যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিটি এন্ড গিল্ডসের গবেষণা সূচকে সর্বাধিক সুখী ব্যক্তির তালিকায় স্থান পেয়েছে মালি ও পুষ্পরাজি। অন্যদিকে সবচেয়ে অসুখী ব্যক্তির তালিকায় স্থান পেয়েছে ব্যাংকার। তাদের মধ্যে শতকরা ৫৬ ভাগ অসুখী হিসেবে নিজেদের বর্ণনা করেছেন। এই মুহূর্তে এই গবেষক দল যদি বাংলাদেশে একটি জরিপ ব্যাংকারদের উপর পরিচালনা করেন এটা ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অন্যতম ব্যাংক এবং এর পরিচালনে নিযুক্ত প্রায় সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্তমান অবস্থান অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে দুর্বিষহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক খাত জনগণের অর্থ নিয়ে কাজ করে বলে এর স্পর্শকাতরতা যে কোন প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সর্বাধিক। আর্থিক খাতের কেলেংকারি সারা বিশ্বেই অহরহ ঘটে আসছে, আমাদের দেশেও এর কোন ব্যতিক্রম হয়নি। আমাদের দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে প্রায়শই কম-বেশি সবগুলো ব্যাংকেই অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে আসছে। এর বেশিরভাগই ব্যাংক নিজ উদ্যোগে জড়িতদের কাছ থেকে বা নিজেদের তহবিল থেকে পুষিয়ে দিচ্ছে। কখনো কখনো তা পত্র-পত্রিকায় বা মিডিয়ায় প্রকাশ হয়, কখনো তা প্রকাশ হয় না। । কিন্তু হলমার্ক কেলেংকারির ইস্যুটি এমনভাবে সমাজ ও দেশকে নাড়া দিয়েছে— যার তাল সামলাতে গিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বেশিরভাগ ব্যাংক নিজেরা বিশেষ নড়েচড়ে বসেছে। এর ফলশ্রুতিতে হঠাত্ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেমন সংশোধনীর লাগাম ধরে রাখার জন্য তার তদারকির মাত্রা প্রচণ্ডভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনিভাবে ব্যাংকগুলো রাতারাতি নিজেদের বিষয়ে একটি সুদৃঢ় অবস্থান নিতে যেয়ে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপ করে ফেললো। এর মধ্যে অন্যতম হয়ে দাঁড়ালো হলমার্ক কেলেংকারির মূল প্রডাক্ট আইবিপি বা একোমোডেশন বিল। সবগুলো ব্যাংকই আইবিপির ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করলো।
ধারণা করা হয়, আইবিপির নামে একোমোডেশন বিল তৈরি করে ব্যাংকের প্রচুর অর্থ ব্যবসায়ে নিয়োজিত না করে জমি, এপার্টমেন্ট , শেয়ার ইত্যাদিতে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করেছেন । ফলে একখণ্ড জমি বা ভালো এলাকায় একটি এপার্টমেন্টের দাম বিশ্বের যে কোন উন্নত দেশের সমপর্যায়ে পৌঁছালো। কোন ক্ষেত্রে তারচেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়ালো। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকের অর্থ পরিশোধের বা ঋণ হিসাব নিয়মিতকরণের চাপে অনেক গ্রাহককেই জমি বা সম্পদ বিক্রির দিকে নজর দেয়ায় জমি বা এপার্টমেন্টের মূল্যসীমা নামতে শুরু করলো বা এগুলোর কেনাবেচায় মন্দা দেখা দিল। এতে করে অনেকের কাছেই অনুমেয় যে, ব্যাংকের অর্থ-কড়ির বিরাট অংশ সঠিক খাতে ব্যবহূত হয়নি বা বেহাত হচ্ছিল। একোমোডেশন বিল কখনো একটি ভালো গোষ্ঠীবদ্ধ কোম্পানির বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলীর ধারাবাহিকতার কারণেও ঘটতে পারে। তথাপি সকল ক্ষেত্রেই একোমোডেশন বিল রাতারাতি বন্ধ করে দিতে হলো। ব্যাংকগুলোকে ভবিষ্যতে নতুন করে কোন বিপাকে না জড়ানোর কৌশল হিসেবে অতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় চলে আসতে হলো। সে কারণে অনেক গ্রাহকের বাণিজ্যচক্র বাধাগ্রস্ত হলো, তেমনি ব্যাংকগুলোর নতুন বিনিয়োগ কমতে থাকায় বিনিয়োগ ও মুনাফার পরিমাণ প্রত্যাশিত মান থেকে কমতে থাকলো। সামগ্রিক এ বিষয়গুলো ব্যাংকারদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করায় সঠিক কৌশল বা নেতৃত্ব নিয়ে সমন্বয়হীনতা ব্যাংকারদের হতাশা ও ভয়ের মধ্যে ফেলে দিল।
এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি ব্যাংকিং খাতকে যত্নসহকারে বিবেচনায় আনতে হবে বিশেষভাবেই প্রাইভেট ব্যাংকগুলোর বেলায় তা হচ্ছে ব্যাংকগুলোর বিরাট মুনাফার টার্গেট রহিত করা। অনেক ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য মুনাফার টার্গেট অর্জন হয় ঠিকই; কিন্তু এই মুনাফাকে করায়ত্ত করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক ধরনের অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার একটা অপসংস্কৃতি ঢুকে পড়লো। তড়িঘড়ি ঋণ বিতরণের ব্যস্ততায় অনেক সময় সঠিক ঋণ পদ্ধতি বা কার্যাবলী মানা হয়নি। এই অদূরদর্শিতার পরিণতিতে ব্যাংক গ্রাহকদের উপর তাদের সঠিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজেরাই হয়ে উঠে গ্রাহক নিয়ন্ত্রিত। গ্রাহকদের নিয়ন্ত্রণ কিছু ক্ষেত্রে এমন পর্যায়ে দাঁড়ালো যে, এলসি বা একসেপটেন্স বিলের পেমেন্টও তাদের নির্দেশনায় চলতে থাকলো। বাংকের মুনাফার উচ্চ ধারাকে সচল রাখতে স্থবির অর্থনীতিতে ঋণের সুদ হারের বৃদ্ধি এমনভাবে চলতে থাকলো যে, কখনো কখনো ১ মাসের মধ্যে সুদের হার বাড়াতে হয়েছে। দেশের অর্থনীতি বা ব্যবসায়িক স্বার্থটাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনাকেও প্রাসঙ্গিক কারণে মুনাফা বৃদ্ধির চাপটাকে বরণ করতে হয়েছে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদ হার নিয়ন্ত্রণে নির্দেশনা প্রদান করেই দায়িত্ব সেরেছে; কিন্তু শক্ত হাতে তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংকার্স এসোসিয়েশনে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা ডিপোজিট ও ঋণের সুদ হার ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে রাখার কয়েকবার চেষ্টা চালালেও তা নিজ স্বার্থে ধরে রাখতে পারেননি বা রাখেননি। অন্যদিকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তাদের রিপেমেন্ট ঠিকমত করতে না পারায় ব্যাংকগুলো রিশিডিউলিং করে করে হিসাবগুলোকে নিয়মিত করেছে, পরবর্তী পর্যায়ে যা বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকগুলোর জন্য। অতিরিক্ত মুনাফার চাপ ব্যাংকারদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়ায় আইন-কানুন, নিয়ম-পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে জোরালোভাবে ব্যবহার করেননি বা করতে পারেননি। সুনাম অর্জনকারী সফল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে সব ব্যাংক তাদের বিশাল কর্মতত্পরতা বজায় রাখতে গিয়ে নেইম ল্যান্ডিং করতে থাকে। এই নেইম ল্যান্ডিং-এর কারণে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ ও প্রদানের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও অন্য খাতে প্রবাহিত করতে থাকে।
উপরোক্ত বিষয়টিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নেয়ার জন্য ব্যাংকের নিয়োগ পদ্ধতিটিকেও প্রফেশনালী নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ব্যাংকের নিয়োগ পদ্ধতি এত বেশি অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে চলে গেছে যে, বর্তমানে ভালো মানের ব্যাংকার বাজারে খুব বেশি নেই। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা ৮/১০ বছর চাকরি করে ইভিপি বা ডিএমডি হয়ে বসে আছেন এমন ব্যাংকারের ছড়াছড়ি। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারার মতো বা ব্যাংকের কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণের মতো দক্ষতা, জ্ঞান ও দূরদর্শিতা এগুলোর অভাবে ব্যাংকিং খাত পর্যুদস্ত। ১৯৩০ সালের মহামন্দা, ১৯৫৮ সালের মন্দা, ১৯৮৭ সালের জার্মানীর বাবেল ক্রাস বা ব্ল্যাক মানডে, ১৯৯০ সালের জাপানের মন্দা এবং সর্বোপরি ২০০৬ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক মন্দা সবগুলোতেই ২/৩টি বিষয় পূর্ব পরিলক্ষিত ছিল। আপাতদৃষ্টিতে আমার অভিজ্ঞতায় বর্তমান থমকে যাওয়া আর্থিক খাতের জনবল ও ব্যাংকিং পদ্ধতিকে ঢেলে সাজানোর একটি মোক্ষম সময় হতে পারে। কারণ ইতিমধ্যে আমরা জেনে গেছি আমাদের দুরবস্থা আমরা কিভাবে ডেকে এনেছি এবং কি করে আমরা তা সংশোধনে ঘুরে দাঁড়াবো। দেরি না করে এখনই প্রথমে অভ্যন্তরীণ ভিত বিশেষ করে কর্পোরেট কালচার মজবুত করতে হবে এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম সার্বিক দেশজ উন্নয়ননির্ভর করতে হবে।
লেখক : ব্যাংকার
ই-মেইল: [email protected]
