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া এই বিশৃঙ্খল অবস্থা বহাল থাকিতে পারিত না— তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু নির্বাচিত-অনির্বাচিত কোনো সরকারই এই দায়িত্ব পালন করেন নাই। ফলে যাহা হইবার তাহাই হইতেছে। সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক মহলের বোধোদয় না হইলে কোনো জাদুমন্ত্রবলে এই অবস্থার অবসান ঘটিবে এমনটিও আশা করা যায় না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন