গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহ বাংলাদেশের জন্য বিপর্যয়ের সপ্তাহ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল। রাজধানী ঢাকার কাছে আশুলিয়ার বিভিন্ন স্থানে একের পর এক গার্মেন্টসে আগুন লাগার খবর আসতে থাকে। ফায়ার সার্ভিস ও নিজ নিজ কারখানার কর্মীদের সহায়তায় সব গার্মেন্টসের আগুনই নিযন্ত্রণে আনা সম্ভব হলো। কিন্তু তাজরীন ফ্যাশনের আগুন আর নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলো না। এই গার্মেন্টস কারখানার ১১১ জন শ্রমিক জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। ২৪ নভেম্বর শুধু গার্মেন্টস খাতেই নয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেল। একই দিন বন্দরনগরী চট্টগ্রামে আরেকটি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটল। নির্মাণাধীন বহদ্দারহাট ফ্লাইভারের তিনটি বিরাট গার্ডার ধসে পড়ল। এর ফলে ১৫ জন শ্রমিক ও পথচারী অকালে মৃত্যুর মুখে পতিত হল।
এই দু’টি ভয়াবহ ঘটনায় পুরো জাতি শোকাহত। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি সংবাদ মাধ্যম ও সুশীল সমাজ এসব ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি এসব মর্মান্তিক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিভিন্ন অংশ থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী আর্থিক সহায়তার চেকও বিতরণ করেছেন। এসব অগ্নিকান্ড সাবোটাজ বলেও অভিযোগ উঠেছে এবং এর পেছনে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেয়ার কথাও বলা হয়েছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ভিডিও ক্লিপ প্রচার করেছে, যেখানে দেখা গেছে এক নারী শ্রমিক একটি গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিসংযোগ করছে। পরে সংবাদ মাধ্যমে খবর বের হয়েছে যে, সেই শ্রমিক স্বীকার করেছে, টাকার বিনিময়ে সে গার্মেন্টসে অগ্নিসংযোগ করেছে। তার সাথে আরো একজন জড়িত। দু’জনই এখন আটক আছে। পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এসবের পেছনে ‘নোংরা খেলার’ গন্ধ পাচ্ছে। বিশ্বে পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট করার জন্য কিছু স্বার্থান্ধ মহল এই কাজ করছে বলে বিজিএমইএ মনে করে।
এসব মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্রের কথা বলা হলেও অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি এবং গার্মেন্টস কারখানা থেকে বের হওয়ার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই বলে অভিযোগ আছে। আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকা ও সব শ্রমিককে অগ্নি দুর্ঘটনার প্রশিক্ষণ না দেয়ারও অভিযোগ উঠেছে। তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকান্ডের পর টেলিভিশনের সাংবাদিকরা যারা সেই এলাকায় গেছেন তারা দেখেছেন সেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সহজে যাবার মত পর্যাপ্ত জায়গা নেই। আগুন নেভানোর জন্য কারখানায় পর্যাপ্ত পানির মজুদও নেই। কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, কারখানায় দাহ্য পদার্থের মজুদও ছিল। এসব অবস্থা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, কারখানার মালিকের দিক থেকে ও নিয়ন্ত্রকদের দিক থেকে কাজের উপযোগী পরিবেশের অভাব আছে।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনাই প্রথম নয় যেখানে শ্রমিকরা করুণ পরিণতির শিকার হয়েছে। ১৯৯০ সালের মিরপুর ট্রাজেডি, ২০০০ সালে চৌধুরী নিটওয়ারে ৫৩ জনের মৃত্যু, ২০০১ সালে মাইকো সোয়েটার কারখানায় ২৪ জনের মৃত্যু, ২০০৫ সালে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ধসে ৬৪ জনের মৃত্যু, শন নিটিংয়ে ২৩ জনের মৃত্যু, নিসকো সুপার মার্কেটে ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্য। প্রত্যেকটি ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং দোষীদের শাস্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত তদন্ত প্রক্রিয়ায় আশানুরূপ স্বচ্ছতা থাকে না, দায়িত্বে অবহেলার জন্য খুব কমই দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়। আর কারা শাস্তি পেল তাদের পরিচয়ও প্রকাশ করা হয় না। তাই তদন্ত কাজে আস্থাও থাকে কম। ফলে এবার সুশীল সমাজ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সাথে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে।
আশার কথা এই যে, এই বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি সরকারকে সহযোগিতা করবে যেখানে চিহ্নিত করা হবে কেন সুপারভাইজাররা অকার্যকর, গার্মেন্টস কারখানা থেকে বের হবার গেট কেন নিরাপদ নয়, কেন কারখানায় দাহ্য পদার্থের মজুদ রাখা হয়েছিল। আরো আশার কথা হল কারখানা থেকে নিরাপদে বের হবার পর্যাপ্ত পথ রাখতে ২০০৮ সালের ২৯ মের গেজেট অনুযায়ী কারখানাগুলো সব শর্ত পালন করছে কিনা তা পরীক্ষা করবে তদন্ত কমিটি। ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যুতে পুরো জাতি মর্মাহত। বিজিএমইএ’র ইন্স্যুরেন্স সুবিধা থেকে সামান্য ইন্সুরেন্স পরিশোধ করে তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব নয়। ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে পুরো ঘটনা মূল্যায়ন করে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে কার্যকর হবে আমাদের ইপিজেডে বিদেশি কারখানার পরিবেশ ও শ্রমিকদের প্রদত্ত সুবিধা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা। এমনকি আমাদের আশেপাশের অঞ্চলে গার্মেন্টস কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা পর্যালোচনা করা। সময় এসেছে গভীরভাবে আমাদের নিজেদের অবস্থা এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের কী সুবিধা দেয়া হয় তা পর্যালোচনা করার। বিদেশি কোম্পানি চায় আমাদের গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কর্মউপযোগী পরিবেশ থাকবে, কাজে স্বচ্ছতা থাকবে, সময়মত পণ্য সরবরাহ করবে, শ্রমিকদের বেশি মজুরি দেবে এবং সবচেয়ে সস্তায় তাদেরকে পোশাক দেবে। কিছু কিছু কারখানা প্রত্যাশা অনুযায়ী সবকিছু করার চেষ্টা করছে এবং বাইরের অডিটররা তাদের কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তারপরও সব কারখানার অবস্থা ভাল নয় এবং পরিস্থিতি উন্নতি করার যথেষ্ট সুযোগ আছে।
আমরা ১৯৭৮ সালে মাত্র ৯টি গার্মেন্টস দিয়ে পোশাক রপ্তানি শুরু করেছিলাম। তখন আয় ছিল মাত্র ০.০৬৯ মিলিয়ন ডলার। এখন কারখানার সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। পোশাক রপ্তানি করে আয় হয় ১৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ১৪৫টি’র বেশি দেশে আমাদের দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। চীনের পরেই আমাদের অবস্থান। এই খাতে ৩৬ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। মামুন রশিদের মতে এর ৮০ ভাগ শ্রমিকই নারী। বেসরকারি খাতের এই অর্জনকে খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নেই।
আমাদের গার্মেন্টস খাতের এই সাফল্যের কারণে বাংলাদেশের পোশাক ক্রেতাদেরও প্রত্যাশা বেড়েছে। উন্নত দেশের ভোক্তারা শ্রমিকের মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও সমান অধিকারের বিষয়ে এখন সচেতন। তারা এখন শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়ে সরব হচ্ছে। তাজরীন ফ্যাশন ট্রাজেডির পর আমরা দেখেছি কীভাবে ওয়ালমার্ট প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
তাজরীন ফ্যাশনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর ব্রিটেনের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় জ্যাসন বার্ক ও সাদ হাম্মাদি তুলে ধরেছেন কেন অগ্নিকান্ডে পৃথিবীর অন্য এলাকার চেয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বেশি শ্রমিক মারা যায়। তারা এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন- মালিকদের নীতিহীনতা, সাধারণত জনবহুল বস্তি এলাকায় গার্মেন্টস কারখানা নির্মাণ, দুর্নীতিগ্রস্ত কারখানা পরিদর্শক ও অগ্নিনির্বাপকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকা। এর বাইরেও তারা উল্লেখ করেছেন প্রায়ই বের হবার পথ তালাবদ্ধ থাকে, বেজমেন্টে উচ্চ মাত্রার দাহ্য পদার্থের মজুদ রাখা হয়, অগ্নিকান্ডের সময় নামার জন্য বিকল্প পথ থাকে না, স্মোক এলার্ম ও পানি দেয়ার যন্ত্রপাতি থাকে না। এছাড়া আগুন নেভানোর জন্য শ্রমিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। অগ্নি দুর্ঘটনা রোধের এই সীমিত অনুশীলনকেই কর্ম উপযোগী পরিবেশের একমাত্র মানদন্ড ধরা হয় এবং এটিই পরীক্ষা করা হয়।
আমাদের সমস্যা আছে, এই সমস্যা শুধু শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সাথে জড়িত ক্রেতা, মধ্যস্বত্বভোগী, উত্পাদক। আসলে এর সঙ্গে জড়িত সব পক্ষকে নিয়ে সমস্যা সমাধানের কথা ভাবতে হয়। সব পক্ষের সাথে আলোচনা করেই শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। উপর থেকে নিচে এবং নিচ থেকে উপরে সব পক্ষই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সুপারভাইজার, মনিটর ও নিরাপত্তা পরিদর্শক সবার দক্ষতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সরকারি কারখানা পরিদর্শকের সংখ্যা খুবই কম এবং জরুরি ভিত্তিতে তাদের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি কমবে। সব শেষে শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকারের প্রশ্নটি উঠে আসে। এ জন্য উভয় পক্ষের গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, যেখানে এক পক্ষ অপর পক্ষের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃতি দেবে।
এতক্ষণ গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে আলোচনা করলেও চট্টগ্রামে ফ্লাইওভারের গার্ডার ধসে নিহতদের কথা ভুলে যাইনি। সেখানে দ্বিতীয় বার দুর্ঘটনা ঘটল। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও ফ্লাইওভার প্রকল্পের সাথে জড়িতদের তদন্তের আওতায় আনা উচিত এবং দোষীদের শাস্তি দিতে হবে। দুটি দুর্ঘটনায় শতাধিক প্রাণহানির ঘটনায় আমাদেরকে কিছু কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তারপর সামনে এগিয়ে যেতে হবে। শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই নয়, বিশ্বে যারা আমাদের তৈরি পোশাকের ক্রেতা তাদের মধ্যেও আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। আমাদের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিকে অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে, তাদের সাথে শ্রমিকদের সুসম্পর্ক থাকতে হবে।
ভাষান্তর :মো. আল-মামুন
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
[email protected]
