২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের ১৯৩ টি সদস্য রাষ্ট্রের ১৩৮ টির স্বতস্ফূর্ত সমর্থন নিয়ে সংস্থাটির অসদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা পায় ফিলিস্তিন। বিশ্বে ফিলিস্তিনিরাই একমাত্র জনগোষ্ঠী যাদের এই স্বীকৃতি পেতে দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশী সময় অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বৃটিশ সরকার। অধিকন্তু জাতিসংঘ রেজুল্যুশন ১৮১’র মধ্য দিয়ে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে দীর্ঘ ৬৫ বছর ধরে ইউরোপীয়দের দায় ( ইহুদীরা ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে এসে সঙ্কট তৈরি করছে) মাথায় করে ফেরি করে বেড়াচ্ছে ফিলিস্তিন। এসময়ে ইসরায়েলের বারবার আগ্রাসনে ফিলিস্তিনিদের অনেক রক্ত ঝড়েছে। পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাওয়ায় জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়ার পথে ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাস একধাপ এগিয়ে গেছেন এটা যেমন সত্য। পাশাপাশি অদূর ভবিষ্যতে তাকে পশ্চিমা বিশ্ব ও ইহুদীবাদীদের সৃষ্ট বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, এটিও মিথ্যা নয়।
পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হওয়ায় ফিলিস্তিনের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমত: জাতিসংঘভূক্ত বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বহু গুরুত্বপূর্ন সংস্থায় যোগ দিতে ফিলিস্তিনের সামনে আর কোনো বাধা রইল না। দ্বিতীয়ত: আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ( আইসিসি) ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সদস্য হতে পারবে ফিলিস্তিন। আইসিসির সদস্য হতে হলে প্রথমে ফিলিস্তিনকে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তি রোম সংবিধি অনুসমর্থন করতে হবে। আইসিসির সদস্য হয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধারপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনতে পারবে ফিলিস্তিন। এমন অভিযোগ আনার বহু ক্ষেত্রও আব্বাসের সামনে উপস্থিত। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে তিন সপ্তাহব্যাপী আগ্রাসনে ইসরায়েল ১৪ শ’ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছিল; নিহতের এক তৃতীয়াংশই ছিল শিশু। ১৯৮২ সালে ইসরায়েলি বাহিনী বৈরুতের মারবা ও শাতিলা নামের দুটি ফিলিস্তিনি শিবিরে গণহত্যা চালিয়ে ৮০০ নিরপরাধ লোককে হত্যা করে। গত ১৪ নভেম্বর গাজায় ৮ দিনব্যাপী হামলা চালিয়ে ১৬৮ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে ইসরায়েল; যাদের ৩৭ জনই শিশু। শুধু তাই নয়, ইসরায়েল এ পর্যন্ত যতবারই ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে ক্ষেপনাস্ত্র ও স্বশস্ত্র হামলা চালিয়েছে ততবারই ফিলিস্তিনি নারী শিশুরা লক্ষ্যবস্তুতে পরিনত হয়েছেন। ২০০৮ সালের হামলার পর ফিলিস্তিনিরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের তদন্তের আবেদন জানিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। সেবার আইসিসির বক্তব্য ছিল, জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি না দিলে আইসিসি এ ধরনের অভিযোগ আমলে নিতে পারে না। এবার কিন্তু ফিলিস্তিন অবৈধ বসতি স্থাপন ইস্যুতেও অভিযোগ এনে ইসরায়েলকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। জাতিসংঘ এর আগে ৬৬/১১ প্রস্তাবে পূর্ব জেরুজারেম সহ দখলকৃত ফিলিস্তিন ভূখন্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে অবৈধ ঘোষণা করে। প্রসঙ্গত, ১৯৬৭ সালের পর থেকে গাজা ও পশ্চিম তীরে সারে চার লাখ ইসরায়েলি অবৈধ বসতি স্থাপন করে আছে। ফিলিস্তিনিদের মর্যাদা বৃদ্ধির পরপরই চলতি সপ্তাহে ফিলিস্তিনিদের অধিকৃত এলাকায় নতুন করে আরও ৩ শ’ বসতি নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। তবে এ মুহূর্তেই ফিলিস্তিনের আইসিসিতে যাওয়া ঠিক হবে না। এতে করে অচলাবস্থায় থাকা শান্তি প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে আরও অনিশ্চয়তা বাড়বে। আইসিসিতে যাওয়ার সুযোগটিকে ফিলিস্তিন বরং ডেটারেন্ট বা নিবারক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ইসরায়েল নতুন করে বসতি স্থাপন ও আবার কোনো হামলা করতে সচেষ্ট হলে, ফিলিস্তিন আন্তর্জাতিক আদালতে যাবে, এমন হুমকি দিতে পারেন আব্বাস।
ফিলিস্তিনে কোনো ঐক্যবদ্ধ নিরাপত্তা বাহিনী বা পুলিশ নেই। অর্থনৈতিক অবস্থা এখনও নাজুক রয়ে গেছে। যুব সমাজ বেকারত্বে ভূগছে। ২০০৬ সাল থেকে গাজায় ইসরায়েলি অবরোধ অব্যাহত আছে। তারপরও ফিলিস্তিন এখন নতুন সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। হামাস ফাতাহর মধ্যে ঐক্যের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আবর বসন্তের ফলে আরব বিশ্বে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হওয়ায় ও পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ফিলিস্তিন সঙ্কট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এতোদিন যে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নীতি অনুস্মরণ করে আসছে, তা থেকে সরে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কারণ আরব বিশ্বের আঞ্চলিক শক্তিধর রাষ্ট্র ইরান, মিসর, তুরস্ক, লেবানন, জর্দান, তিউনেসিয়া, সিরিয়া ইসরায়েলের অন্যায় আচরনে অনেকটা ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে ফিলিস্তিনকে সমর্থন দিচ্ছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের ভ্যাটো ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের আশু সুরাহা চাইছে। এমতাবস্থায় দ্বিরাষ্ট্রিক পন্থায় বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘসময়ের এ সঙ্কট নিরসন করে ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তত্পর হবে এমন প্রত্যাশা বিশ্ববাসীর।
লেখক: বিএসএস (সম্মান), এমএসএস আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
