মিসর পরিস্থিতি :শান্তি কতদূর

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৫১
অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে নিজ-ক্ষমতা বাড়াইয়া লইয়া দলীয় উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করিবার যে চেষ্টা প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি শুরু করিয়াছেন তাহাকে কেন্দ্র করিয়া মিসরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিদিন একটু একটু করিয়া খারাপের দিকেই যাইতেছে। হোসনী মোবারকের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটাইয়া রাজনৈতিক বসন্ত আনয়নে সক্রিয় গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির কড়া প্রতিবাদের মুখে, নভেম্বরের শেষদিকে নিজ পদ ও দলের প্রাধান্যপুষ্ট সংবিধান প্রণয়ন অ্যাসেম্বলির ক্ষমতা প্রভূত পরিমাণে বাড়াইয়া লইবার অগণতান্ত্রিক অবস্থান হইতে বৃহস্পতিবার নাগাদ মুরসি খানিকটা সরিয়া আসিবার ঘোষণা দিয়াছেন। এইদিকে, সর্বশেষ প্রাপ্ত সংবাদে জানা যায়, প্রেসিডেন্ট মুরসি বিতর্কিত ডিক্রি বাতিল করিয়াছেন। তাহা সত্ত্বেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হইয়া আসিবার লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। এমতাবস্থায় আট কোটির অধিক জনসংখ্যা অধ্যুসিত আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশটিতে শান্তি নামিয়া আসিবার সম্ভাবনা ম্লান হইয়া যাইতেছে। মুরসি চাহিয়াছিলেন এমন একটি ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করিয়া লইতে যাহা দ্বারা তাঁহার সকল কর্মকাণ্ড চ্যালেঞ্জের বাহিরে থাকিবে। নিজ-দলের প্রাধান্যপুষ্ট সংবিধান প্রণয়ন অ্যাসেম্বলির জন্যও একই ধরনের সুরক্ষার উদ্যোগ লইয়াছিলেন। কিন্তু এই কর্ম করিতে যাইয়া তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়িয়াছেন মুরসি। এমনিতে মুরসির ও তাঁহার সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের মূল উদ্দেশ্য লইয়া গণতন্ত্রপন্থিদের মধ্যে ঘোর সন্দেহ রহিয়াছে। এইবার মুরসির উদ্যোগগুলি সেই সন্দেহ আরও বাড়াইয়া তুলিয়াছে। মুরসি কি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মিসরকে ধর্মবাদী শাসন ব্যবস্থার দিকে লইয়া যাইবার চেষ্টা করিতেছেন? মিসরের গণতন্ত্রপন্থিরা এহেন সন্দেহ মিথ্যা প্রমাণিত করিবার বাসনা হইতেই আবার রাজপথে নামিয়াছেন। লক্ষণীয় বিষয় এই যে, নিজদিগের ক্ষমতা স্বৈরাচারী পর্যায়ে লইয়া যাইবার বিরুদ্ধে দানা বাঁধিতে থাকা বিক্ষোভ-প্রতিবাদগুলির মর্মকথা শ্রবণের দিকে মনোযোগী না হইয়া, অগণতান্ত্রিক শব্দাবলী ব্যবহারের দিকে নিবিষ্ট হইয়াছেন মুরসি। তিনি আন্দোলনকারীদিগকে “অর্থের বিনিময়ে কাজ করা এজেন্ট”, “অন্তর্ঘাতক” ও “পূর্ববর্তী আমলে অবৈধ ব্যবসায়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনকারী” হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছেন। অবশ্য একইসাথে মুরসি জানাইয়াছেন যে, তিনি গত মাসের শেষদিকে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য যেইটুকু ক্ষমতা বাড়াইয়া লইয়াছেন তাহা চলতি মাসের ১৫ তারিখ সংবিধান বিষয়ক গণভোট অনুষ্ঠানের পর হইতে বিলুপ্ত হইয়া যাইবে। উল্লেখ্য, কয়েকদিন পূর্বে তিনি নূতন সংবিধানের পক্ষে ভোট দেওয়া অথবা অপরিমেয় ক্ষমতাসহ প্রেসিডেন্ট এই দুইটির মধ্যে একটি বাছিয়া লইবার জন্য মিসরবাসীর প্রতি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করিয়াছিলেন। মুশকিল হইতেছে এই যে, সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত অ্যাসেম্বলি বর্তমানে মুরসির দলের নিয়ন্ত্রণে রহিয়াছে। এমতাবস্থায় ক্ষমতাসীনদের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রচণ্ড সন্দেহের মধ্যে থাকা গণতন্ত্রপন্থি সংবিধান সংক্রান্ত গণভোট বাতিলের দাবি তুলিয়াছে। পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে টানিয়া লইবার জন্য মুরসি আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিভেদ নির্মাণের বহুল পরিচিত পথটি বাছিয়া লইতেছেন বলিয়া মনে হইতেছে। তিনি “রাজনীতিবিদ ও দেশপ্রেমিক শক্তি” এবং “পূর্ববর্তী শাসনামলে অবৈধ পন্থাতে অর্থ উপার্জনকারী” যাহারা এখন “জাতিকে সন্ত্রস্ত” করিয়া তুলিবার জন্য “অর্থ ব্যয় করিয়া চলিয়াছে”— এই রকমের দুইটি পক্ষ আবিষ্কার করিয়া চলমান আন্দোলনকে একটি অপরাধমূলক তত্পরতা হিসাবে চিহ্নিত করিয়া শেষোক্ত পক্ষের স্কন্ধে সকল দায় চাপাইয়া দিতে চাহিতেছেন। মুরসি সেই ভুলটিই করিতেছেন যাহা নির্বাচিত-অনির্বাচিত স্বৈরাচারীরা নিয়মিত করিয়া থাকে এবং আখেরে সেই ভুলের মাশুল গুনিয়া থাকে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন