আজ ১০ ডিসেম্বর, বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। ‘‘মানবাধিকার’’ শব্দটি বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়। এটি মূলত ফরাসি শব্দ Droits de L'home থেকে নেয়া, যার অর্থ মানুষের অধিকার। তারও আগে ৬০০ সালে মহানবীর (সা.) হাদিসে এর প্রতিশব্দ হিসেবে ‘হাক্কুন’ শব্দটি অসংখ্যবার ব্যবহূত হয়েছে। মানবাধিকার-মানুষের সেই সব স্বার্থকে বুঝায়, যা অধিকারের নৈতিক বা আইনগত নিয়ম-নীতি দ্বারা সংরক্ষিত। রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের মতে, রাষ্ট্র কর্তৃক-এর নাগরিকদের জন্য স্বীকৃত ও প্রদত্ত কতিপয় সুযোগ-সুবিধাকে মানবাধিকার বলে, যেগুলো ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য অপরিহার্য।
বিশ্ব ইতিহাসে সর্বপ্রথম মানবাধিকার সংরক্ষণ সম্বলিত লিখিত সনদ বলতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক প্রণীত মদীনা সনদই আদর্শ প্রতীক। অতঃপর সতের এবং আঠারো শতকে মানবাধিকারের দাবি উচ্চারিত হয় ফ্রান্সের লেখক বোঁদিন এবং ইংল্যান্ডের দার্শনিক জনলক এবং ফ্রান্সের দার্শনিক রুশোর লেখায়। ১২১৫ সালে বৃটেনের ম্যাগনা কার্টা, ১৬৮৯ সালে অধিকার বিল, ১৭৭৬ সালে ভার্জিনিয়া অধিকার বিল মানবাধিকারের ক্ষেত্রে মাইল ফলক। তাছাড়া ফরাসী বিপ¬বের ঘোষণা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে এক নবদিগন্ত। এ সব ঘোষণা প্রতি দেশে সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে পরিলক্ষিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় সীমাহীন নৃশংসতা বিশেষ করে ফ্যাসীবাদী ইতালী সরকার এবং নাত্সী জার্মান সরকার কর্তৃক মানবতার বিরুদ্ধে অপরিসীম নির্মমতার পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধোত্তর বিশ্বে গণতান্ত্রিক সরকার সমূহের নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছায় সর্বজনীন মানবাধিকারের সনদ রচিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলে মানবাধিকার সুনির্দিষ্ট করার জন্য প্রথমে ৩ সদস্যের এবং পরে ৮ (আট) সদস্যের একটি কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশনের সভানেত্রী ছিলেন সাবেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট স্ত্রী মিসেস এলিনর রুজভেল্ট। যা ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মানবাধিকারের বিষয়টি আজও অবহেলিত। মানুষের অস্তিত্বই যেখানে প্রশ্নের সম্মুখীন, সেখানে অধিকার তো অনেক পরে। বিশ্বায়নের এ যুগেও বাংলাদেশে চলে নির্দ্বিধায় ক্রসফায়ারের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, খুন, ফিল্মি স্টাইলে অপহরণ, গুম, গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিকরা মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে। ক্ষুধার তাড়নায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের শ্রম দিয়ে যাচ্ছে অবিরত। আলোচিত শান্তিচুক্তির পরেও আদিবাসীদের অনিশ্চয়তা, গ্রাম-গঞ্জের অসহায় নারী ও শিশু-কিশোরীরা ফতোয়ার শিকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে রিমান্ডে নিয়ে বর্বরোচিত নির্যাতন, এমনকি সঠিক তথ্য জানার অধিকারও নিশ্চিত হয়নি এ দেশের মানুষের। অনুন্নত দেশগুলোর মতো এ দেশেও মানবাধিকারের রচিত বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। তবে একথা স্বীকার করতে হবে যে, মানবাধিকার কমিশন গঠিত হওয়ায় বাংলাদেশে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কারণ মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা যেমন চিরন্তন, তেমনি তা অপ্রতিরোধ্যও। আজকের এ দিনে সবার প্রত্যাশা, শুধু অকার্যকর অবহেলিত শব্দাক্ষর নয়, কার্যত এবং সব শ্রেণী-পেশার সুবিধাভোগী চুক্তিতে বিস্তার লাভ করুক বিশ্ব মানবাধিকার রক্ষার চুক্তি। বিশ্ব মানুষের অধিকার রক্ষার সকল প্রচেষ্টা সফল হোক, সার্থক হোক এবং জয়ী হোক। প্রতিষ্ঠিত হোক সর্বজনীন মানবাধিকার ।
লেখকদ্বয় : মহাসচিব, সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস মুভমেন্ট
সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
