[ রা জ নী তি ]

চলমান সংকট সমাধানে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ কাম্য

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২২
গত ২৮ নভেম্বর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের জনসভায় বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে ৯ ডিসেম্বর রাজপথ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়ার দাবি জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে দেশে আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য কোনো দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। সংসদ নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে বেগম জিয়া সামপ্রতিককালে রাজধানীতে একাধিক জনসভা করেছেন। গত ১২ মার্চ রাজধানীতে এক জনসভায় খালেদা জিয়া নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকে ৯০ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। পুনরায় ১১ জুন রাজধানীতে এক গণসমাবেশে সরকার তাদের দাবি মেনে না নিলে ঈদ-উল-ফিতরের পর হরতাল, অবরোধ, অবস্থান কর্মসূচিসহ আরও কঠোর কর্মসূচি দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি একাধিকবার নাকচ করে দিয়েছেন। তার যুক্তি হলো, ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রচলন করা হয়, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট তা বাতিল করেছে এবং শুধু জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জাতীয় সংসদের সদস্যগণ দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পক্ষে রায় দিয়েছে। সুতরাং অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। তাছাড়া সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে জাতীয় সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনকারী ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছে। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৩০ জুলাই লন্ডনে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে নির্বাচনকালে বিরোধী দলের সমন্বয়ে সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভায় বিএনপিও অংশগ্রহণ করতে পারবে। নির্বাচনের সময় সরকার গঠনে বিরোধী দল যদি অংশীদারিত্ব চায় সেটা দিতে পারি। সবাই মিলে আমরা নির্বাচন করতে পারি। একটা ছোট মন্ত্রিসভা করে ইলেকশন করতে পারি। এজন্য সংসদে এসে বিএনপিকে প্রস্তাব দেয়ার আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী। তবে ওই প্রস্তাব দেয়ার তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী আগামী সংসদ নির্বাচনকালে সরকার ব্যবস্থা কী রকম হবে তা নিয়ে সংসদে একটি বক্তব্য দেন। ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি সংসদে বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদে তার নিজে বহাল থাকা অবস্থায় এবং বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনেই আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি আরও বলেন, সংসদ ভেঙে দিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচন কখন অনুষ্ঠিত হবে তা তিনি সময়মতো রাষ্ট্রপতিকে জানাবেন। রাষ্ট্রপতি তা বিবেচনা করবেন এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংসদ ভেঙে দেবেন। প্রধানমন্ত্রীর বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাবের মাঝে অনেকে সংঘাতমুখী বড় দুই দলের সংলাপ ও সমঝোতার একটি ক্ষীণ আশা দেখেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানের ব্যাপারে একটি সমঝোতায় আসা গেলে বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠা বহুলাংশে সহজ হবে। বর্তমান সরকারের অধীনেই আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আশাবাদীরা হতাশ হয়ে পড়েন। তবে কেউ কেউ মনে করেন, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের বক্তব্য একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। ৩০ জুলাই লন্ডনে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী প্রয়োজনে বিরোধী দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে আওয়ামী লীগ প্রস্তুত। এটা সত্য, বিএনপি নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য আন্দোলন করছে। দলটি বলেছে, নির্বাচনকালে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা, তা তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন যে নামেই হোক, পুনর্বহাল না করা হলে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না এবং নির্বাচন হতে দেবে না। তবে এটাই কী তাদের শেষ কথা? অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, যে ফর্মেই আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত বিএনপি সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাইবে। মুখে বিএনপি যাই বলুক, বেশ কয়েকটি কারণে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য তলে তলে মুখিয়ে আছে। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে—এক. দেশি-বিদেশি সংস্থার জরিপে আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপির অবস্থান ভালো। দুই. দলটি মনে করে নির্বাচনে আর যাই হোক, ১৯৯০ পূর্ববর্তী ভোট ডাকাতির সুযোগ থাকবে না। সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’ হলেও সরকার পরাজয় ঠেকাতে পারবে না। তিন. বিএনপি জানে আগামী সংসদ নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় তারা ভালো অবস্থানে থাকায় রাজনৈতিক সংঘাত বা অন্য কোনো অজুহাতে অগণতান্ত্রিক শক্তির রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ তাদের জন্য চরম ক্ষতিকর। চার. বর্তমানে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী এবং মাঝারি হতে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বসিত ভাব বিরাজমান। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তাদের মধ্যে কোনোভাবেই হতাশা সৃষ্টি করা সম্ভব নয় বিএনপির পক্ষে। ২২ নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগামী সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে দেশে চলমান সংকট সমাধানে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান উদ্যোগ গ্রহণ করুন বিএনপি এমনটাই চাইছে। দলটি বলেছে, রাষ্ট্রপতি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপের কিংবা আলোচনার উদ্যোগ নিলে তাতে ইতিবাচক সাড়া দেবে। রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ নেয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ঘোষণা চাইলেও বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ জানেন যে, অনির্বাচিত সরকারের কোনো ফর্মুলা না মানার বিষয়ে বর্তমান সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের নামে কোনো অবস্থাতেই অনির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী প্রয়োজনে বিরোধী দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে সম্মত আওয়ামী লীগ। এর বাইরে অন্য কোনো আপোষ করবে না তারা। ফলে যদি বিএনপি অংশ নাও নেয় তাহলেও নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে হাঁটবে সরকার। কার্যত সরকারের এই মনোভাব বুঝতে পেরেই রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ বা হস্তক্ষেপ কামনা করছে বিএনপি। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিতে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান যে উদ্যোগ নেন তা ইতোমধ্যে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমসহ জনগণের প্রশংসা কুড়িয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে সৃষ্ট সংকট সমাধানে রাষ্ট্রপতি উদ্যোগ নিলে সমাজের সর্বস্তরের জনগণ তার প্রশংসা করবেন। যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ আদালত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায় সরকারকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করে বাতিল ঘোষণা করেছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুধু জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যগণ দ্বারা গঠিত হবে বলে রায় দিয়েছে, সেহেতু সরকারি ও বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যগণের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা গঠন হতে পারে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি ও বিরোধী দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সরকার গঠনে ইতোপূর্বে ঘোষণা দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার আপত্তি করা উচিত হবে না এ কারণে যে, এরূপ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন মূলত তারই চিন্তার ফসল। ১৯৯৪ সালে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রথম বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি দশ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভার প্রস্তাব করেছিলেন, যেখানে বিরোধী জোটের চারজন এবং সরকারি দলের পাঁচজন সদস্য থাকার কথা ছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছিল তখন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে। প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে রাজি হয়নি। মূলত এ কারণে উদ্যোগটি সফল হয়নি। সবশেষে যা বলা দরকার তা হলো, নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে চলমান সংকট সমাধানে রাষ্ট্রপতি উদ্যোগ নিলে প্রধান দু’দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হলে তাতে তাদের উভয়ের স্বার্থরক্ষা হবে এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচনের পথ সুগম হবে। গণতন্ত্রের যাত্রা অব্যাহত থাকবে। এটা না হলে এবং ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংঘাতের পুনরাবৃত্তি হলে তা তাদের কারও জন্য শুভ হবে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যত শিগগির এ নিদারুণ সত্যটা উপলব্ধি করবে ততই মঙ্গল। লেখক : সাবেক সচিব E-mail: latifm43¦gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন