সমজাতীয়তার সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ভাগ্যবান জাতি। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক তাঁর ‘বাংলাদেশ একটি জাতির রাষ্ট্রে’ এ জন্য সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একটি জাতি গঠনের পটভূমি তৈরির জন্য যে সমজাতীয়তার উপাদান থাকে, যেমন ভাষা, ধর্ম, নৃতত্ত্ব, সভ্যতা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, ভূগোল, ইতিহাস, সবই আমাদের পক্ষে। কিন্তু এই জাতির দুর্ভাগ্য যে, রাজনীতিবিদরা আমাদের এই অহংকারের বিপক্ষে। বিগত চার দশক ধরেও শাসক এলিটরা আমাদের জন্য জাতি গঠন প্রক্রিয়া (National Building Process) সম্পন্ন করতে পারেননি। বিষয়টির অবতারণা বর্তমান সংকটকে বোঝাবার জন্য। সমাজতাত্ত্বিকরা বলেন, রাজনৈতিক সংকট দূর করা হয়তো সম্ভব কিন্তু আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট দূর করা এক রকম অসম্ভব।
খ. সংঘাতের পটভূমি: একটি জাতির রাষ্ট্রীয় আদর্শ, সংবিধান, উন্নয়ন কৌশল, জাতীয় বীর এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রথা-পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক বিরল। দুঃখজনক হলেও আমাদের জাতীয় জীবনে এটি একটি দুরারোগ্য ব্যাধি। যা হোক ‘ট্রায়াল এন্ড এরর’-এর মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এগিয়ে চলছিল। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে মেয়াদ শেষে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিষ্পন্ন হচ্ছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য ঐ প্রতিষ্ঠিত এবং অনুসৃত পদ্ধতি সম্প্রতি নাকচ করে দেয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের প্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার বাতিল করে দেয়। আওয়ামী লীগ মনে করে এ ব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক। কেবলমাত্র নির্বাচিত ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিবর্গ রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার মালিক। অপরদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ব্যক্তিক সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে বিএনপি এবং তার সহগামী দলগুলো দাবি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ব্যতীত কোন নির্বাচনই নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
গ. বর্তমান আন্দোলন: বিএনপি পঞ্চদশ সংশোধনীর পর-পরই রাজপথে আন্দোলন করছে। আগে থেকেই অনুমান করা হচ্ছিল বিরোধী জোট শীতকালীন সুবিধাজনক সময় আন্দোলনকে বসন্তকালের সফলতায় নিয়ে যেতে চায়। আরব বিশ্বে উত্থিত আন্দোলনকে আরব বসন্ত (Arab Spring) বলা হয়। আমাদের নেতারাও সেই বসন্তের প্রত্যাশা করছেন হয়তো। বর্তমান চলমান আন্দোলন মূল দুটো ইস্যু নিয়ে: প্রথমত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনের আগামী নির্বাচন। দ্বিতীয়ত মৌলিক অধিকার হরণ। জামায়াত মাঠে আছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রতিহত করার দাবিতে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাজপথে সক্রিয় আছে জামায়াতকে প্রতিহত করতে। বিএনপি জোট বিগত বছরগুলোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তথা সরকার বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। অতিসম্প্রতি আন্দোলন তীব্রতা পেয়েছে গত সপ্তাহে জামায়াতের হরতালের পর। জামায়াতের অভিযোগ তারা একটি রেজিস্ট্রিকৃত রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকার তাদের ন্যূনতম কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না। তাদের শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ডাকা হরতাল-এর প্রতি বিএনপি নৈতিক সমর্থন দেয়। এদিকে পূর্ব ঘোষিত ৯ ডিসেম্বর ’১২তে বিএনপি-এর নেতৃত্বাধীন জোট সফলভাবেই রাজপথ অবরোধ পালন করে। এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে চার জন নিহত হয়। বিএনপি’র কয়েকজন শীর্ষ নেতাসহ আহত হয় অনেকে। বিএনপি মহাসচিব (ভারপ্রাপ্ত) মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তাদের শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে তারা আবার আজ ১১ ডিসেম্বর ’১২ হরতাল পালন করছেন।
বিগত চার বছরের যে কোন সময়ের চেয়ে আন্দোলনকে বেগবান মনে হচ্ছে। কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বিগত বছরগুলোতে সুশাসন নিশ্চিতকরণে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির আকাশচুম্বি উর্ধ্বগতি, শেয়ার বাজার লুট, হলমার্ক কেলেংকারি, নিকৃষ্ট দলীয়করণ এবং অবশেষে পদ্মা সেতু ষড়যন্ত্র- এ সবই সাধারণ মানুষকে তেতিয়ে তুলেছে।
ঘ. বিরোধীদের লক্ষ্য: বিরোধী দলের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুন:প্রতিষ্ঠায় সরকারকে বাধ্য করা। বিরোধী দল মনে করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিলোপ সাধন করেছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংঘাত এবং অবিশ্বাসের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অর্জিত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সকল মহলের আস্থা অর্জন করেছিল। উল্লেখ্য যে, সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত সংসদীয় কমিটির সকল সদস্য গৃহীত বিভিন্ন সোসাইটির প্রায় সকলে এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত সকল মতামতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অনুমোদন করা হয়েছিল। এমনকি যে সুপ্রিম কের্টের রায়ের অজুহাতে পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হল সেখানে আরো দু’ টার্মের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। সুতরাং বলা যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্যের সৃষ্টি হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে সবকিছু তছনছ হয়ে যায়। একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে নাকচ করায় গোটা জাতি অযাচিতভাবে একটি সাংবিধানিক সংকটে নিপতিত হয়েছে। আরও দুর্ভাগ্যের বিষয় বিগত চার বছরে সরকারের মানবাধিকার কার্যক্রম বিগত ৪০ বছরের ইতিহাসকে ম্লান করে দিয়েছে। দেশি এবং বিদেশি সমস্ত মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে হত্যা, খুন, গুম, গ্রেফতার, হামলা-মামলার যে পরিসংখ্যান উপস্থাপিত হয়েছে তা রীতিমত উদ্বেগজনক। সারাদেশে আইন-শৃংখলার যে চিত্র পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে তা যে কোন নাগরিককে বিচলিত করতে বাধ্য। বিশেষ করে বিরোধী মত ও বিশ্বাসকে দলন ও দমনে সরকার নির্লজ্জ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।
ঙ. যুদ্ধাপরাধ ইস্যু: ১৯৭১ সালে এই জাতির উপর পাকিস্তানি হানাদারদের হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়। যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার ছিল প্রাথমিক সরকারের একটি নৈতিক কর্তব্য। ১৯৭৩ সালে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বাস্তবতায় সে সময়ে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যায়নি। ৪০ বছর পরে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিএনপি নীতিগতভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিরোধী নয়- একথা তারা বার বার বলেছে। বাংলাদেশে যতগুলো সংবেদনশীল বিষয় রয়েছে তার মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অন্যতম। দেশের এই সংবেদনশীলতাকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, এ রকম অভিযোগ প্রতিপক্ষের। বিচারিক ব্যবস্থা নিয়ে দেশি সন্তোষ এবং বিদেশি অসন্তোষ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। জামায়াত অভিযোগ করছে ক্ষমতাসীন সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে। আর আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধ ইস্যুকে প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়ে পরিণত করেছে। বিগত কয়েক বছরে যতবারই সরকার বিরোধী আন্দোলন হয়েছে ততবারই তারা এটাকে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার আন্দোলন বলার প্রয়াস পেয়েছে। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় অথবা যেখানে দুর্ঘটনা বা বড় ধরনের সর্বনাশ হয়েছে ততবারই সরকার জামায়াত কানেকশন খোঁজার চেষ্টা করেছে। এমনকি সর্বশেষ আশুলিয়ার গার্মেন্টস-এর আগুনেও জামায়াত সংযোগের কথা বলেছেন শীর্ষ নেতৃত্বসহ দায়িত্বশীল মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। বিশ্লেষকরা কোন রকম বাদ-বিচার না করে পাইকারী দোষারোপকে বরং জামায়াতের দোষ স্খলনের সুযোগ করে দেয়ার শামিল বলেছেন। এখন জামায়াত বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক আন্দোলনের সাথে যুদ্ধাপরাধীদের ইস্যুকে সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। আর আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মত মৌলিক ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে নেয়ার জন্য এটিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। যেটি কারও কাম্য নয়।
চ. সমাগত সংঘাত:সামনের দিনগুলোতে উপরোক্ত দুটো ইস্যুতে আরও উত্তপ্ত হবে রাজপথ। সংঘাতের অনিবার্যতায় আরও মৃত্যু, আরও ধ্বংস, আরও অরাজকতার মোকাবিলা করতে হবে দেশকে। যুক্তি, আইন আর মানবিকতা যখন প্রত্যাখ্যাত হয় তখন সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। সরকার ও বিরোধী দলের এ সংঘাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। ৯ তারিখের অবরোধে কোর্ট-কাচারীর ঐদিকে বিশ্বজিত নামের যে ছেলেটি পিকেটার সন্দেহে ছাত্রলীগের হাতে জীবন দিল কে নেবে তার দায়ভার? এভাবে সরকার ও বিরোধী দলের সংঘাতে আর কত জীবন ঝরবে?
এ দেশের কেউই বিশ্বাস করে না ক্ষমতাসীন থেকে দলটি নিরপেক্ষ নির্বাচন করবে। অনেক রক্ত, অনেক ত্যাগ- তিতিক্ষার বিনিময়ে যে ব্যবস্থাটি সর্বমহলে গ্রাহ্য হয়ে উঠেছিল তাকে অগ্রাহ্য করার কি দরকার ছিল? সুতরাং বল যাদের কোর্টে উদ্যোগ তাদেরই নিতে হবে। মনে রাখতে হবে তারা সরকারে আছেন, তাদের যেমন সহনশীলতা দেখাতে হবে বিরোধী পক্ষকেও নিয়মতান্ত্রিকতা রক্ষা করেই আন্দোলন করতে হবে। যে কোন সমস্যা-সংঘাত অবসানের শেষ উপায় সংলাপ। এ দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ রাজপথে সংঘাত দেখতে চায় না। সুতরাং সরকারের উচিত মারমুখো মনোভাব বর্জন করে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বিরোধী পক্ষকে সংলাপের আহবান জানানো। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অথবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হোক, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ, নির্দলীয় ব্যবস্থাধীনে অনুষ্ঠিত হোক—এ দাবি আপামর জনসাধারণের। পৃথিবীর তাবত্ সংঘাতের সমাপন সংলাপের মধ্যেই হয়েছে। ‘বিরোধ, সংলাপ, মাধ্যম, মীমাংসা নেতৃত্বের গুণপনার উপরই অধিকাংশে নির্ভরশীল”।
লেখক: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
